E-Paper

‘মানুষকে মানুষ মনে করে না এরা!’

শিয়রে ভোট। কী পরিস্থিতি জেলায় জেলায়? খোঁজ নিল আনন্দবাজার।

অভিজিৎ সাহা

শেষ আপডেট: ০৮ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৩৩
মালদহের সুজাপুরে ভোট প্রচারে দেখা নেই কোনও পতাকা, ফেস্টুনের।

মালদহের সুজাপুরে ভোট প্রচারে দেখা নেই কোনও পতাকা, ফেস্টুনের। — নিজস্ব চিত্র।

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) ভার যে কত কঠিন, জানে কাবিল ইসলাম, বানোতি রাজবংশীর পরিবার। কেউ কাউকে চেনেন না। তবে, যে যন্ত্রণার সুতো তাঁদের বেঁধেছে, তার নাম ‘এসআইআর’ বললে এক বাক্যে একমত হন নিমেষে।

মালদহে জাতীয় সড়কের বাইপাস ঘেঁষে, সবুজ ধানের জমির বুক চিরে গিয়েছে আঁকাবাঁকা ঢালাই রাস্তা। কিছুটা এগিয়ে পুরাতনমালদহের পাথার-মাধাইপুর গ্রাম। দেওয়াল লিখনের তেমন হিড়িক নেই। ইতিউতি ঝুলছে তৃণমূল এবং বিজেপির পতাকা। গ্রামের শেষ প্রান্তের বাড়িতে থাকতেন বছর সাঁইত্রিশের কাবিল ইসলাম। সোমবার সকালে যাঁর ঝুলন্ত দেহ মিলেছিল জমিতে থাকা বিদ্যুতের খুঁটিতে। বারান্দায় শুয়ে কাঁদছিলেন কাবিলের স্ত্রী বুলবুলি খাতুন। কোনও মতে বললেন, ‘‘রবিবার দুপুরেও একসঙ্গে খেয়েছি। আজ চিৎকার করলেও, সে লোকটার কাছে পৌঁছচ্ছে না আমার গলা!”

কাবিলের নাম ভোটের অতিরিক্ত তালিকায় ওঠেনি। নাম বাদ গিয়েছে তাঁর আরও তিন ভাইয়ের। ‘‘তাতেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল ছেলে’’, ভারী স্বরে বলে ওঠেন কাবিলের বাবা নজরুল ইসলাম। বললেন,“আমার বয়স ৬৭। জন্ম পাথার-মাধাইপুরে। ২০০২ সালে ভোট দিয়েছি। তবু ছেলেদের সঙ্গে এসআইআরে বিবেচনাধীন হিসেবে আমার নাম ছিল। সাপ্লিমেন্টারি তালিকায় চার ছেলের নাম বাদ গেলেও চিন্তা করতে নিষেধ করেছিলাম। নাম বাদের আতঙ্ক শেষ করে দিল কাবিলকে!” পাঞ্জাবির কোনা দিয়ে চোখ মোছেন বৃদ্ধ।

পুরাতন মালদহেরই কামঞ্চ গ্রামে এসআইআরের শুনানি পর্বের সময়ে কীটনাশক পান করে আত্মঘাতী হন বছর পঁচিশের বানোতি রাজবংশী। বানোতির স্বামী সামোজ রাজবংশীর ক্ষোভ, “এসআইআর আমার বৌকে কেড়ে নিয়েছে। বানোতির বাবা-মা ও ছোট থাকতেই মারা গিয়েছিলেন। সে কোথায় পাবে তার বাবা, মায়ের নথি! তাকেও ধরানো হয়েছিল শুনানির নোটিস। তার ভার বইতে পারেনি বানোতি!”

পুরাতন মালদহ বিধানসভা কেন্দ্রে হিন্দু, মুসলিম, আদিবাসী, তফসিলি জনজাতির বাস। পাশের বিধানসভা কেন্দ্র হবিবপুরেও ছবিটা এক। ইংরেজবাজার শহর টপকে পৌঁছতে হয় মানিকচকে। চার বিধানসভা কেন্দ্রেই রাস্তা, পানীয় জলের সঙ্কটের মতো সমস্যা এখনও রয়েছে। কিন্তু তা নিয়ে মাথা ঘামানোর লোক কম। কারণ জানালেন ইংরেজবাজারের মিল্কির ফেরিওয়ালা দিলদার শেখ। বললেন, “এক-এক বাড়িতে তিন-চার জনের নাম বাদ গিয়েছে ভোটার তালিকা থেকে। সব কাগজ (নথি) দেখানোর পরেও তালিকায় নাম উঠল না। লোকে আর অন্য কিছু নিয়ে ভাববে কী করে!”

মিল্কি থেকে দশ কিলোমিটার দূরেই মানিকচকের এনায়েতপুর মাঠ। শনিবার সে মাঠে দলীয় প্রার্থীর সমর্থনে নির্বাচনী সভা করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সভাস্থলের সামনের দিকে ছিলেন হাজারখানেক মহিলা। তাঁদের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘‘এসআইআরে কত জনের নাম বাদ গিয়েছে, হাত তুলুন।’’ এত মহিলা হাত তোলেন যে, দেখে হতবাক হয়ে যান মুখ্যমন্ত্রী। দলের নেতা-কর্মীদের মিটিং, মিছিল ভুলে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়াদের ট্রাইবুনালে নিয়ে গিয়ে আবেদনে সাহায্য করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন।

আবেদন করেছেন ট্রাইবুনালে? মানিকচকের আটগামার সানুয়ারা বিবি বলেন, “আমি-সহ পরিবারের চার জনের নাম নেই ভোটার তালিকায়। ট্রাইবুনালে আবেদন করা হয়নি। কী ভাবে আবেদন করতে হবে, জানি না। কেউ সাহায্যও করছেন না।” পরে বিরক্তির সুরে বললেন, “আবেদন, নথি জোগাড় করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। বার বার নথি নিয়ে লাইনে দাঁড়াও। কাজ ফেলে কত ছুটব? ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাবে, যাক!”

ভোটার কার্ড না থাকার ফল হাড়ে-হাড়ে জানেন এনায়েতপুর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে, কালিয়াচকের জালালপুরের বছর কুড়িরপরিযায়ী শ্রমিক আমির শেখ। তিনি এখন কালিয়াচকেই টোটো চালান। ভোটার কার্ড তৈরি হয়েছে? আমির বলেন, “এখনও কার্ড তৈরি হয়নি। তবে আবেদন করেছি। কার্ড হয়ে গেলে, নিশ্চিন্ত হব।” রাজস্থানে কাজ করতে যাওয়ায় আমিরকে বাংলাদেশি সন্দেহে সে দেশে ‘পুশব্যাক’ করা হয়েছিল। সেখানকার সংশোধনাগারে কাটিয়ে আদালতের মাধ্যমে দেশে ফেরেন আমির। বলেন, “আধার কার্ড, জন্মের শংসাপত্র থাকলেও,ছিল না ভোটার কার্ড। সে জন্যই আমাকে বাংলাদেশি বলে ও পারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সে দিন ভোটার কার্ডের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলাম।”

পুরাতন মালদহ, ইংরেজবাজার, হবিবপুর, মানিকচক বিধানসভা কেন্দ্রে যত নাম ‘বিবেচনাধীন’ ছিল, অতিরিক্ত তালিকায় তাঁদের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ বাদ পড়েছে, দাবি প্রশাসন সূত্রের। গত বার মানিকচকে তৃণমূল এবং বাকি তিন বিধানসভা আসনে জিতেছিল বিজেপি।মানিকচকের মথুরাপুরে ভাঙন কবলিত শঙ্করটোলা ঘাটে বিজেপি প্রার্থী গৌরচন্দ্র মণ্ডল প্রচারে দাবি করছেন, “এ বার মানিকচকেও পদ্ম ফুটবে।” কিন্তু প্রচার থেকে বেরিয়ে ‘দাদার’ একাধিক অনুগামীর চোখে-মুখে উদ্বেগ। তাঁদের কথায়, ‘‘এসআইআরের হাওয়ায় যদি সংখ্যালঘু ভোট এক দিকে পড়ে, তা হলে কষ্ট আছে।’’

সে কষ্ট কি শুধু মানিকচকেই সীমাবদ্ধ থাকবে? কেবল তৃণমূলই তা পাবে? মানছেন না মানিকচকের সিপিএম প্রার্থী দেবজ্যোতি সিংহ। তাঁর দাবি, ‘‘এসআইআরের নামে বিজেপি কী করেছে, মানুষদেখেছেন। তৃণমূল আতঙ্ক ছড়ানোতেও অনেক প্রাণ গিয়েছে। দু’পক্ষকেই ভুগতে হবে।’’ সহমত কংগ্রেস প্রার্থী মহম্মদ আনসারুল হক। তবে তৃণমূল প্রার্থী কবিতা মণ্ডলের প্রত্যয়, ‘‘এসআইআরের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গিয়েছেন দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মানুষ অকৃতজ্ঞ নন।’’পাথার মাধাইপুরের ধানের জমিতে কাজ করতে ব্যস্ত জাহানারা বিবি, কুলসুম খাতুনেরা বিড়বিড় করেন, ‘‘এক পক্ষের জন্য তালিকায় নাম নেই। অন্য পক্ষের নাম তোলানোয় চাড় নেই। লোককে জুজু দেখাতে ব্যস্ত। মানুষকে মানুষ বলে মনে করে না এরা!’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Malda

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy