জনপরিসরে যখন আলোচনা চলছে, তখন কথা হচ্ছে শেষ নির্বাচনে দু’দলের প্রাপ্ত মোট ভোটের ফারাক নিয়ে। কিন্তু বিজেপির অন্দরে আলোচনা এখন আর সেই হিসাব নিয়ে নয়। মাত্র ১ লক্ষ ৯২ হাজার ভোট ঘুরিয়ে দেওয়া নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দলের ‘ওয়াররুম’-এ।
ঘুরিয়ে দেওয়ার কাজটা অবশ্য খুব সহজ নয়। কারণ, ওই ভোট ঘুরে গেলে যে আসনগুলিতে ফলাফল বদলে যেতে পারে বলে বিজেপির অন্দরে রিপোর্ট জমা পড়েছে, সেই আসনগুলির বেশিরভাগই তৃণমূলের ‘ঘাঁটি’ হিসাবে পরিচিত এলাকার। তবে এসআইআর-পরবর্তী পরিস্থিতি এবং নির্বাচন কমিশনের নজিরবিহীন কঠোরতার আবহে তৃণমূলের এগিয়ে থাকার এই ‘নামমাত্র’ ব্যবধান এ বার টিকে থাকবে না বলে আশাবাদী বিজেপি নেতৃত্ব।
বিজেপির এই ‘অভ্যন্তরীণ রিপোর্ট’ সম্পর্কে কোনও নেতাই প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চাননি। তবে এসআইআর-এর ‘বিবেচনাধীন’ তালিকার নিষ্পত্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিধানসভা আসন ধরে ধরে তালিকা তৈরি করে ফেলেছে বিজেপি-নিযুক্ত পেশাদার পরামর্শদাতা তথা সমীক্ষক সংস্থা। কোন বিধানসভায় তৃণমূল এবং বিজেপির মধ্যে ব্যবধান কত ছিল এবং এসআইআর প্রক্রিয়ায় সেখানে কত নাম বাদ পড়ল, সে হিসাব তো তৈরি হয়েছেই। বাদ-পড়া নামগুলির মধ্যে নিশ্চিত ভাবে তৃণমূলের ভোট কত শতাংশ ছিল, বিজেপির নিশ্চিত ভোটই বা কত শতাংশ ছিল, সে হিসাবও তৈরি হয়েছে। সে সব যোগ-বিয়োগের ভিত্তিতেই ৫৮টি আসনের তালিকা বিজেপি নেতৃত্বের সামনে পেশ করা হয়েছে।
বিজেপি সূত্রের খবর, যে ৫৮টি বিধানসভা আসনকে চিহ্নিত করা হয়েছে, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে সেগুলিতে তৃণমূল এবং বিজেপির প্রাপ্ত মোট ভোটের মধ্যে ফারাক ৩ লক্ষ ৮০ হাজারের একটু বেশি। তাই ওই আসনগুলিতে মোট ১ লক্ষ ৯২ হাজার ভোট তৃণমূলের দিক থেকে বিজেপির দিকে ঘুরলেই ফলাফল উল্টে যাবে! অর্থাৎ, বিধানসভা পিছু গড়ে ৩,৩১০টি করে ভোট তৃণমূলের বাক্স থেকে সরাসরি বিজেপির বাক্সে যেতে হবে। কিন্তু ভোটের পাটিগণিত যে অতটা সরলরৈখিক হয় না, তা বিজেপি নেতৃত্বও জানেন। বিজেপির এক রাজ্য সম্পাদকের কথায়, ‘‘৫৮টি আসনে দলের ভোট লাখ দু’য়েক বাড়িয়ে নেওয়া অসম্ভব কাজ নয়। কিন্তু সেই ভোটটা পুরোপুরি তৃণমূলের ভাগ থেকেই বিজেপির দিকে আসছে, সেটা নিশ্চিত করা কঠিন।’’
যে নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে বিজেপি এই হিসাব তৈরি করেছে, ২০২৪ সালের সেই ভোট অবশ্য এসআইআর-এর আগে হয়েছিল। এ বার সে তালিকা থেকে ৯১ লক্ষের মতো নাম বাদ পড়ে গিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে যে হেতু ভোটদানের গড় হার ৮০ শতাংশের মতো, তাই অপসারিত নামের ক্ষেত্রেও ৮০ শতাংশকেই ‘কার্যকরী অপসারণ’ হিসাবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। সংখ্যাটা দাঁড়াচ্ছে ৭৩ লক্ষের মতো। অর্থাৎ, ওই ৯১ লক্ষ নাম তালিকায় থেকে গেলে আরও ৭৩ লক্ষ ভোট বেশি পড়ার সম্ভাবনা ছিল। সেই ভোট এ বার পড়বে না এবং তার অধিকাংশই তৃণমূলের ভাগ থেকে কমবে বলে বিজেপির অভ্যন্তরীণ রিপোর্টে ইঙ্গিত করা হয়েছে। তাই বিজেপি নেতারা মনে করছেন, ৫৮টি আসনে তৃণমূলের ভোট এমনিতেই আগের চেয়ে কমবে। বিজেপির ভোটেও কিছুটা টান পড়তে পারে। কিন্তু তার অনুপাত কম হবে। তাই ৫৮টি স্বল্প ব্যবধানের আসনে তৃণমূল আর বিজেপির মাঝের ফারাক এখন ২০২৪ সালের চেয়েও কম বলে বিজেপি মনে করছে।
বিজেপি সূত্র বলছে, ওই ৫৮টি আসন মূলত মালদহ, মুর্শিদাবাদ, হাওড়া, হুগলি, উত্তর ২৪ পরগনা, কলকাতা এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনায় রয়েছে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই জেলাগুলিতেই সবচেয়ে ভাল ফলাফল করেছিল তৃণমূল। তাই বিজেপির রিপোর্টেও এই অঞ্চলকে ‘তৃণমূলের দুর্গ’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু সে ‘দুর্গ’ গত পাঁচ বছরে কোথায় কোথায় দুর্বল হয়েছে, সে সবই বিজেপি চিহ্নিত করেছে।
রাজ্যে তৃণমূলের ভোটপ্রাপ্তির আরও একটি ‘প্রবণতা’ বিজেপির অভ্যন্তরীণ রিপোর্টে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেই প্রবণতা বলছে, ১১৪টি বিধানসভা আসনে তৃণমূল লাগাতার বিপুল ব্যবধানে এগিয়ে থাকছে। আসনগুলির সিংহভাগই সংখ্যালঘু প্রধান। ওই আসনগুলিতে বিপুল ভোটপ্রাপ্তির ফলে তৃণমূলের মোট ভোট শতাংশ বেড়ে থাকছে। কিন্তু গোটা রাজ্যে ওই ভোট সমান ভাবে ছড়ানো নেই বলে বেশ কিছু আসনে বিজেপির সুবিধা হচ্ছে। বিজেপির ক্ষেত্রেও ওই রকম উচ্চ ব্যবধানে এগিয়ে থাকা আসনের দৃষ্টান্ত রয়েছে। তবে সেই সংখ্যাটা ৩৫।
বিজেপির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে তৃণমূলের ক্ষেত্রে এই ‘অকার্যকরী ব্যবধান’ (যে ব্যবধান ভোট শতাংশ বাড়ালেও আসনসংখ্যা বাড়ায় না)-এর পরিমাণ ছিল ৫৫ লক্ষ ৮০ হাজারের মতো। বিজেপির ক্ষেত্রে তা ছিল ১১ লক্ষ ৯০ হাজার। কিন্তু পাঁচ বছর আগের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল এবং বিজেপির প্রাপ্ত ‘অকার্যকরী’ ভোটের ফারাক আরও বেশি ছিল। তৃণমূলের ক্ষেত্রে তা ছিল ৬৫ লক্ষ। বিজেপির ক্ষেত্রে সাড়ে পাঁচ লক্ষের মতো। অর্থাৎ, এ বারের বিধানসভা নির্বাচনের হিসাব দু’বছর আগের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে তৈরি না-করে যদি ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে করা হয়, তা হলেও তৃণমূলের প্রাপ্ত ভোটের মধ্যে ‘অকার্যকরী’ অংশ বিজেপির ‘অকার্যকরী’ ভোটের চেয়ে অনেক বেশি হবে।
এসআইআর-পরবর্তী ভোটার তালিকার ছবি বুঝে নেওয়ার পরে এই অভ্যন্তরীণ রিপোর্ট হাতে নিয়ে কৌশল সাজাতে বসেছেন বিজেপি নেতৃত্ব। সেই সূত্রেই বিজেপি নেতারা মনে করছেন, তৃণমূলের চেয়ে কয়েক শতাংশ ভোট কম পেয়েও আসনসংখ্যায় তৃণমূলের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া সম্ভব।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, প্রচুর পরিমাণে ভোট পড়লে তা সাধারণত স্থিতাবস্থা বা প্রতিষ্ঠানবিরোধী হয়। অর্থাৎ, ক্ষমতাসীন সরকারের বিপক্ষে যায় জনতার রায়। তবে দীর্ঘলালিত এই ধারণার প্রতিযুক্তিও ছিল। তৃণমূলের তরফে গত লোকসভা এবং বিধানসভা ভোটের উদাহরণ দিয়ে দাবি করা হচ্ছিল, অনেক ভোট পড়লেও এ রাজ্যে তা শাসকের পক্ষেই গিয়েছে বরাবর। বিজেপির পাল্টা যুক্তিতে আবার ছিল ২০১১ সালের ‘পরিবর্তনের ভোট’। সে বারও প্রচুর ভোট পড়েছিল এবং ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে নতুন সরকার গড়েছিলেন মমতা। এ বারের ভোটে এসআইআর সুবিধা করে দিল বিজেপির।
- ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) যে হয়রানিকে প্রচারে হাতিয়ার করেছিল তৃণমূল, তা কাজে এল না। পশ্চিমবঙ্গবাসী ভোট দিলেন বিজেপির পক্ষেই। ফলে এ রাজ্যেও ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার তৈরি হতে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গ জয় করেছে বিজেপি। গত লোকসভা নির্বাচনেও যে দল সে ভাবে দাঁত ফোটাতে পারেনি, দু’বছরের ব্যবধানে তারাই ২০০-র গণ্ডি ছুঁয়ে ফেলেছে। জেলায় জেলায় পদ্মের ঝড়ে উড়ে গিয়েছেন তৃণমূল প্রার্থীরা।
-
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভেঙে দিলেন রাজ্যপাল আরএন রবি, ইস্তফা না-দিলেও মমতা এখন ‘প্রাক্তন’ মুখ্যমন্ত্রী! রাজ্য কার?
-
বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী মোদী! রাজ্যে প্রচারে এসে দিয়ে গিয়েছিলেন কথা
-
ভোট-পরবর্তী গোলমালে রুজু ২০০ এফআইআর! কেউ কেউ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অশান্তি পাকাতে চাইছেন: ডিজি সিদ্ধনাথ
-
‘কমিশন ১০টি গণনাকেন্দ্রের ছয় ঘণ্টার ফুটেজ দিক, দেখাক কিছু হয়নি, আমি মেনে নেব এটাই জনাদেশ’! চ্যালেঞ্জ অভিষেকের
-
৪৫ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে রাজ্যে ২০৭টি আসনে জয় পেল বিজেপি! ৮০টি আসনে জয়ী তৃণমূল, তাদের ভোটের হার কত