এ বারের নির্বাচনে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রে প্রার্থী হয়েছেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। পাশাপাশি তিনি প্রার্থী হয়েছেন নিজের বিধানসভা কেন্দ্র নন্দীগ্রামেও। দু'টি বিধানসভা কেন্দ্রে তিনি ভয়ের বাতাবরণ তৈরি করছেন বলে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ দায়ের করেছে তৃণমূল। সঙ্গে তাঁর মনোনয়ন বাতিলের দাবিও জানিয়েছে শাসকদল। বুধবার পর পর দু’টি চিঠি লিখে নির্বাচন কমিশনে শুভেন্দুর বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছেন তৃণমূলের রাজ্যসভার দলনেতা ডেরেক ও'ব্রায়েন। ঘটনাচক্রে, বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের উপস্থিতিতে দক্ষিণ কলকাতার সার্ভে বিল্ডিংয়ে ভবানীপুরের বিজেপি প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন দাখিল করেছেন শুভেন্দু। তার পরেই তৃণমূল এই জোড়া চিঠি প্রকাশ্যে এনেছে।
একটি চিঠিতে তৃণমূলের দাবি, শুভেন্দু কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে মারধর এবং ‘কাশ্মীরের মতো সোজা করে দেওয়ার’ হুমকি দিয়েছেন। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রূপেশ কুমার এবং অজয় নন্দার মতো উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাদের নাম ধরে হুমকি দিয়েছেন তিনি, রাজ্য প্রশাসনকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছেন। তৃণমূলের মতে, এই ধরনের মন্তব্য জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫১-এর ১২৩(২) ধারা অনুযায়ী ‘দুর্নীতিমূলক আচরণ’ এবং ভারতীয় ন্যায় সংহিতা, ২০২৩-এর ১৭৪ ও ৩৫১(২) ধারার পরিপন্থী। তৃণমূলের পক্ষ থেকে ডেরেক এই অভিযোগপত্রটি জমা দিয়েছেন। চিঠিতে শুভেন্দুকে শো কজ় করা এবং অবিলম্বে বর্তমান নির্বাচন থেকে তাঁকে অযোগ্য ঘোষণার দাবি জানানো হয়েছে। নির্বাচনের পরিবেশ অবাধ ও শান্তিপূর্ণ রাখতে কমিশনকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আর্জিও জানিয়েছে শাসকদল।
দ্বিতীয় চিঠিতে তৃণমূল অভিযোগ করেছে, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় শুভেন্দু নির্বাচন কমিশনের বেঁধে দেওয়া সুনির্দিষ্ট নিয়ম ভেঙেছেন। কমিশনের নির্দেশিকার ৩০ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রিটার্নিং অফিসারের কক্ষে প্রার্থী-সহ সর্বাধিক পাঁচ জন ব্যক্তি প্রবেশের অনুমতি পান। কিন্তু বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিয়োর কথা উল্লেখ করে তৃণমূল দাবি করেছে যে, শুভেন্দুর মনোনয়ন দাখিলের সময় ওই কক্ষে অনেক বেশি মানুষ উপস্থিত ছিলেন। চিঠিতে শুধুমাত্র প্রার্থীর বিরুদ্ধেই নয়, বরং রিটার্নিং অফিসার এবং সাধারণ পর্যবেক্ষকের ভূমিকা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন:
ডেরেক অভিযোগ করেছেন যে, রিটার্নিং অফিসারের নজরদারিতেই এই নিয়ম লঙ্ঘন হয়েছে, যা তাঁর কর্তব্যপরায়ণতার অভাব এবং পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের প্রমাণ। পাশাপাশি তাঁর অভিযোগ, উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও সাধারণ পর্যবেক্ষক কোনও সংশোধনমূলক বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। এই ধরনের ঘটনা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে বলেও অভিযোগ ডেরেকের। নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠানো এই অভিযোগপত্রে তৃণমূল কংগ্রেস মূলত পাঁচটি বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের আবেদন জানিয়েছে। প্রথমত, রিটার্নিং অফিসার এবং সাধারণ পর্যবেক্ষকের কাছ থেকে এই ঘটনার ব্যাখ্যা চেয়ে রিপোর্ট তলব করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কর্তব্যে গাফিলতির জন্য সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারকে অপসারণ করে সেখানে এক জন নিরপেক্ষ আধিকারিককে নিয়োগ করতে হবে। তৃতীয়ত, কমিশনের নির্দেশিকা যাতে সমস্ত প্রার্থী সমান ভাবে মেনে চলেন, তা নিশ্চিত করতে কড়া নির্দেশ দিতে হবে। চতুর্থত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, নিয়ম লঙ্ঘনের দায়ে শুভেন্দু অধিকারীর মনোনয়ন বাতিল করতে হবে। পঞ্চম, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় অন্যান্য আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
চিঠির প্রতিলিপি দিল্লির কেন্দ্রীয় মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকেও পাঠানো হয়েছে তৃণমূলের তরফে। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে ভবানীপুর এবং নন্দীগ্রামের মতো কেন্দ্রে এই অভিযোগ রাজনৈতিক মহলে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে।