মালদহ কাণ্ডে প্রকৃত অভিযুক্তদের না ধরে ‘নির্দোষদের’ গ্রেফতার করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে তোপ দেগে এমনটাই অভিযোগ তুললেন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুক্রবারের পর শনিবার ফের একবার তিনি তুলে ধরলেন ‘বহিরাগত’ তত্ত্ব। অন্য দিকে, বিজেপি আবার ধৃতের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলে পাল্টা বিঁধছে তৃণমূলকে। পদ্মশিবিরের দাবি, ধৃত তৃণমূলেরই ‘ঘনিষ্ঠ’। এই রাজনৈতিক আক্রমণ এবং প্রতিআক্রমণের মাঝে মালদহে অনুসন্ধান চালাচ্ছে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ-ও।
মালদহের মোথাবাড়ি বিধানসভা কেন্দ্রের কালিয়াচক ২ ব্লক অফিসে বিচারকদের ঘেরাও এবং ‘তাণ্ডব’ ঘিরে গত কয়েক দিন ধরেই তপ্ত রাজ্য রাজনীতি। এরই মধ্যে শনিবার মালদহের তিন প্রান্তে তিনটি জনসভা করলেন মমতা— মানিকচক, মালতিপুর এবং গাজোলে। পরে একটি মিছিলও করেন তিনি। শনিবারের নির্বাচনী প্রচারসভাগুলি থেকে ফের বিচারকদের ঘেরাওয়ের ঘটনা নিয়ে মন্তব্য করেন তিনি। তুলে ধরেন ‘বহিরাগত’ তত্ত্ব। মালদহ কাণ্ড নিয়ে জনতাকে সতর্কও করে দেন তিনি।
মোথাবাড়ির ঘটনায় শনিবার বিকেল পর্যন্ত ৩৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার মধ্যে শনিবারই পাকড়াও করা হয়েছে দুই স্থানীয় বাসিন্দাকে। সাম্প্রতিক গ্রেফতারিগুলির প্রসঙ্গে মানিকচকের সভা থেকে কমিশনকে নিশানা করেন মমতা। তৃণমূলনেত্রী বলেন, “যারা দোষ করেছে, তাদের গ্রেফতার করোনি। নির্দোষদের গ্রেফতার করছ কেন?” সরাসরি কমিশনের নামোল্লেখ করেননি মমতা। তবে রাজ্যে ভোট ঘোষণার পর থেকে আদর্শ আচরণবিধি কার্যকর হয়ে গিয়েছে। এই সময়ে বকলমে পুলিশ প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ থাকে কমিশনের হাতেই।
একই সঙ্গে মালদহের সাধারণ জনতাকেও সতর্ক করে দেন মমতা। মালদহের কালিয়াচকে যে ঘটনা ঘটেছে, তার যাতে কোনও পুনরাবৃত্তি না হয়, তা নিয়ে সাবধান করে দেন জনতাকে। বিচারকদের ঘেরাও করার নেপথ্যে ‘বহিরাগত’ তত্ত্ব উস্কে দিয়ে সাধারণ জনতাকে এ সবের থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেন তৃণমূলনেত্রী। ধরপাকড়ের সময়ে স্থানীয় বাসিন্দাদেরও যে পাকড়াও করা হচ্ছে, সে কথাও মনে করিয়ে দেন তিনি। মমতা বলেন, “জাজেদের কাছে নিজেরা যাবেন না। দু’টো দল এসে জাজেদের ঘেরাও করে পালিয়ে গেল। মাঝখান থেকে স্থানীয় ছেলেমেয়েরা হেনস্থার শিকার হচ্ছেন। এনআইএ-র নাম করে ৪০-৫০ জনকে গ্রেফতার করা হচ্ছে।’’
আরও পড়ুন:
কালিয়াচকে যে ঘটনা ঘটেছে, তা যাতে অন্য কোথাও না ঘটে সে বিষয়েও সতর্ক করে দিয়েছেন তিনি। কোথাও এমন ঘটনা ঘটলে স্থানীয় বাসিন্দারাই যে সমস্যায় পড়বেন, তা মনে করিয়ে দিয়েছেন মমতা। মোথাবাড়িতে গ্রেফতারির কথা মনে করিয়ে তিনি বলেন, “অশান্তির মধ্যে যাবেন না। এলাকা থেকে ৪০ জন ছেলেকে তুলে নেবে। যেটা মালদহে করেছে।”
ভোটের আগে পশ্চিমবঙ্গে গোলমাল পাকানোর জন্য ভিন্রাজ্য থেকে সমাজবিরোধীদের এ রাজ্যে ঢোকানো হতে পারে, এমন আশঙ্কাও করছেন তিনি। মানিকচকের সভা থেকে তিনি বলেন, “দেখবেন ট্রেনে, বাসে করে যেন গুন্ডা না ঢোকে। বাইরে থেকে কারা আসছে, কোন হোটেলে থাকছে, দেখবেন। টাকা আমদানি হচ্ছে বাইরে থেকে। কেন্দ্রীয় সরকার এর সঙ্গে যুক্ত। এজেন্সিকে দিয়ে এ সব করছে। আমি ভয় পাইনি। আপনারাও পাবেন না।” পরে গাজোলের সভা থেকেও এ নিয়ে মন্তব্য করেন মমতা। নাকা চেকিং কতটা গুরুত্ব দিয়ে করা হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন মমতার। তাঁর অভিযোগ, কেউ বিজেপি করলে তাঁকে নাকা চেকিংয়ের সময়ে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।
আরও পড়ুন:
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার অভিযোগ ঘিরে মোথাবাড়িতে তাণ্ডব চলেছে। বস্তুত, নাম বাদ পড়া ভোটারেরা যাতে নিজেদের দাবি এবং অভিযোগ জানাতে পারেন, সে জন্য ইতিমধ্যে ট্রাইবুনাল গঠন করা হয়েছে। সে কথাও স্মরণ করিয়ে দেন মমতা। কারও নাম বাদ গেলে ট্রাইবুনালে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। একই সঙ্গে ওয়াকফ নিয়েও এক শ্রেণির মানুষ সাধারণ জনতাকে ভুল বোঝাচ্ছে, এমন অভিযোগও তোলেন মমতা।
মালদহ কাণ্ডে শনিবার বিকেল পর্যন্ত যাঁদের গ্রেফতার করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মোথাবাড়ির আইএসএফ প্রার্থী। এ ছাড়া গ্রেফতার হয়েছেন তাণ্ডবের মূলচক্রী মোফাক্কেরুল ইসলামও। এই মোফাক্কেরুলের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিস্তর আলোচনা শুরু হয়েছে। তিনি ২০২১ সালের ভোটে আসাদউদ্দিন ওয়েইসির দল মিম-এর হয়ে প্রার্থী হয়েছিলেন। সেই তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই তৃণমূল বার বার ‘বহিরাগত’ তত্ত্ব তুলে ধরতে শুরু করেছে। তৃণমূলনেত্রী মমতাও মালদহে দাঁড়িয়ে নাম না-করে আসাদউদ্দিন ওয়েইসির দল মিম-কে কটাক্ষ করেছেন তিনি। তাঁর স্পষ্ট অভিযোগ, ‘‘হায়দরাবাদ থেকে এসেছে বিজেপির কোকিল। তার সঙ্গে কিছু সাম্প্রদায়িক লোকজন। মালদহে তারাই এ সব করছে।’’
তবে ধৃত এই ব্যক্তির অতীত রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে আরও বেশ কিছু তত্ত্ব উঠে আসতে শুরু করেছে। মোফাক্কেরুলের পুরনো বেশ কিছু ছবি সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যা তাঁর ‘তৃণমূল ঘনিষ্ঠতার’ দিকেই ইঙ্গিত করে বলে দাবি করছেন অনেকে (ওই ছবিগুলির সত্যতা যাচাই করেনি আনন্দবাজার ডট কম)। সেই ‘শাসক ঘনিষ্ঠতা’র তত্ত্ব টেনেই তৃণমূলকে খোঁচা দিতে শুরু করেছে বিজেপি। রাজ্য বিজেপি-র সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের দাবি, মালদহের ঘটনা ‘পুরোপুরি তৃণমূল পরিকল্পতি এবং তৃণমূল অনুমোদিত’।
শনিবার কোচবিহারে শমীক বলেন, ‘‘মালদহের ঘটনা একটা পরিকল্পিত তৃণমূলী চক্রান্ত। তৃণমূলই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র দিচ্ছে, তৃণমূলই উত্তর দিচ্ছে, তৃণমূলই নম্বর বসিয়ে দিচ্ছে। সরকারি কর্মচারী কিংবা বিচারপতিদের উপরে আক্রমণ হচ্ছে। তাদের আবার তৃণমূলই গ্রেফতার করাচ্ছে। যাঁকে গ্রেফতার করাচ্ছে, তিনি আবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভামঞ্চে।’’ শমীকের ব্যাখ্যা, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটা উচ্চনিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে থাকেন। তাঁর মঞ্চে যিনি উপস্থিত হতে পারেন, তিনি কোনও সাধারণ ব্যক্তি নন, তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা!’’ রাজ্য বিজেপি সভাপতির তোপ, ‘‘মালদায় যে ঘটনা ঘটেছে, তা তৃণমূল পরিকল্পিত, তৃণমূল অনুমোদিত এবং তৃণমূলেরই অনুপ্রেরণায় সংঘটিত হয়েছে। জাতীয় সড়ক অবরোধ করে যে ভাবে দক্ষিণবঙ্গ এবং উত্তরবঙ্গের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে চেয়েছে, তা একটি সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত।’’
মালদহের ঘটনায় ইতিমধ্যে অনুসন্ধান শুরু করেছে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ। প্রাথমিক অনুসন্ধানের ভিত্তিতে তাদের রিপোর্ট জমা দিতে হবে। সেই রিপোর্ট তৈরির আগে সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজখবর নিতে শুরু করেছেন এনআইএ-র আধিকারিকেরা। কালিয়াচকে ঘেরাও হওয়া বিচারকদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে শুক্রবার কথা বলে এনআইএ। সে দিন ঠিক কী ঘটেছিল, তা জানার জন্য বিচারকদের সঙ্গে কথা বলেন এনআইএ আধিকারিকেরা। শনিবারও পুলিশ সুপারের অফিস, স্থানীয় থানা এবং বিডিও অফিসে গিয়ে কথা বলেন তাঁরা। কী ঘটেছিল, ওই ঘটনার নেপথ্যে কারা থাকতে পারেন, কোনও মদতদাতা রয়েছেন কি না, এ সব বিষয়ে বিশদ তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছেন আধিকারিকেরা।