বার্ধক্যে বারাণসী। এতদিন তা-ই জানা ছিল। কিন্তু দিনকাল যেদিকে যাচ্ছে, একদিন আসবে, যখন বলতে হতে পারে, বার্ধক্যে কলকাতা।
কেন? কারণ, কলকাতায় জন্মহার হু-হু করে কমছে। এতটাই কমছে যে, প্রজনন হার, যা জন্মহার থেকে মৃত্যুহার বিয়োগ করে পাওয়া যায়, তা নেমে এসেছে ১-এর নীচে। পৃথিবীর খুব কম শহরেই এই সংখ্যা এত কম। জনসংখ্যা স্থিতিশীল থাকার জন্য এই সংখ্যা ২.১-এ থাকা প্রয়োজন।
কলকাতাতে এই সংখ্যা প্রয়োজনের অর্ধেক। অর্থাৎ, বয়স্ক লোকেদের সংখ্যা বাড়ছে আর কমে যাচ্ছে যুবক-যুবতীর সংখ্যা। এর পরিণাম কী? আজ বাদে কাল অ্যাপ্ল যদি সেক্টর ফাইভে আইফোনের কারখানা গড়তে চায়, চাকরি নেওয়ার মতো লোক কলকাতায় না-ও থাকতে পারে। আমরা যেমন তেল বা বিলিতি মদ আমদানি করি, তেমন ভাবে কর্মীও আশপাশের রাজ্য থেকে আনতে হবে।
এই তথ্য আমাদের নয়, ভারত সরকারের। প্রকাশিত হয়েছে গত বছর। তা সত্ত্বেও এখানে এ নিয়ে আলোচনা নেই কেন? কারণ, কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের ঘন জনবসতি। বাংলার জনঘনত্ব অন্ধ্রের তিনগুণ। হায়দরাবাদের প্রায় দেড়গুণ কলকাতায়। ফলে কেউ মনে করতে পারেন, জনসংখ্যা কমলে বাঙালির না হোক, কলকাতার অন্তত লাভ হতে পারে। এই যুক্তি অতি সরল। লাভ গোড়ার দিকে সাময়িক হতে পারে। কিন্তু আদতে ব্যবসা বা কল-কারখানায় কাজ করার লোক কমবে। সমাজে তরুণ ও কর্মক্ষমদের তুলনায় বয়স্কদের সংখ্যা বাড়লে পেনশন এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার বোঝাও বাড়বে।
শহরের কিন্তু হুঁশ নেই। বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে শুম্ভ-নিশুম্ভের যুদ্ধ শুরু হয়েছে নানা পক্ষে। রাজ্য বিজেপি এবং তৃণমূলের বেশ কিছু নেতাকে কমতে থাকা জন্মহার নিয়ে প্রশ্ন করেছিল আনন্দবাজার ডট কম। কেউই শীর্ষনেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা না-করে কোনও কথা বলতে চাননি।
বিষয়টি নিয়ে এই সার্বিক নৈঃশব্দ্যে বিস্মিত জনসংখ্যা নিয়ে কাজ করা পণ্ডিত-গবেষকরা। ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ়, কলকাতার অধ্যাপক শাশ্বত ঘোষের কথায়, ‘‘পরিকল্পনা তো দূরের কথা, কোথাও কোনও আলাপ-আলোচনাও নেই।” তাঁর মতে, কলকাতার প্রজনন হার সেই সত্তরের দশকের গোড়ার দিকেই ২.১-এর নীচে নেমে গিয়েছিল। তখন থেকেই দেশে এই হার সব চেয়ে কম। তাঁর হিসাব, বর্তমানে কলকাতার হার আসলে ০.৮-এ নেমে এসেছে। একে কার্যত সর্বনিম্ন স্তর বলা যায়। কেউ কেউ বলেন, এ দেশে ছোট পরিবারের সংস্কৃতির উদ্ভব ও বিস্তারের অন্যতম আদিস্থল কলকাতা। পরিবারে এক বা দু’টি সন্তান থাকাই ‘স্বাভাবিক’, এমন ধারণা জনপ্রিয় হয়েছে পাঁচ-ছয় দশকেরও আগে। এই শতকের শুরুতেই দেখা গিয়েছিল, এক-সন্তান পরিবারের সংখ্যা অন্যান্য বড় রাজ্যের তুলনায় বাংলায় অনেকটাই বেশি। দুই বা এক সন্তান প্রথা পার হয়ে কলকাতা এবং শহুরে বাংলায় এখন দ্বৈত আয়ের সন্তানহীন দম্পতির সংখ্যা বাড়ছে।
কেন ক্রমশ স্বেচ্ছায় সন্তানহীন দম্পতির সংখ্যা বাড়ছে কলকাতা তথা রাজ্যের শহরাঞ্চলে? পণ্ডিতদের নানা মত। কলকাতার ক্ষেত্রে উচ্চ নারীশিক্ষার হার, দেরিতে বিয়ে, ছোট পরিবারের জনপ্রিয়তা, পেশাজীবনের প্রতি অধিক মনোযোগ ও আর্থিক অনিশ্চয়তার ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি লক্ষ করেছেন গবেষক ও সমাজতাত্ত্বিকেরা।
গত এক-দেড় দশকের প্রবণতায় দেখা যাচ্ছে, কলকাতার পেশাজীবী দম্পতিরা— যাদের উভয়েরই আয় রয়েছে— ক্রমশ নিজেদের পেশাগত জীবন, ভ্রমণ এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিষয়গুলিকে অধিক অগ্রাধিকার দিয়ে সচেতন ভাবেই সন্তানহীন জীবনধারা বেছে নিচ্ছেন। এ ছাড়া, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচ এবং আর্থিক অনিশ্চয়তা তো আছেই। কলকাতায় মজুরি বৃদ্ধির হার তুলনামূলক ভাবে কম। অধিকাংশই বেতনভোগী পেশাজীবী। সন্তান লালন-পালন করাটা অনেকেই আর্থিক ভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে দেখছেন। বিশেষত শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার ব্যয়ে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি অনেককেই পরিবার ছোট রাখতে উৎসাহিত করছে।
মানিকতলার অনন্যা দাশগুপ্ত মধ্য ত্রিশ। বিয়ে হয়েছে বছর আটেক। স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই চাকরি করেন। অনন্যা বলছিলেন, “যেখানে চাকরির নিরাপত্তা নেই বললেই চলে আর আয়-সঞ্চয়ও বিশেষ বাড়ছে না, সেখানে সন্তানপালন তো অবশ্যই একটা বড় চাপ আর ঝুঁকির ব্যাপার।” তাঁরা বিয়ের আগে থেকেই নিশ্চিত ছিলেন, সন্তান নেবেন না। তাঁর সমবয়সি বন্ধু ও ভাইবোনেদের মধ্যে কেউ কেউ এখনও অবিবাহিত। বিবাহিতদেরও অনেকেই স্বেচ্ছায় নিঃসন্তান।
সামাজিক-পারিবারিক চাপ অবশ্য চলে যায়নি। আত্মীয়স্বজন এবং বয়োজ্যেষ্ঠরা অনেক ক্ষেত্রেই সন্তানগ্রহণের জন্য চাপ সৃষ্টি করে থাকেন। কসবার স্কুলশিক্ষিকা অহনা বিশ্বাসের বক্তব্য, তাঁর মা মাঝেমাঝেই তাঁকে মনে করিয়ে দেন, তাঁর বয়স চল্লিশ হল। সন্তানধারণের সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। পরে আর ইচ্ছা হলেও উপায় থাকবে না। এখনই আবার ভাল করে ভেবে দেখতে। অহনার মা তাঁকে প্রশ্ন করেন, “আমাকে তো তোরা দেখছিস। তোদের কে দেখবে?” অহনা জবাবে বলেন, ‘‘নিজেরা নিজেদের সামলাতে অসুবিধা হলে সহায়ক রাখব বা বৃদ্ধাশ্রমে চলে যাব!’’
পণ্ডিতদের চোখে কিন্তু পড়েছে আর এক প্রবণতা। রাজ্যে প্রজননহার জাতীয় হারের মাত্র দুই-তৃতীয়াংশ। গোটা দেশে শহরাঞ্চলের গড় ১.৫, সেখানে পশ্চিমবাংলায় মাত্র ১.১। গ্রামাঞ্চলের জাতীয় গড় ২.১, পশ্চিমবাংলায় ১.৪। এর মানে ভারতে ক্রমশ বাঙালির সংখ্যাও কমবে। উদ্বেগের আরও কারণ আছে। শাশ্বতের মতে, পেশাগত কারণে যৌবন পেরিয়ে বেশি বয়সে সন্তানলাভের চেষ্টার কারণেও অনেকে সন্তানলাভে অসমর্থ হচ্ছেন। যে কারণে বাড়ছে ফার্টিলিটি ক্লিনিকের সংখ্যা। ফলে সরকারি তরফে এ বিষয়ে উদ্যোগী হওয়া আশু প্রয়োজন।
পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রই জন্মহার কমতে দেখা যাচ্ছে। যা মূলত উন্নত, শিল্পায়িত, শহুরে, উচ্চশিক্ষিত ও উচ্চ আকাঙ্ক্ষাসম্পন্ন অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য। ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ও শহর সন্তানধারণে দম্পতিদের উৎসাহিত করার জন্য সরাসরি হাতে নগদ টাকা দেওয়া, সন্তানপালনে বাবা-মায়ের দীর্ঘ ছুটি, পরিষেবায় ভর্তুকি ও করে ছাড়ের মত প্রকল্প নিয়েছে। চিনের একটি প্রদেশ সম্প্রতি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, মহিলারা ২৫ বছরের আগে প্রথম সন্তানের জননী হলে ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ২০ হাজার টাকা এককালীন অনুদান পাবেন। রাশিয়া, হাঙ্গেরি ও ইতালির কিছু কিছু শহরে এই পরিমাণ আরও বেশি। জাপানে তো সপ্তাহে তিন দিন ছুটি, বাবা-মা দু’জনের জন্যই পেরেন্টাল লিভ, শিশুর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে ছাড়, ডে-কেয়ার সিস্টেমে ভর্তুকি, ইত্যাদি নানা প্রকল্প আছে। টোকিয়ো শহর কর্তৃপক্ষ এর বাইরেও হাতে নগদ টাকা দেন। সিঙ্গাপুরও তাই। আমাদের দেশে অন্ধ্রে মোট প্রজনন হার ১.৫ তে নেমে আসতেই মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নায়ডু রাজ্যে দ্বিতীয় ও তৃতীয় সন্তানের জন্ম হলে এককালীন ২৫,০০০ টাকা, পাঁচ বছর ধরে মাসিক ১,০০০ টাকা ও সন্তানের ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত নিখরচায় শিক্ষার মতো প্রকল্প এনেছেন।
লক্ষ্মীর ভান্ডার আছে। দ্বিগুণ খরচের ‘অন্নপুর্ণার ভান্ডার’-এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিজেপি। একদিন হয়তো আসবে, যখন দুধভাত থাকবে। কিন্তু সেটা ভোগ করার মতো সন্তান থাকবে না। তখন হয়তো লক্ষ্মী, অন্নপূর্ণা ভুলে গিয়ে মা ষষ্ঠীর শরণাপন্ন হতে হবে।