E-Paper

কপালে তিলক, মুখে বাণ, জমি উদ্ধারে পুরনো চাল

বিধানসভা ভোটে বর্ষীয়ান নেতা দিলীপ ঘোষ প্রার্থী হয়ে ফিরতেই এখানে বিজেপি চনমনে হয়ে উঠেছে। নিজস্ব কায়দায় দিলীপ সাত-সকালে খড়্গপুরের রাস্তায় চায়ের দোকানে বসে জনসংযোগ করছেন।

প্রবাল গঙ্গোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৪ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৩৯
খড়গপুরের গোলবাজারে প্রচারে দিলীপ ঘোষ। শুক্রবার।

খড়গপুরের গোলবাজারে প্রচারে দিলীপ ঘোষ। শুক্রবার। — নিজস্ব চিত্র।

বুক ফাটে। মাঝে মাঝে মুখও ফোটে।

দু’জনেই দলীয় ‘গোষ্ঠী-দ্বন্দ্বের শিকার’। সঙ্কট দু’জনেরই। তবু শাসক ও প্রধান বিরোধী দলের দুই প্রার্থী পরস্পরকে ছাপিয়ে যেতে তৎপর পশ্চিম মেদিনীপুরের খড়্গপুর সদর কেন্দ্রে।

এ বারের বিধানসভা ভোটে বর্ষীয়ান নেতা দিলীপ ঘোষ প্রার্থী হয়ে ফিরতেই এখানে বিজেপি চনমনে হয়ে উঠেছে। নিজস্ব কায়দায় দিলীপ সাত-সকালে খড়্গপুরের রাস্তায় চায়ের দোকানে বসে জনসংযোগ করছেন। জনগণের দেওয়া বিস্কুট, পান নিয়ে তাতে কামড় দিচ্ছেন। আখড়ায় গিয়ে লাঠি ঘোরাচ্ছেন। আবার সংবাদমাধ্যমের সামনে ‘এনকাউন্টার হবে’ কিংবা ‘কান ধরে ওঠবোস করানো’ র মতো গরম গরম সংলাপ উড়িয়ে নিজের উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন।

এই সব সংলাপই কি আপনার ফিরে আসার ক্যাচলাইন?

রামনবমীর সকালে খড়্গপুরের রেল কলোনির বাংলোয় বসে পান চিবোতে চিবোতে দিলীপের জবাব, ‘‘সংলাপ তো বলতেই হবে। খড়্গপুরের অবস্থা দেখুন। দু’টি খুন হয়েছে এর মধ্যে। মানুষকে সাহস দিতেই হবে। আর আমি তো এখানে আসা-যাওয়ার মধ্যেই ছিলাম। লোকজনের সঙ্গে দেখা করতাম। সরকারি অনুষ্ঠানে যেতাম না।’’ ট্র্যাক প্যান্ট পরে সকাল সাড়ে ৬টায় বেরিয়েছিলেন জনসংযোগে। ফিরে এসে স্নান আর পুজো সেরেই ছুটলেন খড়্গপুর শহরে রাম নবমীর প্রস্তুতি দেখতে। দুপুরে খড়্গপুর পুরসভার ১১ নম্বর ওয়ার্ডে চণ্ডীপুরে একটি ক্লাবে কপালে তিলক আর ঘিয়ে রঙের পাঞ্জাবি-পায়জামা পরে রামনবমীর পুজোয়। এর পরে ফের সংবাদমাধ্যমের সামনে দিলীপ বললেন, ‘‘বাঙালি এবং অবাঙালি ভোট তো আমাদের দিকে রয়েছেই। এ বার সংখ্যালঘু ভোটও আসবে। ওঁরা বুঝেছেন তৃণমূল ওঁদের জন্য কিছু করেনি। ওঁদের বিজেপি ছাড়া কোনও বিকল্প নেই তো!’’

খড়্গপুরে কংগ্রেসের জ্ঞান সিংহ সোহনপাল ওরফে চাচাকে ২০১৬ সালে পরাজিত করে বিধায়ক হওয়া দিলীপ খড়্গপুরের মাটিতে গেরুয়া পতাকা তুলেছিলেন। রাজ্যে ২০১৯ সালে তাঁর নেতৃত্বেই বিজেপি ১৮টি লোকসভা আসন জিতেছিল। মেদিনীপুর থেকে দিলীপ নিজেও সাংসদ হয়েছিলেন। তার পরে ২০২৪ সালে বিজেপি লোকসভা ভোটে দিলীপকে লড়তে পাঠিয়েছিল বর্ধমান-দুর্গাপুর কেন্দ্রে। সেখানে হেরে গিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে এক প্রকার ম্রিয়মান ছিলেন দিলীপ। এ বার তিনি ফের স্বমহিমায় খড়্গপুরে।

বিধায়ক ও পরে সাংসদ হিসেবে দিলীপ যেমন খড়্গপুরে জাঁকিয়ে ছিলেন, বিদায়ী বিধায়ক তথা অভিনেতা হিরণ চট্টোপাধ্যায় তেমন ভাবে দাগ কাটতে পারেননি। দিলীপ অবাঙালি ভোটারকে যে ভাবে একত্র করে রেখেছিলেন, তিনি চলে যাওয়ার পরে তা-ও খানিকটা বিচ্ছিন্ন। এই অবাঙালি ভোটই খড়্গপুরে বিজেপির সব চেয়ে বড় ভরসার জায়গা। গত ২০২১ সালের হিসেব ধরলে খড়্গপুর সদরে তৃণমূল কংগ্রেসের চেয়ে বিজেপির জয়ের ব্যবধান চার হাজারেরও কম ছিল।

দিলীপ তাঁর ভোট-প্রচারে ছোট ছোট বৈঠককে গুরুত্ব দিচ্ছেন। যেমন দেখা গেল ইন্দায় মধুকর কলোনির বাসন্তী পুজোর মণ্ডপে নিজের নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে লোকজনকে ডেকে নিজস্বী তুলতে। সরাসরি ভোট না-চেয়ে দিলীপ তাঁদের বললেন, ‘‘দেখুন মায়ের দিকে। পায়ে, গায়ে শুধুই পদ্মফুল। আর কোনও ফুল চোখে পড়ছে কি?’’ এক তরুণী সই চাইতে এলে দিলীপ তাঁকে হাসতে হাসতে বললেন, ‘‘কীসের সই? লক্ষ্মীর ভান্ডার নেবে নাকি?’’ হেসে ফেলেন তরুণীও।

তাঁকে এই কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনা কি দলের ভুল শোধরানো? সতর্ক দিলীপের জবাব, ‘‘ভুল নয়। দল মনে করেছিল ২০২৪-এ এই আসনটি নিরাপদ। তাই আমাকে অন্যত্র পাঠানো হয়েছিল। এ বার দল মনে করেছে, তাই আবার এখানে প্রার্থী করেছে।"

দিলীপের এই প্রত্যাবর্তন অবশ্য ব্যস্ততা বাড়িয়ে দিয়েছে তৃণমূলের প্রার্থী প্রদীপ সরকারের। দিলীপ খড়্গপুরের সাংসদ হওয়ার পরে ২০১৯ সালে উপনির্বাচন জিতে খড়্গপুর সদরে দেড় বছরের জন্য বিধায়ক হন প্রদীপ। পরে ২০২১ সালে বিধানসভা ভোটে বিজেপির তারকা-প্রার্থী হিরণের কাছে পরাজিত হন প্রদীপ। তাই রাজ্যে ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও এই বিধানসভা কেন্দ্র শাসনের স্বাদ এ পর্যন্ত তেমন ভাবে উপভোগ করতে পারেনি তৃণমূল। এ বার ফের কেন্দ্র উদ্ধারের দায় বর্তেছে প্রদীপের উপরেই।

দিলীপকে জায়গা দিতে গিয়ে হিরণকে এ বার হাওড়ার শ্যামপুরে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছে বিজেপি। এই শহরেই দ্বিতীয় বিয়ের খবরকে কেন্দ্র করে কটাক্ষের মুখেও পড়তে হয়েছে বিদায়ী বিধায়ককে। তৃণমূলের প্রদীপ যেমন প্রকাশ্যেই বলছেন, ‘‘হিরণ খড়্গপুর শহরকে কিছুই দেননি। উল্টে এখানকার মেয়েকে বিয়ে করে নিয়ে গিয়েছেন। এখানে এলে বিজেপির নেতাদের বিয়ে হয়ে যায়!’’ প্রসঙ্গত, অল্প দিন আগে দিলীপের কয়েকটি চায়ের আড্ডা ছাড়া তাঁর স্ত্রী রিঙ্কু মজুমদারকে খড়্গপুরে স্বামীর পাশে প্রচারে তেমন ভাবে দেখা যায়নি।

