দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারকে ফের চিঠি লিখলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এ বার নাম ধরে নয়, তাঁকে সম্বোধন করলেন পদ ধরে। চিঠির শুরুতেই জ্ঞানেশকে ‘ডিয়ার মিস্টার সিইসি’ বলে সম্বোধন করেছেন মমতা। গত কয়েক দিন ধরে রাজ্য প্রশাসনে পর পর যে রদবদল কমিশন করে চলেছে, তা নিয়ে কটাক্ষ করেছেন তিনি। রদবদলের মূল দু’টি সমস্যা ব্যাখ্যাও করেছেন। জানিয়ে দিয়েছেন, এই সময়ের মধ্যে রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কোনও অবনতি হলে তার দায় বর্তাবে কমিশনের উপর।
গত রবিবার ভোটঘোষণার পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গে প্রশাসনের শীর্ষ স্তরের আমলা ও পুলিশের শীর্ষকর্তাদের অপসারণ করছে কমিশন। মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব, রাজ্য পুলিশের ডিজি, কলকাতার পুলিশ কমিশনার-সহ অনেক আধিকারিককে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বদল করা হয়েছে একাধিক জেলার জেলাশাসককেও। এই জেলাশাসকেরাই বিভিন্ন জেলায় জেলা নির্বাচনী আধিকারিক (ডিইও) হিসাবে কাজ করে থাকেন। রাজ্যে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের কাজ চলছে। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে ডিইও-রা যুক্ত। মুখ্যমন্ত্রী চিঠিতে এই বিষয়টি তুলে ধরেছেন। জানিয়েছেন, এ ভাবে ডিইও-দের বদলে দিলে এসআইআর-এর কাজে তার প্রভাব পড়তে বাধ্য।
আরও পড়ুন:
মমতা লিখেছেন, ‘‘এসআইআর প্রক্রিয়া চলছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ সত্ত্বেও এখনও কোনও অতিরিক্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। প্রক্রিয়ায় যত দেরি হবে, তত ভোটারদের অভিযোগ জানানোর সময় কমবে। ডিইও-দের বদলি এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। নতুন ডিইও-দের সমস্যা হচ্ছে। এটা কি গণতন্ত্রের প্রহসন নয়?’’
আমলা, আধিকারিকদের বদলিতে রাজ্যের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার ক্ষেত্রেও সমস্যা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন মমতা। চিঠিতে তিনি জানিয়েছেন, মার্চ-এপ্রিল ঝড়বৃষ্টির সময়। প্রায় প্রতি বছরই দুর্যোগে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়। দুর্যোগ পরবর্তী উদ্ধারকাজ তদারকি করেন রাজ্য প্রশাসনের সিনিয়র আধিকারিকেরা। স্থানীয় আবহাওয়া সম্বন্ধে যাঁরা সচেতন, তাঁরাই এই কাজে পারদর্শী। তবে আধিকারিকদের বদলে দেওয়ার ফলে দুর্যোগ মোকাবিলায় সমস্যা হবে। বাইরে থেকে আনা অফিসারেরা আঞ্চলিক সমস্যাগুলি বুঝতে পারবেন না। তার ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখতেও সমস্যা হতে পারে, আশঙ্কা মুখ্যমন্ত্রীর।
সম্প্রতি ১৫ জন আইপিএস অফিসারকে বদলির নির্দেশ দিয়েছিল কমিশন। তাঁদের নিজ নিজ পদ থেকে অপসারণ করা হয়। নবান্ন থেকে নতুন পদে তাঁদের পুনর্বহালের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ফের কমিশনের নির্দেশ আসে এবং ওই আধিকারিকদের ভিন্ রাজ্যে ভোটের পর্যবেক্ষক হিসাবে নিয়োগ করা হয়। অধিকাংশেরই পর্যবেক্ষক হিসাবে প্রশিক্ষণ ছিল না। কমিশনের ওই নির্দেশিকার ফলে রাজ্যের পুনর্বহালও বাতিল হয়ে যায়। মমতার অভিযোগ, কমিশন ক্ষমতার অপব্যবহার করছে।
ভোটঘোষণার পর থেকে নতুন সরকার গঠন পর্যন্ত রাজ্য প্রশাসনের উপর নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণ থাকে। মমতা চিঠিতে ভারতীয় সংবিধানের সেই ধারার উল্লেখ করেই কমিশনের রদবদলের নিন্দা করেছেন। অভিযোগ, যে আধিকারিকদের সরানো হচ্ছে, তাঁদের বিরুদ্ধে নির্বাচনী নিয়মভঙ্গ বা আদর্শ আচরণবিধি ভঙ্গের কোনও অভিযোগই নেই। বিনা কারণে দক্ষ আধিকারিকদের অপসারণের বিরোধিতা করেছেন মমতা। অভিযোগ, কমিশনের এই আচরণ জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী। জ্ঞানেশকে তিনি ভবিষ্যতে এমন পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করেছেন।
চিঠির কথা জানিয়ে সমাজমাধ্যমে পোস্টও করেছেন মমতা। সেখানে লিখেছেন, ‘‘কমিশনের স্বেচ্ছাচারী, নজিরবিহীন কর্মকাণ্ডে উদ্বেগ প্রকাশ করে আমি মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে চিঠি লিখেছি। কোনও অভিযোগ ছাড়াই এবং রাজ্যের সঙ্গে আলোচনা না করে আধিকারিকদের এমন অপসারণে প্রশাসনের কাজ ব্যাহত হচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কমিশনকে এমন একতরফা সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছি।’’
গত ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত সাড়ে চার মাসে এই নিয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে ন’টি চিঠি লিখে ফেললেন মমতা। বৃহস্পতিবারের আগে পর্যন্ত প্রতি ক্ষেত্রেই চিঠির শুরুতে ‘মিস্টার জ্ঞানেশ কুমার’ নামে সম্বোধন করা হয়েছে। এর আগের চিঠির শেষে জ্ঞানেশের উদ্দেশে ‘অল দ্য বেস্ট’ লিখেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। এ বার আর নাম উল্লেখ করলেন না। সরাসরি পদ (সিইসি) উল্লেখ করে চিঠি লিখলেন। অনেকে মনে করছেন, এই সম্বোধনের আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর চিঠির মূল বার্তা কমিশনের ক্ষমতার অপব্যবহার। জ্ঞানেশের পদ উল্লেখ করে তাই পদের অপব্যবহারের বার্তা তিনি দিতে চেয়েছেন বলে অনেকের মত।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, প্রচুর পরিমাণে ভোট পড়লে তা সাধারণত স্থিতাবস্থা বা প্রতিষ্ঠানবিরোধী হয়। অর্থাৎ, ক্ষমতাসীন সরকারের বিপক্ষে যায় জনতার রায়। তবে দীর্ঘলালিত এই ধারণার প্রতিযুক্তিও ছিল। তৃণমূলের তরফে গত লোকসভা এবং বিধানসভা ভোটের উদাহরণ দিয়ে দাবি করা হচ্ছিল, অনেক ভোট পড়লেও এ রাজ্যে তা শাসকের পক্ষেই গিয়েছে বরাবর। বিজেপির পাল্টা যুক্তিতে আবার ছিল ২০১১ সালের ‘পরিবর্তনের ভোট’। সে বারও প্রচুর ভোট পড়েছিল এবং ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে নতুন সরকার গড়েছিলেন মমতা। এ বারের ভোটে এসআইআর সুবিধা করে দিল বিজেপির।
- ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) যে হয়রানিকে প্রচারে হাতিয়ার করেছিল তৃণমূল, তা কাজে এল না। পশ্চিমবঙ্গবাসী ভোট দিলেন বিজেপির পক্ষেই। ফলে এ রাজ্যেও ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার তৈরি হতে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গ জয় করেছে বিজেপি। গত লোকসভা নির্বাচনেও যে দল সে ভাবে দাঁত ফোটাতে পারেনি, দু’বছরের ব্যবধানে তারাই ২০০-র গণ্ডি ছুঁয়ে ফেলেছে। জেলায় জেলায় পদ্মের ঝড়ে উড়ে গিয়েছেন তৃণমূল প্রার্থীরা।
-
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভেঙে দিলেন রাজ্যপাল আরএন রবি, ইস্তফা না-দিলেও মমতা এখন ‘প্রাক্তন’ মুখ্যমন্ত্রী! রাজ্য কার?
-
বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী মোদী! রাজ্যে প্রচারে এসে দিয়ে গিয়েছিলেন কথা
-
ভোট-পরবর্তী গোলমালে রুজু ২০০ এফআইআর! কেউ কেউ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অশান্তি পাকাতে চাইছেন: ডিজি সিদ্ধনাথ
-
‘কমিশন ১০টি গণনাকেন্দ্রের ছয় ঘণ্টার ফুটেজ দিক, দেখাক কিছু হয়নি, আমি মেনে নেব এটাই জনাদেশ’! চ্যালেঞ্জ অভিষেকের
-
৪৫ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে রাজ্যে ২০৭টি আসনে জয় পেল বিজেপি! ৮০টি আসনে জয়ী তৃণমূল, তাদের ভোটের হার কত