পশ্চিমবঙ্গে এ বার নিরপেক্ষ ভোট হবে। কোচবিহারের জনসভা থেকে এমনই ভবিষ্যদ্বাণী করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এই সূত্রেই তিনি নির্বাচন কমিশনের উপর ‘পূর্ণ আস্থা’ রাখার কথা জানান। বলেন, “নির্বাচন কমিশনের উপর পূর্ণ আস্থা রয়েছে। এ বার বাংলায় নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে। এ বার নির্ভয়ে ভোট হবে। আর এ বার পরিবর্তনের জন্যও ভোট হবে।”
প্রধানমন্ত্রী যখন কমিশনের উপর আস্থা রাখার কথা জানাচ্ছেন, তখন এসআইআর প্রক্রিয়ায় একাধিক অসঙ্গতির অভিযোগ তুলে নির্বাচন সদনের বিরুদ্ধে সুর চড়াচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে একাধিক অসঙ্গতি এবং অনিয়মের অভিযোগ তুলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে একাধিক বার চিঠিও দিয়েছেন তৃণমূলনেত্রী। তা ছাড়়া বিভিন্ন জনসভায় কমিশন এবং বিজেপিকে এক আসনে বসিয়ে ‘ভোটচুরি’র অভিযোগ তুলেছেন তিনি। এই আবহে কমিশনের উপর মোদীর আস্থা রাখার বার্তাকে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন অনেকে। কমিশনের উপর আস্থার প্রশ্নে দুই দলের চাপানউতর রবিবারের পর আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
গত ১৪ মার্চ ব্রিগেডে সভা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। তখন অবশ্য রাজ্যে ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণা করা হয়নি। পশ্চিমবঙ্গে ভোট ঘোষণার পর রবিবার কোচবিহারেই প্রথম সভা করলেন মোদী। রাসমেলা ময়দানের মঞ্চ থেকে ব্রিগেডের সভার প্রসঙ্গও উত্থাপন করেন তিনি। বলেন, “ব্রিগেডের সভা দেখে তৃণমূলের সিন্ডিকেট ঘাবড়ে গিয়েছে। এর পর ওরা বাংলা থেকে ভয়ে পালাবে।” ব্রিগেডের সভায় বেছে বেছে হিসাব নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন মোদী। রবিবার কোচবিহারের সভায় তার পুনরুচ্চারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ভোটের পর তৃণমূলের সব পাপের হিসাব হবে, বেছে বেছে হিসাব করা হবে।”
আরও পড়ুন:
তৃণমূল আমলে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কথা বলতে গিয়ে মালদহের ঘটনার উদাহরণ দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “গোটা দেশ দেখেছে, কী ভাবে বিচারকদের আটকে রাখা হয়েছিল। তৃণমূলের শাসনে বিচারকেরাও রেহাই পান না। কালিয়াচকের ঘটনা তৃণমূলের নির্মম সরকারের মহাজঙ্গলরাজের উদাহরণ।” একই সঙ্গে মোদীর সংযোজন, “সরকার বিচারকদের নিরাপত্তা দিতে পারে না, তা হলে সাধারণ মানুষের কী অবস্থা হবে?” বক্তৃতায় তিনি ‘জনবিন্যাস বদল’, এসআইআর-এর মতো রাজ্য রাজনীতির আলোচিত বিষয়গুলি নিয়েও তৃণমূল সরকারকে তোপ দাগেন।
অনুপ্রবেশকারীদের ঠাঁই!
পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী এলাকায় জনবিন্যাস বদলে যাচ্ছে বলে বলে অভিযোগ তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “অনুপ্রবেশকারীদের ভোটব্যাঙ্ক বানিয়েছে তৃণমূল। আর এই অনুপ্রবেশকারীদের বাঁচাতেই তৃণমূল এসআইআর-এর বিরোধিতা করছে। এর ফলে বাংলার মানুষের নিরাপত্তা বিপদের মুখে।” বিজেপি রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর অনুপ্রবেশকারীদের রোখা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন মোদী। অনুপ্রবেশ প্রশ্নে মোদীকে পাল্টা তোপ দাগতে ছাড়েনি তৃণমূলও। দলের সাংসদ কীর্তি আজ়াদ বলেন, “আপনার উচিত অবিলম্বে অযোগ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সরিয়ে দেওয়া, যিনি এত দিন তাঁর দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং আমাদের সীমান্ত সুরক্ষিত রাখতে পারেননি।”
দুর্নীতি-তির তৃণমূলকে
তৃণমূলের দুর্নীতির জন্যই পশ্চিমবঙ্গে ‘গ্রহণ নেমে এসেছে’ বলে দাবি করলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “অন্য রাজ্যগুলি এগিয়ে যাচ্ছে, আর বাংলাকে পিছনে ঠেলে দিয়েছে তৃণমূল। এখানে সরকারি চাকরির উপরেও তৃণমূলের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছে। বাংলার যুবসমাজ জানে, এই সরকার কত বড় নিয়োগ দুর্নীতি করেছে। কারা এতে শামিল ছিল! তৃণমূলের নিজের মন্ত্রী, বিধায়ক। উপর থেকে নীচ পর্যন্ত গোটা তৃণমূল দুর্নীতিতে যুক্ত ছিল। কাটমানি, কমিশন আর দুর্নীতি করে যুবসমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছেলেখেলা করেছে এরা।”
নজরে মহিলা ভোট
গত কয়েকটি নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, রাজ্যে মহিলাদের ভোট মূলত তৃণমূলের ঝুলিতে গিয়েছে। এ বার সেই ভোটব্যাঙ্কে থাবা বসাতে চায় পদ্মশিবির। সেই অঙ্ক মাথায় রেখেই কোচবিহারের সভায় ‘মা-বোনেদের’ বার্তা দেন মোদী। বলেন, “বিজেপি এলে মহিলারা স্বনির্ভর হবেন। কেন্দ্রের বিজেপি সরকার মা-বোনেদের সব সুবিধা দিয়েছে। ৩ কোটি মহিলাকে লাখপতি বানিয়েছে। আমাদের সরকার লোকসভা এবং বিধানসভায় মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ দেওয়ার আইন এনেছে। ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচন থেকেই এর সুবিধা মিলবে।” বিজেপি ‘মা-বোনেদের ফার্স্ট চয়েস’ বলেও জানান মোদী।
বাংলা ও বাঙালি
বক্তৃতার শুরুতেই বাংলায় বলেছিলেন, “সবাইকে আমি নমস্কার জানাই।” তার পর একাধিক বার কাটা কাটা বাংলায় বক্তৃতা করতে শোনা গিয়েছে প্রধানমন্ত্রীকে। কখনও তিনি বলেছেন, “বাংলায় এখন একটাই আওয়াজ, পাল্টানো দরকার।” কখনও বলেছেন, “জঙ্গলরাজের অন্ত হবে।” এই সূত্রেই প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগ, তৃণমূল তাদের ঘোষণাপত্রের নাম বাংলায় রাখেনি। মোদীর কথায়, “তৃণমূল ঘোষণাপত্র প্রকাশ করেছে, যার নাম বাংলায় রাখেনি। বরং ইস্তাহার বলা হচ্ছে। ভেবে দেখুন কেমন ভাবে বাংলার পরিচয় বদলে দিচ্ছে।” মোদীকে জবাব দিয়েছে তৃণমূলও। দলের তরফে বলা হয়েছে, “২০১৪ সালে বিজেপি নিজেরাই ‘ইশতেহার’ শব্দটা যথেচ্ছ ভাবে ব্যবহার করেছিল। এ বারে বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারেও বাংলায় এসে নরেন্দ্র মোদীও ‘ইস্তাহার’ শব্দটা ব্যবহার করেছেন। তা হলে কোন আক্কেলে, কোন কাণ্ডজ্ঞানে আমাদের ‘ইস্তাহার’ শব্দ ব্যবহার করা নিয়ে বিজেপি সমালোচনা করছে?”
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, প্রচুর পরিমাণে ভোট পড়লে তা সাধারণত স্থিতাবস্থা বা প্রতিষ্ঠানবিরোধী হয়। অর্থাৎ, ক্ষমতাসীন সরকারের বিপক্ষে যায় জনতার রায়। তবে দীর্ঘলালিত এই ধারণার প্রতিযুক্তিও ছিল। তৃণমূলের তরফে গত লোকসভা এবং বিধানসভা ভোটের উদাহরণ দিয়ে দাবি করা হচ্ছিল, অনেক ভোট পড়লেও এ রাজ্যে তা শাসকের পক্ষেই গিয়েছে বরাবর। বিজেপির পাল্টা যুক্তিতে আবার ছিল ২০১১ সালের ‘পরিবর্তনের ভোট’। সে বারও প্রচুর ভোট পড়েছিল এবং ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে নতুন সরকার গড়েছিলেন মমতা। এ বারের ভোটে এসআইআর সুবিধা করে দিল বিজেপির।
- ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) যে হয়রানিকে প্রচারে হাতিয়ার করেছিল তৃণমূল, তা কাজে এল না। পশ্চিমবঙ্গবাসী ভোট দিলেন বিজেপির পক্ষেই। ফলে এ রাজ্যেও ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার তৈরি হতে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গ জয় করেছে বিজেপি। গত লোকসভা নির্বাচনেও যে দল সে ভাবে দাঁত ফোটাতে পারেনি, দু’বছরের ব্যবধানে তারাই ২০০-র গণ্ডি ছুঁয়ে ফেলেছে। জেলায় জেলায় পদ্মের ঝড়ে উড়ে গিয়েছেন তৃণমূল প্রার্থীরা।
-
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভেঙে দিলেন রাজ্যপাল আরএন রবি, ইস্তফা না-দিলেও মমতা এখন ‘প্রাক্তন’ মুখ্যমন্ত্রী! রাজ্য কার?
-
বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী মোদী! রাজ্যে প্রচারে এসে দিয়ে গিয়েছিলেন কথা
-
ভোট-পরবর্তী গোলমালে রুজু ২০০ এফআইআর! কেউ কেউ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অশান্তি পাকাতে চাইছেন: ডিজি সিদ্ধনাথ
-
‘কমিশন ১০টি গণনাকেন্দ্রের ছয় ঘণ্টার ফুটেজ দিক, দেখাক কিছু হয়নি, আমি মেনে নেব এটাই জনাদেশ’! চ্যালেঞ্জ অভিষেকের
-
৪৫ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে রাজ্যে ২০৭টি আসনে জয় পেল বিজেপি! ৮০টি আসনে জয়ী তৃণমূল, তাদের ভোটের হার কত