জনসংযোগ করতে রামনবমীর দিনে দিলীপকে যখন রাম মন্দিরে এবং আখড়ায় ঘুরেছেন, তখন কপালে গেরুয়া তিলক আর গলায় উত্তরীয় ঝুলিয়ে প্রদীপকে দেখা গিয়েছে খড়্গপুর শহরে রাম মন্দিরের রাস্তায় ঠা ঠা রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে পথচলতি লোকের মুখে লাড্ডু পুরে দিতে। খানিক বাদে ছুটলেন আবার আইসক্রিম বিলি করতে। প্রচারের চাপে ভাঙা কণ্ঠস্বরে প্রদীপের কথায়, ‘‘ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে লড়ে যাব। দিলীপ ঘোষ তো বহিরাগত! ওঁকে কোথায় দাঁড় করাবে, ওঁর দলই ঠিক করতে পারে না। ওঁদের দলে এত গোষ্ঠী-দ্বন্দ্ব। খড়্গপুরের পরিবেশ উনি নষ্ট করছেন। মুখে সারা ক্ষণ মারধরের কথা। ওঁর নাম এখানে তো দাঙ্গা ঘোষ! উনি লাঠি ঘোরালে আমি গদা ঘোরাব!’’

বিজেপির অন্তর্দ্বন্দ্বে দিলীপ খড়্গপুর ছাড়া হয়েছিলেন। বিজেপির অন্তর্দ্বন্দ্বে। প্রদীপ সে দিকে আঙুল তুলছেন। কিন্তু ২০২২ সালে খড়্গপুরের পুর-প্রধান নির্বাচিত হওয়া সত্ত্বেও ওই বছরের শেষে প্রদীপের দলের পুর-প্রতিনিধিদের একাংশ অনাস্থা প্রস্তাব এনে তাঁকে সেই পদ থেকে সরিয়ে দেন। তা হলে দ্বন্দ্বের কাঁটা তো তাঁদেরও! এই প্রশ্নের সামনে খানিকটা অপ্রস্তুত প্রদীপের জবাব, ‘‘দলের পুর-প্রতিনিধিদের একাংশ আমাকে সরিয়েছিলেন হয়তো কোনও উদ্দেশ্য থেকেই। কিন্তু এ বার আমাকে স্বয়ং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বুকে জড়িয়ে ধরে জানিয়েছেন, খড়্গপুর আমারই থাকবে। আমি পুর-প্রধান থাকলে অনেক কাজ করা যেত।’’

এই ‘অনেক কাজের’ মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে খড়্গপুরের পরিবেশ দূষণের সমস্যা। শহর এবং গ্রামীণ, দুই এলাকাই তাতে জর্জরিত। শিল্পাঞ্চল থেকে উড়ে আসা ছাই আর ধুলো গোটা খড়্গপুরের বাতাসকে দূষিত করে রেখেছে। বাড়িতে কলের জল কালো হয়ে পড়ে। থুতু পর্যন্ত শরীর থেকে কালো বেরোচ্ছে বলে অভিযোগ মানুষের। অথচ ভোটের বাজারে সে সব সমস্যা দূরে সরিয়ে রেখে প্রার্থীরা রাজনৈতিক তরজা জুড়েছেন বলেই অভিযোগ জনতার। তবে এ নিয়েও দুই দল একে অন্যের বিরুদ্ধে তোপ দাগছে। দিলীপের কথায়, ‘‘খড়্গপুর পুরসভা আমাদের নয়। তা সত্ত্বেও আমি চেষ্টা করেছি। কারখানা কর্তৃপক্ষকে হুঁশিয়ারি দিয়েছি। শিল্প জরুরি কিন্তু তা কখনও মানুষের জীবনের বিনিময়ে নয়।’’

আর প্রদীপের দাবি, ‘‘কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ কী করছে? তা-ও আমরা সম্প্রতি একটি কারখানাকে দূষণ ছড়ানো থেকে আটকেছি। এখানকার বিধায়ক তো বিজেপির। তাঁর কী ভূমিকা?’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

BJP Dilip Ghosh

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy