Advertisement

মোদীর কপালে দিলাম ফোঁটা, দিদির দুয়ারে পড়ল কাঁটা! এক নয়, অন্তত সাত-সাতটি কাঁটায় বিদ্ধ মমতা সরকার ক্ষমতাচ্যুত

মানুষ একবার কিছু বিশ্বাস করে নিলে খুব মুশকিল। বিশ্বাসে মিলায় বস্তু। আর ভারত তো বিশ্বাসীদের দেশ। শুধু বিশ্বাস নয়, আস্থাও হারিয়েছিল সরকার। অনেকেরই মনে হচ্ছিল, সুযোগ পেলেও শোধরানোর ইচ্ছা তো তাদের নেই-ই, এলেমও নেই।

স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ০৬ মে ২০২৬ ১৩:২২
Seven reasons behind the fall of Mamata Banerjee government and the success of Narendra Modi led BJP in West Bengal

মমতার ভুল অঙ্কও তাঁকে হারিয়ে দিল। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

প্রথম কারণ: অর্থনীতি

শুরুতেই ছিল শেষের সম্ভাবনা। সাল ২০০৮। সিঙ্গুরে তাঁর নেতৃত্বে প্রায় দু’বছর-ব্যাপী আন্দোলন টাটাদের গাড়ি কারখানা শুরু হওয়ার আগেই উঠিয়ে দিল। আশঙ্কা সত্যি করে সেই সঙ্গেই স্তব্ধ হল শিল্পায়নের গতি। প্রায় দু’দশক কাটলেও রাজ্যে আর কোনও বড় শিল্প আসেনি। কৃষিজমি রক্ষার আন্দোলন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক সাফল্যের কারণ। জমি অধিগ্রহণ নিয়ে তুমুল বিতর্কের মধ্যে বামেদের ভুল পদক্ষেপ-সহ নানা কারণে শেষমেশ সরকারই উল্টে যায়।

কিন্তু যে কারণে দিদি সফল, সেই কারণই বাংলার অর্থনীতির প্রতি এক অভিশাপ হয়ে ওঠে। কারণ, শিল্প বনাম জমি, এই সংঘাতের কোনও সমাধান না করে যে কোনওরকম জমি অধিগ্রহণ নিয়েই বিরূপ অবস্থান নেয় তাঁর সরকার। শেষমেশ দেখা গেল, তিনি থাকলে শিল্প আসবে না, এই ধারণা গেড়ে বসেছে তরুণ সমাজের মধ্যে। দু’দশক আগে ‘শিল্প আমার ভবিষ্যৎ’ স্লোগানে সাড়া দিয়ে যে চাকরিপ্রত্যাশী তরুণের ভোট বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বাম সরকারকে ২৩৫ আসন দিয়ে ক্ষমতায় এনেছিল, চাকরি নিয়ে হাহাকার করা সেই তরুণেরা এ বার মসনদ থেকেই নামিয়ে দিলেন মমতাকে।

এমনিতেই ভারতের বণিকসমাজ বাংলার প্রতি বিশেষ সদয় ছিল না। ট্রেড ইউনিয়ন, নকশালবাড়ি আন্দোলন, রাজনৈতিক হিংসা, ইত্যাদি নানা কারণে বাংলায় বিনিয়োগে অনীহা ছিল। বুদ্ধদেব প্রায় একক চেষ্টায় সেই বরফ খানিক গলাতে পেরেছিলেন। প্রতি বছর আসছিল নতুন বিনিয়োগ। সিঙ্গুরে টাটাদের গাড়ির কারখানা হত বুদ্ধবাবুর মুকুটে কোহিনুর। কিন্তু সে আশার গুড়ে বালি পড়ল।

সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম থেকে টাটা-সালেমদের বিদায়ের পরেও সম্ভাবনা ছিল। ইনফোসিস এবং টিসিএস-এর আইটি পার্কের জন্য জমি বামফ্রন্ট সরকারেরই দেওয়া ছিল। ইনফোসিস তো জমি বাবদে প্রাথমিক টাকাও দিয়ে দিয়েছিল। বাকি ছিল শুধু ওই দুটি প্রকল্পকে ‘সেজ’ বা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসাবে ঘোষণার জন্য সুপারিশ করে রাজ্য সরকারের তরফে কেন্দ্রকে একটি চিঠি। সেই চিঠি মমতা আর দিলেন না। ‘সেজ’-এর বিরুদ্ধে তাঁর নীতিগত অবস্থান, ‘সেজ’ তিনি হতে দেবেন না। ২০১৪ সালে পাততাড়ি গোটাল ইনফোসিস। পরের বছরই তারা বড় বিনিয়োগ করল ওড়িশায়। ক্রমে বিদায় নিল টিসিএস-ও। আদানি মাঝে মাঝে এলেন। কিন্তু বিনিয়োগ করলেন না। মুকেশ অম্বানীও এলেন। কিন্তু তাঁর কোম্পানিও মূলত মাটি খুঁড়ে অপটিক্যাল ফাইবার লাগানোর কাজ ছাড়া বিশেষ কোনও বিনিয়োগ করেনি। অর্থনীতিবিদ মৈত্রীশ ঘটক, তনিকা চক্রবর্তী ও দিলীপ মুখোপাধ্যায়ের গবেষণা দেখাচ্ছে, ২০১২ সাল পর্যন্ত রাজ্যে এবং সমগ্র ভারতে শহুরে দারিদ্র প্রায় একই গতিতে হ্রাস পেয়েছিল। তবে,২০২৩ সালে দেশের (৩%) তুলনায় রাজ্যে শহুরে (৭%) দারিদ্রের হার বেশি হয়ে যায়। কারণ, শিল্প-সংক্রান্ত কর্মসংস্থান নেই। আয় বাড়ছে না।

তৃণমূলের সরকার অবশ্যই এ সব মানতে চায়নি। তারা বারবার বলেছে ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্পে রাজ্যের অগ্রগতির কথা। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, তাঁরা দু’কোটি কর্মসংস্থান তৈরি করেছেন। সরকারি তথ্য অনেকেই বিশ্বাস করেননি। কারণ, চোখে কিছু দেখা যায়নি। অন্যান্য রাজ্যে বড় শিল্প আসছে, সে খবর মানুষ কাগজে, টিভিতে দেখছেন। এখানে মুখ্যমন্ত্রীকে কোনও বড় কারখানার ফিতে কাটতে দেখা গেল কই?

অর্থনীতিবিদ সুরজিত ভাল্লা সম্প্রতি দেখিয়েছেন, ১৯৫০ থেকে ১৯৭৬ পর্যন্ত প্রতি বছর রাজ্যে মাথাপিছু আয় জাতীয় গড়ের তুলনায় ০.৯ শতাংশ হারে কমেছিল। তার পর থেকে ২০১০ পর্যন্ত, অর্থাৎ, বাম আমলে তা কমেছিল বার্ষিক ০.৩ শতাংশ হারে। কিন্তু ২০১১ থেকে ২০২৪ এর মধ্যে মাথাপিছু আয়হ্রাসের হার আরও ত্বরান্বিত হয়ে বার্ষিক ১ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় ঘোরার সময় রাজ্যের আর্থিক অবনমন নিয়ে আলোচনা লক্ষ্য করে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এ বারের লড়াইয়ে বিজেপিই এগিয়ে আছে। কোভিড মহামারির সময়েই অবশ্য দেখা গিয়েছিল, রাজ্য থেকে লাখো মানুষ বেরিয়ে গিয়েছেন কাজের সন্ধানে। এ বার নির্বাচনের আগেও দেখা গেল দলে দলে তাঁদের ফিরতে। অধিকাংশেরই সস্তার কাজ। কিন্তু সে মজুরিও এখানকার থেকে বেশি। এক প্রাক্তন আমলা মমতা সম্পর্কে বলছিলেন, “শিল্পবান্ধব পরিস্থিতি তৈরি করতেই কেমন যেন অনাগ্রহ ছিল তাঁর।”

সেই প্রাক্তন আমলার মনে আছে, জার্মান রাষ্ট্রদূত এক বার কলকাতায় এসে রাজ্য সরকারের কাছে একটি ‘প্রেজ়েন্টেশন’ চান। জার্মানরা তখন চিন থেকে সরিয়ে ভারতে বিনিয়োগের সম্ভাব্য জায়গা খুঁজছিলেন। তাঁদের নজরে ছিল পশ্চিমবঙ্গ। কিন্তু রাজ্যে কেন, কিসে বিনিয়োগ করলে জার্মান উদ্যোগপতিদের লাভ, সেই সংক্রান্ত কোনও ‘প্রেজ়েন্টেশন’ তিনি আর রাজ্য সরকারের কাছ থেকে পাননি। শিল্পের সুযোগের কথা না বলে মুখ্যমন্ত্রী নাকি তাঁর রাজনৈতিক বিরোধী ও কিছু সমালোচক সাংবাদিকদের নিন্দা করেই কাটান। স্তম্ভিত রাষ্ট্রদূত দিল্লি ফিরে যান।

অর্থনীতিবিদ তথা কংগ্রেস নেতা প্রসেনজিৎ বসু দেখিয়েছিলেন, বামফ্রন্ট সরকারের শেষ বছরে (২০১০-’১১) এবং তৃণমূলের শাসনের প্রথম বছর (২০১১-’১২) পশ্চিমবঙ্গের জিএসডিপি ছিল জাতীয় জিডিপি-র ৬ শতাংশ। কিন্তু রাজ্যে অর্থনীতির বৃদ্ধির হার লাগাতার জাতীয় অর্থনীতির বৃদ্ধির হারের তুলনায় কমতে থাকায় ২০২৩-’২৪ অর্থবর্ষে রাজ্যের জিএসডিপি জাতীয় অর্থনীতির ৫ শতাংশে এসে দাঁড়ায়। কারণ, বিনিয়োগ নেই।

শুধুই কি উদ্যোগের অভাব? না। বরং বিপরীত ভাবমূর্তি। টালিগঞ্জে স্বরূপ বিশ্বাসের ‘আধিপত্য’ বিনিয়োগকারীদের কাছে সরকারি সমর্থনে ইউনিয়নবাজির বিপদ সম্পর্কে উদ্বিগ্ন করে। এক শিল্প বিশেষজ্ঞ বলছিলেন, “ইউনিয়ন তো থাকবেই। কিন্তু ইউনিয়ন যদি সরকারি মদত পায়, তখন সেটা বিনিয়োগকারীর জন্য উদ্বেগের কারণ হয়। টালিগঞ্জের ক্ষেত্রে সরকারি মদতের ব্যাপারটা স্পষ্ট ছিল।” গোদের উপর বিষফোড়ার মতো ছিল তৃণমূলের বিভিন্ন স্তরের নেতাদের বিরুদ্ধে তোলাবাজির ভূরি ভূরি অভিযোগ।

বড় শিল্প আনতে না পারা যে তাঁর ব্যর্থতা, সেটা কিন্তু মমতা নিজেও বুঝেছিলেন। ২০২১ সালের নির্বাচনের আগে বলেছিলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টিই তাঁর তৃতীয় মেয়াদের মূল লক্ষ্য। বলেছিলেন, তাজপুরে প্রস্তাবিত সমুদ্রবন্দর ১৫,০০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ আনবে। প্রায় ২৫,০০০ কর্মসংস্থান করবে। প্রতি বছর ৫ লক্ষ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, পরের পাঁচ বছরে নাকি ৫ লক্ষ কোটি টাকার নতুন বিনিয়োগ করা হবে। কোথায় বন্দর, কোথায় বিনিয়োগ! মানুষের কিছুই চোখে পড়ল না। সরকার শুধু ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি (এমএসএমই) দেখিয়ে গেল।

দ্বিতীয় কারণ: ধর্ম

তবে তাঁর শিল্পনীতিই একমাত্র নয়, যা তাঁর শুরুতেই শেষের বীজ বুনে দিয়েছিল। দ্বিতীয়টি হল ধর্মের সঙ্গে রাজনীতির মিশেল। সেই ২০০৮। পঞ্চায়েত নির্বাচনে দক্ষিণ ২৪ পরগনা, উত্তর ২৪ পরগনা ও পুর্ব মেদিনীপুরে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে তৃণমূল ভাল ফল করল। তখন সাচার কমিটি রিপোর্টের ধাক্কায় বামেদের মুসলিম সমর্থনে ভাটা পড়েছে। কিন্তু অতীতের ‘বিজেপি ঘনিষ্ঠতার’ কারণে মমতাকে তখনও বিশ্বাস করেন না মুসলিমরা। তাঁদের আস্থা অর্জনে মমতা ভাবলেন সবচেয়ে সহজ পথের কথা। সাচার কমিটি বলেছিল, মুসলিমদের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে পড়ার কথা। কিন্তু তিনি মুসলিম শিক্ষাবিদ, গবেষক বা উদ্যোগপতিদের না ধরে ধরলেন ধর্মগুরুদের।

মৌলানা, মৌলবিদের ভিড় বাড়ল দিদির মঞ্চে। নেত্রী মাথায় কাপড় টানতে লাগলেন হিজাবের মতো করে। তাঁর রাজনীতি দেখিয়ে মুসলিম তোষণের অভিযোগ তুলে হিন্দু মেরুকরণের সুযোগ পেয়ে গেল বিজেপি। বস্তুত, ধর্মভিত্তিক রাজনীতির দৈত্যকে তিনিই বোতল খুলে বার করে দিলেন। কিন্তু বিজেপির প্রবল উত্থানের ধাক্কায় ২০১৯ সালের পরে মমতা হিন্দু তোষণের পথে নামলেন। সঙ্ঘ পরিবারের রামনবমী ও হনুমানজয়ন্তী পালনকে প্রথমে ‘বাংলায় বহিরাগত’ পার্বণ বলেছিলেন তিনি। পরে নিজের দলকে নামিয়ে দিলেন ওই দুই উৎসব পালনে সঙ্ঘ পরিবারের সঙ্গে প্রতিযোগিতায়। তিনি বললেন, ‘জয় শ্রীরাম’ কোনও ধর্মীয় স্লোগান নয়, রাজনৈতিক স্লোগান। পরে দেখা গেল তাঁরই দলের অভিনেতা-সাংসদ দীপক ‘দেব’ অধিকারী বা সায়নী ঘোষেরা ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিচ্ছেন। কোনটা যে কার রাজনীতি, আর বোঝা যায় না।

পাশাপাশি, পুরোহিতদের জন্য ভাতা চালু হল। দুর্গাপুজোয় ক্লাব প্রতি ক্রমবর্ধমান অনুদান। এক ধাপ এগিয়ে দিঘায় জগন্নাথ মন্দির। রথযাত্রা। শিলিগুড়িতে মহাকাল মন্দির ও কলকাতায় দুর্গা অঙ্গনের ঘোষণা। মুসলিমরা ভাবতে থাকলেন, দিদি একটাও মসজিদ গড়ার কথা বললেন না! ইতিমধ্যে হুমায়ুন কবীরের বাবরি মসজিদ বানানোর বিতর্কিত উদ্যোগ তৃণমূলকে আরও বিপদে ফেলে দিল।

ধর্মকেন্দ্রিক রাজনীতিকে এ রাজ্যের মাটিতে শিকড় গাড়তে দেওয়ায় মমতার অবদান অনস্বীকার্য। প্রশান্ত কিশোর ২০২১ নির্বাচনের আগে তৃণমূলকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, ধর্ম নয়, জনকল্যাণমূলক প্রকল্প ও পরিষেবায় নজর দিতে। কিন্তু তৃতীয় বার ক্ষমতায় আসার পরে ধর্ম নিয়ে মাতামাতি আরও বাড়িয়ে দেন মমতা। বিজেপির হিন্দুত্বের পাল্টা আনেন নিজের ‘হিন্দুয়ানি’— দেখো, আমিও কত বড় হিন্দু।

বিজেপি নিয়ে অনেকের ঘোর সংশয় ছিল, তারা ধর্ম আর রাজনীতি মিশিয়ে দেয় বলে। কিন্তু তৃণমূলও সেই একই রাজনীতি করে মানুষের উদ্বেগ বা সংশয় কাটিয়ে দিল। মমতার ভুল রাজনীতিই শেষপর্যন্ত হিন্দু ভোটের মেরুকরণ ও মুসলিম ভোটের বিভাজনের পথ খুলে দেয়। সেই অঙ্কেই তাঁর পরাজয়।

বাংলায় হিন্দুদের একাংশের মধ্যে মুসলিমদের সম্পর্কে একটা বিরূপ মনোভাব দীর্ঘদিনই ছিল। ইতিহাসবিদ জয়া চট্টোপাধ্যায়ের ‘বেঙ্গল ডিভাইডেড’ বইয়ে তার যথেষ্ট বর্ণনা আছে। বাংলার তদানীন্তন হিন্দু নেতৃত্বের বড় অংশই মুসলিম সংখ্যাগুরু পুর্ব বাংলার চেয়ে এক আলাদা ‘হিন্দু বাংলা’ চেয়েছিলেন। সেই বিরূপতা দীর্ঘ কংগ্রেস ও বাম শাসনে সুপ্ত হয়ে ছিল। ধর্মকেন্দ্রিক রাজনীতির বোতল খুলে সেই দৈত্যকে মমতাই আবার বাইরে আসার সুযোগ করে দেন। প্রেসিডেন্সি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক জাদ মাহমুদের কথায়, “বিজেপি ও সংঘ পরিবার তো পশ্চিমবাংলা জয়ের জন্য ঝাঁপাবেই। ইহুদিদের কাছে ইজ়রায়েল যা, হিন্দুত্ববাদীদের কাছে পশ্চিমবাংলা তাই। পশ্চিমবাংলাই তো দেশে হিন্দুত্ববাদের উৎসস্থল।”

২০১৯ সালে লোকসভা ভোটে সাফল্যের পরে বিজেপি তথা সঙ্ঘ পরিবারভুক্ত নানা সংগঠন নানা পরিসরে এই কথা বারেবারে প্রচার করেছিল, পশ্চিমবঙ্গ হল হিন্দু বাঙালিদের শেষ ভূমি। এই মাটিতে মুসলিমদের প্রাধান্য বাড়লে এ রাজ্যও ‘পশ্চিম বাংলাদেশ’ হয়ে উঠবে। সময়ের সঙ্গে এই তত্বের গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে থাকে। গ্রাম, শহর, মফস্সল সর্বত্র। সে কারণে এসআইআর প্রক্রিয়ায় অনেক মুসলিম নাম বাদ যাওয়া নিয়ে রাজ্যের বড় অংশের মানুষের মধ্যে বিশেষ বিরূপ মনোভাব দেখা যায়নি।

১৮৭০ দশকের শেষদিকে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের হাতে হিন্দু জাতীয়তাবাদের জন্ম। দেড়শো বছর পরে প্রায় সারা দেশ বিজয় সেরে হিন্দুত্ববাদীরা শেষমেশ বাংলার মসনদে বসল।

তৃতীয় কারণ: ভূতুড়ে ভোটার হারানো ও রিগিং বন্ধ

এসআইআর প্রক্রিয়া শেষে তালিকা বেরোতেই বিজেপি, বাম-সহ বিরোধীরা বলতে থাকে, ‘ভূতুড়ে’ ভোটার হারিয়ে বেকায়দায় তৃণমূল। তাঁরা হিসেব করেছিলেন, প্রথম দফায় বাদ যাওয়া প্রায় ৬৪ লক্ষ নামের মধ্যে প্রায় ১০-১৫ লক্ষ এমন ভোটার ছিলেন, যাঁরা মৃত বা স্থানান্তরিত। এঁদের ভোট তৃণমূল ফাঁকতালে দিয়ে দিত। সেই ভোট হারানোর পাশাপাশি আরও ২৭ লক্ষ সম্ভাব্য ন্যায্য ভোটার বাদ পড়েন। এঁদের অধিকাংশ তাঁদের সমর্থক বলে তৃণমূল ধারণা করেছিল। তখন থেকেই বিজেপি নেতারা জয়ের অঙ্ক দেখতে পাচ্ছিলেন। এর সঙ্গে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর বজ্র আঁটুনিতে বুথ জ্যাম বা ভয় দেখিয়ে বিরোধী ভোটারদের আটকে রাখাও সম্ভব হয়নি তৃণমূলের পক্ষে।

তৃণমূল অবশ্য এ সব মানতে চাইছে না। বরং জোরগলায় বলছে, কেন্দ্রীয় সরকার ও নির্বাচন কমিশন আঁতাঁত করে অন্যায় ভাবে তাদের হারিয়ে দিয়েছে। বেছে বেছে ভোটার বাদ দেওয়া হয়েছে। দলীয় নেতৃত্বকে কেন্দ্রীয় এজেন্সি দিয়ে হেনস্থা করে কর্মীদের ভয় দেখানো হয়েছে। দিল্লির সরকার তাদের ‘সর্বাত্মক ক্ষমতা’ প্রয়োগ করে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকেই ধাক্কা দিয়েছে। মমতা গণনায় কারচুপির অভিযোগ করেছেন। অনেক আসনের ফলাফল নিয়ে আদালতে যাওয়ার জন্য আলোচনা চালাচ্ছেন।

চতুর্থ কারণ: দুর্নীতি

একটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা টানি। আমি হুগলির ছেলে। কর্মসূত্রে দীর্ঘদিন ভাড়াবাড়িতে কলকাতায়। বছর দুয়েক আগে ফ্ল্যাট কেনার জন্য খোঁজখবর শুরু করি। বেশ কিছু ফ্ল্যাট দেখার পর বুঝতে পারি, যে সব বাড়ি গত ১০-১২ বছরে উঠেছে, সেগুলোর মান খুব খারাপ। দ্রুত ‘ড্যাম্প’ পড়ে দেওয়াল থেকে চাকলা উঠে গিয়েছে। বড় বিল্ডারদের ব্যাপার জানি না, তবে ছোট ও মাঝারিদের প্রায় সব একই অবস্থা। শেষমেশ পারিবারিক ভাবেই সিদ্ধান্ত নিই, তৃণমূল আমলে বানানো বিল্ডিংয়ে ফ্ল্যাট কিনব না। হোক বেশি পুরনো, তবু বাম আমলে বানানো বাড়িগুলো বেশি পোক্ত।

আমার মতো ভুক্তভোগী কম নয়। দক্ষিণ কলকাতার এক বিশিষ্ট বাসিন্দা একবার তাঁর বাড়ির সামনে যাতে জল না জমে, সে জন্য কিছু নির্মাণকাজ করতে চাইলেন। স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্ব বললেন, কাজ তাঁদের মাধ্যমে করাতে হবে। যথারীতি খরচ বেশি। কারণ, কাটমানির হিসাব আছে। তিনি তৃণমূলের এক প্রভাবশালী মন্ত্রী ও আর এক প্রবীণ সাংসদকে জানান। তাঁরা প্রথমে বলেন, এটা কোনও ব্যাপার না। মিটে যাবে। পরে দু’জনেই বলেন, ওটা স্থানীয় ভাবেই মিটিয়ে নিতে হবে। ঘটনাচক্রে, এ বার আমার এক পরিচিত তৃণমূল প্রার্থী ছিলেন। গণনা অর্ধেক মিটতে না মিটতেই অন্যান্য জায়গায় বিজেপির জয়ের খবর আসতে থাকে। বুথের মধ্যেই এক নির্বাচন কর্মী বলে ওঠেন, ‘‘হবে না? সামান্য একটা বাড়ি বানাতে যা তোলা দিতে হয়!’’

সারদা ও নারদ কেলেঙ্কারির ধাক্কা এড়িয়েও তৃণমূল ২০১৬ সালের নির্বাচন জিতে নিয়েছিল। কিন্তু ২০২১ সালে তৃতীয় দফায় ক্ষমতায় ফেরার পরেই সামনে আসে চাকরি দুর্নীতি। এমনিতেই কাটমানির অভিযোগে গাঁ-শহর ভরপুর। মানুষ চোখের সামনে দেখছেন, নেতাদের বাড়ি প্রাসাদোপম হচ্ছে। আঙুল ফুলে কলাগাছ। দিদির বিশ্বস্ত সঙ্গী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বান্ধবীর বাড়ি থেকে কোটি কোটি টাকা উদ্ধার। এ দিকে-ও দিকে সম্পত্তি। শিল্প আসছে না, এই পরিস্থিতিতে সবেধন নীলমণি যে সরকারি চাকরি, তা-ও যদি চুরি হয়ে যায়, মানুষের ভরসা থাকে কোথায়? ফলে বিজেপির বিরুদ্ধে কারও কোনও প্রচারেই মানুষ বিশেষ কান দেননি। অধিকাংশই ঠিক করে রেখেছিলেন, যে করেই হোক এই সরকারকে ফেলতেই হবে।

পঞ্চম কারণ: আই-প্যাক নির্ভরতা

দলের অনেক নেতাই বেশ কিছুদিন ধরে বলছিলেন, আই-প্যাকের মাধ্যমে দলের সাংগঠনিক খোলনলচে বদলে দেওয়ার চক্করে দলের মধ্যসারির নেতাদের কার্যত ঠুঁটো জগন্নাথ বানিয়ে দিয়েছিলেন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব। অনেক নেতাই বলতেন, অভিষেক আই-প্যাককে ব্যবহার করেছিলেন দলে ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণের কাজে। ফলে সকলেই হয়ে ওঠেন আই-প্যাক ও শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশের মুখাপেক্ষী। নিজেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কমে যায়। শুধু প্রচার কৌশল নয়, বুথ ম্যানেজমেন্টেও একটা ভূমিকা থাকত এই পরামর্শদাতা সংস্থার।

এই অবস্থায় কেন্দ্রীয় এজেন্সি দুর্নীতির অভিযোগে আই-প্যাক কর্তা বিনেশ চান্দেলকে গ্রেফতার করতেই আই-প্যাক বাংলার নির্বাচন থেকে কার্যত বসে যায়। এক তৃণমূল নেতার কথায়, “গত কয়েক বছরে দল এতটাই আই-প্যাক নির্ভর হয়ে উঠেছিল যে, দলের স্থানীয় নেতৃত্ব তাঁদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছিলেন। এই অবস্থায় শেষ মুহূর্তে আই-প্যাকের কার্যত বসে যাওয়ার ধাক্কা আর সংগঠন সামলাতে পারেনি।”

ষষ্ঠ কারণ: রাজনৈতিক হিংসা

‘বদলা নয়, বদল চাই’ স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন মমতা। কিন্তু ২০১৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে থেকে শুরু হয়ে গেল বামেদের পার্টি অফিস বন্ধ করে দেওয়া, বাম কর্মী-সমর্থকদের ওপর নানা রকম হামলা ও মামলা। ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে হিংসা ও ভোট লুটের চূড়ান্ত বাড়াবাড়ি হলে ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে এই বাম ভোটের সিংহভাগ বিজেপি হয়ে যায়। সেই যে বিজেপি ২ কোটি ৩০ লক্ষ ভোট পেল, পরবর্তী সাত বছরে তা আর কমেনি। প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা আর হিন্দুত্বের মিশেলে তৈরি হওয়া এই সমর্থক ভিত্তি ছিল এতই জোরালো।

এই সব জমতে থাকা ক্ষোভের প্রেক্ষিতে, এসআইআর-এর ধাক্কায় ভূতুড়ে ভোটার হাতছাড়া হওয়া, ২৭ লক্ষ ন্যায্য ভোটার বাদ থাকা, নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়াকড়িতে কোনও রিগিং করতে না পারা, একেবারে ভোটের দোরগোড়ায় এসে আই-প্যাকের পরিষেবা হারিয়ে বুথ ম্যানেজমেন্ট দুর্বল হওয়ার মতো ঘটনাগুলি তৃণমূলের সাথে বিজেপির যে ভোটের ব্যবধান, সেটা আরও কমিয়ে দেয়।

তৃণমূল আর রাজনৈতিক হিংসা নামিয়ে আনার জায়গায় নেই বুঝতে পেরে অনেক বিরোধী ভোটার, যাঁরা দীর্ঘ দিন ভোট দিতে পারতেন না বা সেই সাহস দেখাতেন না, তাঁরা দলে দলে বেরিয়ে আসেন। বিজেপির ভোট না বাড়লে এই ফলাফল সম্ভব হত না। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের তুলনায় প্রায় ৬০ লক্ষ ভোট বাড়িয়েছে বিজেপি। সেটা কী ভাবে হল?

এ ছাড়া: ইচ্ছা ও এলেম

উপরে উল্লিখিত বিষয়গুলি তো আছেই, তবে সেগুলিও সার্বিক সত্য নয়। আছে এক আরও বড় সত্য। তা হল, জনগণের মনে সরকার সম্পর্কে বিশ্বাসের অভাব। সেটা শিল্পায়নের তথ্য হোক, দুর্নীতি নিয়ে দাবি বা অপরাধ সংক্রান্ত, একটা বড় অংশের মানুষ সরকারের যুক্তি বিশ্বাস করতেই চাননি। সারদা কেলেঙ্কারি বা নারদ ঘুষ কাণ্ডে কেন সিবিআই কিছু করতে পারল না? বামেরা এ প্রশ্ন করলে মানুষ বলেন, রাজ্য পুলিশ নথি লোপাট করে দিয়েছিল।

এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হল ‘অভয়া কাণ্ড’। সিবিআই কলকাতা পুলিশের তদন্তেই সিলমোহর দিলেও বড় অংশের মানুষ তা মানতে চাননি। সেই যে শুরুতেই আরজি কর হাসপাতালের প্রধানকে এক পুরস্কার পোস্টিং দিলেন মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বাস্থ্যমন্ত্রী, তার থেকেই মানুষ ধরে নিয়েছিলেন, সরকার কিছু লুকোতে চাইছে। মানুষ একবার কিছু বিশ্বাস করে নিলে খুব মুশকিল। বিশ্বাসে মিলায় বস্তু। আর ভারত তো বিশ্বাসীদের দেশ। শুধু বিশ্বাস নয়, আস্থাও হারিয়েছিল সরকার। অনেকেরই মনে হচ্ছিল, সুযোগ পেলেও শোধরানোর ইচ্ছা তো তাদের নেই-ই, এলেমও নেই।

অ্যাপ্‌ল-এর টিম কুককে কলকাতায় নিয়ে আসতে না হয় আমাদের ইচ্ছা নেই। কিন্তু ইচ্ছা যদি বা হয়, এলেম আছে কি? মানুষ মনে করেছিলেন, সেটাও সরকারের নেই।

TMC BJP Mamata Banerjee
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy