জন হেনরি কি সিপিএমের পাঠ্যক্রম থেকে মুছে যেতে চলেছেন? যিনি যন্ত্রের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে চেয়েছিলেন! যাঁর বীরগাথা বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়ে গণসঙ্গীত আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে। শুধু কি জন হেনরিই মুছে যেতে চলেছেন? না কি একইসঙ্গে হেমাঙ্গ বিশ্বাস, সলিল চৌধুরীদের ধ্রুপদী গণসঙ্গীতের দিনও ফুরিয়ে আসছে বাম রাজনীতির পরিসরে? বিধানসভা নির্বাচনে বামেদের প্রচারের নতুন আঙ্গিকে সেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। কারণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সাহায্য নিয়ে কেন্দ্র ধরে ধরে ‘থিম সং’ তৈরি করছে সিপিএম।
ইতিমধ্যেই কোচবিহার, উত্তরপাড়া, শ্রীরামপুর, নোয়াপাড়া, পানিহাটি, ডোমকল-সহ বিভিন্ন কেন্দ্রের সিপিএম প্রার্থীদের সমর্থনে এআই নির্মিত গান প্রকাশ্যে এসেছে। স্থানীয় স্তরের সিপিএম কর্মীরা গান লিখছেন। তার পরে সেই গানের কথা সঁপে দেওয়া হচ্ছে এআই-এর কাছে। কী করতে হচ্ছে? হুগলিতে কেন্দ্র ধরে সিপিএমের গান বানানোর নেপথ্যে থাকা এক তরুণ নেতার কথায়, ‘‘গানের লিরিক্স আমরা দিয়ে দিচ্ছি। তার পরে কেমন গলা হবে, ভারী না সরু, হালকা ডিজে মিউজ়িক পাঞ্চ করা থাকবে কি না, রিদমটা দ্রুত হবে না ধীরে, সেগুলো ওকে (এআই-কে) ‘ব্রিফ’ করে দিচ্ছি। ব্যস, গান রেডি!’’ খুব পরিশ্রম করতে হচ্ছে? জবাবে সিপিএমের তরুণ নেতা রসিকতা করে বলেন, ‘‘বাধ্য কমরেডের মতো কাজ করছে এআই। বেশি বলতে হচ্ছে না। বুঝে যাচ্ছে।’’
কোচবিহারের প্রণয় কার্য্যি থেকে উত্তরপাড়ার মিনাক্ষী মুখোপাধ্যায় বা ডোমকলের মুস্তাফিজুর রহমান রানার প্রচার গান-সহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে ‘ঢিঙ্কাচিকা’ তালের ছাপ রয়েছে। সম্ভবত তার জেরেই বামেদের প্রচারে অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে ডিজে বক্স। পানিহাটিতে কলতান দাশগুপ্তের সমর্থনে মিছিল হোক বা উত্তরপাড়ায় মিনাক্ষীর মিছিল, সর্বত্রই দেখা যাচ্ছে ‘ছোটা হাতি’তে থরে থরে সাজানো ডিজে বক্স। তাতে বাজছে এআই নির্মিত ‘থিম সং’। গণসঙ্গীতের পুরনো ধাঁচ ভুললেও গণনৃত্যের নতুন ধারা দেখা যাচ্ছে। ডিজে বক্সে বাজছে এআই নির্মিত তালের গান। আর তার সঙ্গে হইহই করে নাচছেন সিপিএমের কর্মী-সমর্থকেরা। রবিবার সকালে উত্তরপাড়ায় দঙ্গল বেঁধে নাচ মিনাক্ষীর ফেসবুক পেজ থেকে সরাসরি সম্প্রচারও করা হয়েছে।
আরও পড়ুন:
যদিও সবটাই এআই দিয়ে হচ্ছে তা নয়। যেমন যাদবপুর এবং টালিগঞ্জের সিপিএম প্রার্থী যথাক্রমে বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য এবং পার্থপ্রতিম বিশ্বাসের সমর্থনে যে ‘থিম সং’ প্রকাশ হয়েছে, তা নির্মাণ করেছেন বাম মহলে গান বানানোর পরিচিত ত্রয়ী রাহুল পাল, রিয়া দে এবং নীলাব্জ নিয়োগী। মানব মস্তিষ্কের মাধ্যমেই নির্মিত হয়েছে সেই গান। যদিও প্যারোডির আশ্রয় নিয়েছেন রাহুল-রিয়ারা। যাদবপুরের ক্ষেত্রে হ্যারি বেলাফন্টের ‘জামাইকা ফেয়ারওয়েল’-এর সুরে। আর টালিগঞ্জের গান নির্মিত হয়েছে ‘জিনা ইসিকা নাম’-এর আদলে। দুই ক্ষেত্রেই গানের কথায় জায়গা পেয়েছে কলোনি এলাকায় বামেদের পুরনো লড়াইয়ের কথা।
বাম রাজনীতির ইতিহাসে প্যারোডি নতুন নয়। সত্তরের দশকে ‘গুমনাম’ ছবির গানের অনুকরণে নতুন নির্মাণ করেছিল গণনাট্যসংঘ। সাম্প্রতিক সময়ে ‘টুম্পা সোনা’র প্যারোডিও করেছিল বামেরা। যদিও তা ছিল ব্রিগেড সমাবেশের প্রচারের গান।
তবে এ বারের বিধানসভা ভোটে তুলনায় এআই-এর রমরমা দেখা যাচ্ছে বামেদের প্রচারের গানে। কোনও কোনও কেন্দ্রে তো একাধিক গান নির্মাণ করে ফেলেছেন সিপিএমের লোকজন। তবে এ ব্যাপারে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা রাখেনি সিপিএম। বরং বিকেন্দ্রীকরণের দৃষ্টিভঙ্গিতেই পুরো বিষয়টি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে স্থানীয় স্তরের সংগঠনের উপর। বাম রাজনীতিতে এই সংস্কৃতি কি খুব স্বাস্থ্যকর? ক্যালক্যাটা কয়্যারের কল্যাণ সেন বরাটের কথায়, ‘‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উপর আমার কোনও শ্রদ্ধা নেই। একজন রক্তমাংসের মানুষ যা পারেন, এআই তা পারে না। সে কারণে এই প্রবণতাকে আমি সমর্থন জানাচ্ছি না।’’ ঘোষিত ‘বামপন্থী শিল্পী’ শুভেন্দু মাইতির কথায়, ‘‘এটা মোটেই শুভ সঙ্কেত নয়। মানুষ যন্ত্রের দাসত্ব করলে অধঃপতন অনিবার্য। দলের বকলস না-পরেও আমি নীতিগত ভাবে বামপন্থী। ভোট দিলে হয়তো বামেদেরই দেব। কিন্তু প্রযুক্তি কখনও মানুষের গানের জন্ম দিতে পারে না।’’
কিন্তু এই যুক্তি মানতে রাজি নয় সিপিএম। দলের ইতিহাসে প্রথম ‘ক্রিয়েটিভ টিম’এর মাথা হিসাবে রাজ্য কমিটিতে জায়গা পাওয়া ধ্রুবজ্যোতি চক্রবর্তীর কথায়, ‘‘জন হেনরির সময়ে হাতুড়ির ঘায়ে ঘায়ে পাহাড় কাটা হত। এখন ডিনামাইট ফাটিয়ে হয়। সময় বদলানোর সঙ্গে এটা সাধারণ বিষয়। এর মধ্যে কোনও বিতর্ক নেই।’’ ঘটনাচক্রে, ধ্রুব নিজেও গীতিকার। সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ছবিতেও তিনি গান লিখেছেন। সিপিএম সূত্রের খবর, এআই দিয়ে গান বানানোর আরও একটি বড় কারণ হচ্ছে, এতে খরচ নেই। এই ‘দুর্দিনে’ সেটাও গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিমত অনেকের।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, প্রচুর পরিমাণে ভোট পড়লে তা সাধারণত স্থিতাবস্থা বা প্রতিষ্ঠানবিরোধী হয়। অর্থাৎ, ক্ষমতাসীন সরকারের বিপক্ষে যায় জনতার রায়। তবে দীর্ঘলালিত এই ধারণার প্রতিযুক্তিও ছিল। তৃণমূলের তরফে গত লোকসভা এবং বিধানসভা ভোটের উদাহরণ দিয়ে দাবি করা হচ্ছিল, অনেক ভোট পড়লেও এ রাজ্যে তা শাসকের পক্ষেই গিয়েছে বরাবর। বিজেপির পাল্টা যুক্তিতে আবার ছিল ২০১১ সালের ‘পরিবর্তনের ভোট’। সে বারও প্রচুর ভোট পড়েছিল এবং ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে নতুন সরকার গড়েছিলেন মমতা। এ বারের ভোটে এসআইআর সুবিধা করে দিল বিজেপির।
- ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) যে হয়রানিকে প্রচারে হাতিয়ার করেছিল তৃণমূল, তা কাজে এল না। পশ্চিমবঙ্গবাসী ভোট দিলেন বিজেপির পক্ষেই। ফলে এ রাজ্যেও ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার তৈরি হতে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গ জয় করেছে বিজেপি। গত লোকসভা নির্বাচনেও যে দল সে ভাবে দাঁত ফোটাতে পারেনি, দু’বছরের ব্যবধানে তারাই ২০০-র গণ্ডি ছুঁয়ে ফেলেছে। জেলায় জেলায় পদ্মের ঝড়ে উড়ে গিয়েছেন তৃণমূল প্রার্থীরা।
-
১৭:১৭
ভোট-পরবর্তী গোলমালে রুজু ২০০ এফআইআর! কেউ কেউ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অশান্তি পাকাতে চাইছেন: ডিজি সিদ্ধনাথ -
০০:৩১
দিকে দিকে আক্রান্ত বাম-বিজেপি-তৃণমূল! খাস কলকাতায় চলল বুলডোজ়ার, বসিরহাটে জখম পুলিশ -
২৩:১৭
‘কমিশন ১০টি গণনাকেন্দ্রের ছয় ঘণ্টার ফুটেজ দিক, দেখাক কিছু হয়নি, আমি মেনে নেব এটাই জনাদেশ’! চ্যালেঞ্জ অভিষেকের -
২১:৫৫
৪৫ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে রাজ্যে ২০৭টি আসনে জয় পেল বিজেপি! ৮০টি আসনে জয়ী তৃণমূল, তাদের ভোটের হার কত -
সিসিটিভি বন্ধ করে গণনাকেন্দ্রে শারীরিক নিগ্রহের অভিযোগ মমতার! ‘অসত্যভাষণ’ বলে ওড়ালেন নির্বাচনী আধিকারিক