E-Paper

বঙ্গে কমছে সংখ্যালঘু ভোটার, প্রশ্নে প্রভাব-অঙ্ক

রাজ্যে এসআইআর প্রত্রিুয়া শুরুর আগে ভোটার সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ। সংশোধনের প্রক্রিয়া বঙ্গে এক ধাক্কায় ১২% ভোটার কমিয়ে দিয়েছে। কমিশন ও অন্যান্য সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যের প্রাথমিক হিসেবে উঠে আসছে, মোট সংখ্যালঘু ভোটার কমেছে ৫%-এর সামান্য কিছু বেশি।

সন্দীপন চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ১০ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:৩০

—প্রতীকী চিত্র।

পশ্চিমবঙ্গে এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে আর সব বিষয়কেই ছাপিয়ে গিয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)। এখনও পর্যন্ত এসআইআর নামক কার্পেটের নীচে চাপা পড়ে গিয়েছে আর সব প্রশ্ন! কার ঘরে কত সিঁদ কাটছে এসআইআর, সে সব নিয়ে চলছে চুলচেরা হিসেব। তবে নির্বাচন কমিশন বিবেচনাধীন ভোটারের নিষ্পত্তির তালিকা দিয়ে দেওয়ার পরে বোঝা যাচ্ছে, রাজ্যের কমে যাওয়া ভোটার তালিকায় ভিত্তিরেখা বেশ খানিকটা নেমে এসেছে সংখ্যালঘু ভোটারের। এসআইআর-এর এই ফলাফল ভোটের ফলে কত এব‌ং কেমন প্রভাব ফেলতে পারে, সেই প্রশ্ন আপাতত ভাবাচ্ছে সব শিবিরকে!

রাজ্যে এসআইআর প্রত্রিুয়া শুরুর আগে ভোটার সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ। সংশোধনের প্রক্রিয়া বঙ্গে এক ধাক্কায় ১২% ভোটার কমিয়ে দিয়েছে। কমিশন ও অন্যান্য সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যের প্রাথমিক হিসেবে উঠে আসছে, মোট সংখ্যালঘু ভোটার কমেছে ৫%-এর সামান্য কিছু বেশি। পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু ভোট গড়ে প্রায় ৩০%, সাম্প্রতিক কালে এই সাধারণ হিসেব ধরেই যাবতীয় নির্বাচনের অঙ্ক হয়েছে। এ বার সংখ্যালঘু ভোটারের ভিত্তিরেখা কমে যাওয়ায় সেই অঙ্ক বদলাতে পারে। বিশেষত, সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু উভয় অংশের ভোটার উল্লেখযোগ্য হারে আছেন, এমন সব বিধানসভা আসনে পাল্লা কোন দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে, নিশ্চিত করে বলার জায়গায় কেউ নেই। কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে ভোট দেওয়ার উপযুক্ত থাকছেন প্রায় ৬ কোটি ৭৫ লক্ষ মানুষ। বিবেচনাধীন তালিকা থেকে বাদ পড়ে যাঁরা ট্রাইবুনালে আবেদন করছেন, তাঁদের এই নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ কার্যত নেই।

এই সূত্রে উল্লেখ করা যেতে পারে, খসড়া ভোটার তালিকা বেরোনোর পরে শুনানির নোটিস (মূলত যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির কারণে) পেয়েছিলেন প্রায় এক কোটি ৫০ লক্ষ মানুষ। আর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পরে ‘বিবেচনাধীন’ হয়েছিলেন ৬০ লক্ষ। শুনানির তালিকায় থাকা ভোটারদের মধ্যে সরাসরি কমিশনের হাতে থাকা প্রক্রিয়ায় ৯০ লক্ষের ফয়সালা হয়েছে, বাদ গিয়েছে ৫ লক্ষের কিছু বেশি। আর বিচার বিভাগের প্রক্রিয়ায় যাওয়ার পরে ৬০ লক্ষের ফয়সালা হয়েছে, যার মধ্যে ২৭ লক্ষ বাদ। যা দেখিয়ে বিরোধীরা বলছে, ‘বিচারাধীন’ থেকে ৩২ লক্ষ ভোটারের নাম তোলার ‘কৃতিত্ব’ যদি সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করার সুবাদে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, তা হলে ২৭ লক্ষ বাদের ‘দায়’ কে নেবে!

সংখ্যালঘু ভোটার কমে যাওয়ার প্রভাব নির্বাচনে কী ভাবে পড়তে পারে, তার প্রাথমিক ইঙ্গিত পেতে গেলে একটু ফিরে দেখতে হবে অতীতে। রাজনৈতিক শিবিরের একাংশের মতে, গত লোকসভা নির্বাচনের হিসেবকে সব ক্ষেত্রে তুলনার মাপকাঠি ধরা উচিত নয়। কারণ, লোকসভা ভোট ছিল কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদীর সরকার গড়ার প্রশ্নে। বিধানসভার ভোট মমতার ফের রাজ্যে সরকার গড়া বনাম বিজেপি-সহ বিরোধীদের লড়াই। এই যুক্তি মেনেই স্মরণ করা যেতে পারে, পাঁচ বছর আগে রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের সময়ে ভোটার ছিলেন ৭ কোটি ৩৪ লক্ষ। সংখ্যালঘু ভোট ৩০% বা তার বেশি, এমন ৮৯টি আসনের মধ্যে ৮৭টিই সে বার গিয়েছিল শাসক তৃণমূলের দখলে। সংখ্যালঘু ভোট ২০% বা তার আশেপাশে, সেই নিরিখে ধরলে ১১২টি আসনের মধ্যে ১০৬টি আসনে জয়ী হয়েছিল তৃণমূল। বিজেপিকে রুখতে সে বার সংখ্যালঘু ভোট এককাট্টা হয়েছিল মমতার বাক্সে। সংখ্যালঘু ভোট-ব্যাঙ্কে বিজেপির যে হেতু কার্যত কোনও ভাগ নেই, তাই এই অংশের ভোটের প্রভাব পড়ার কথা মূলত তৃণমূল এবং কিছুটা কংগ্রেস-বামের। বিজেপির ‘বিপদ’ সামনে রেখে মমতা গোড়াতেই ৩০% ভোট বাক্সে নিয়ে যে ময়দানে নামতে পারতেন, সেই ছবি এ বার কিছুটা বদল হবে বলেই আশাবাদী পদ্ম শিবির। সংখ্যালঘু-অধ্যুষিত আসনে ব্যবধানের হেরফের ঘটলেও মূল ফল হয়তো বদলাবে না, কিন্তু মিশ্র আসনে ওলটপালট হতে পারে, এমনই ভাবনা তাদের।

বিবেচনাধীন তালিকা থেকে সংখ্যালঘু ভোটার বাদ গিয়েছে ৬৫%-এর বেশি। যার প্রেক্ষিতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বলছেন, ‘‘দেখে দেখে মুর্শিদাবাদ পুরো বরবাদ, মালদহ পুরো বরবাদ! ভবানীপুর কেন বরবাদ, হুগলি জেলা কেন বরবাদ? ২৪ পরগনা কেন বরবাদ? উত্তর দিনাজপুর কেন বরবাদ? মানুষের নাম কেটে, ভোটার বাদ দিয়ে জোর করে নির্বাচনে জেতার পরিকল্পনা করছে ওরা (বিজেপি।’’ তবে তৃণমূল শিবির সরকার গড়ার প্রশ্নে বড় ক্ষতির আশঙ্কা করছে না। তাদের যুক্তি, এসআইআর-এর প্রথম দুই পর্বে যত হিন্দু নাম বাদ পড়েছে, তার ধাক্কা বিজেপিকে সামলাতে হবে! মোট যত নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে, তার দুই-তৃতীয়াংশই হিন্দু। ফলে, বিজেপির স্বপ্নের গুড়ে বালি পড়বে বলেই তৃণমূল শিবিরের ভোট-কুশালীদের দাবি।

এমতাবস্থায় বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বলছেন, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা শুভেন্দু অধিকারীর নাম তো বাদ পড়েনি! বাদ গিয়েছে ভুয়ো ভোটার আর বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীরা। হিন্দুদের মধ্যেও কিছু বাদ গিয়েছে। তবে সংশ‌োধিত নাগরিকত্ব আইনে (সিএএ) মতুয়ারা নাগরিকত্ব পাবেন, ভোটার তালিকাতেও তাঁদের নাম উঠবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যত ক্ষণ আছেন, কোনও চিন্তা নেই।’’ বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের দাবি, ‘‘আমরা হরিজন-গিরিজন, আদিবাসী-বনবাসী, মতুয়া-রাজবংশী দেখে রাজনীতি করি না। গোটা রাজ্যের মানুষের জন্য আমাদের পরিকল্পনা, ভাবনা। এই ভোটটা মমতা বনাম জনতার লড়াই!’’

রোহিঙ্গা ও অনুপ্রবেশকারী খুঁজতে গিয়ে কমিশনকে কাজে লাগিয়ে বিজেপি সকলকে বিপদে ফেলেছে বলে দাবি করে সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী বলছেন, ‘‘সংখ্যালঘু, মতুয়া-সহ অজস্র গরিব মানুষের নাম অযৌক্তিক ভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। গরিব মানুষকে হেনস্থা কারা হয়েছে, ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। গরিব, প্রান্তিক মানুষের জন্য আমরা লড়ে যাব।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

SIR Election Commission

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy