E-Paper

আলুচাষির সঙ্কট মেটে না, মারা যান রাখালরা

ভোটের মুখে রাখালের বাড়ি ঘুরে যাচ্ছেন নির্বাচনী লড়াইয়ে নামা সব পক্ষই। তৃণমূল প্রচার করছে, রাখালের পরিবারকে দু’লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্য পাঠিয়েছেন তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এলাকায় প্রচারে আসা বামেদের প্রশ্ন, তা হলে কি পশ্চিমবঙ্গ সরকার ‘কৃষক আত্মহত্যা’ স্বীকার করল!

নীলোৎপল বিশ্বাস

শেষ আপডেট: ০৪ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৩২

—প্রতীকী চিত্র।

গ্রামের সিমেন্ট বাঁধানো পথে বৃষ্টির জমা জলের মধ্যেই পড়ে রয়েছে লাল, হলুদ বস্তায় ভরা আলু। সরানো হয়নি কেন? প্রশ্নটা এড়িয়ে যান পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনার রাঙামাটি গ্রামের বাসিন্দারা। দেখিয়ে দেওয়া হয় কঙ্কালসার একচালা ঘর!

সে বাড়ি ভাগচাষি রাখাল আড়ির। রাস্তায় পড়ে থাকা আলুর বস্তাও তাঁর। মার্চ মাসে বিষ খেয়ে আত্মঘাতী হয়েছেন আঠাশ বছরের রাখাল। আলুর দাম না পাওয়ার কারণেই তিনি ওই পথ বেছে নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ পরিবারের। দুই নাবালক সন্তানের সঙ্গে মাদুরে বসা রাখালের স্ত্রী রীতা বললেন, ‘‘আলুর জন্যই সব শেষ হয়ে গেল!’’ পাশে বসা রাখালের প্রৌঢ়া মা অর্চনা কেঁদে বলেন, ‘‘ছেলের দেহের গতি করা গিয়েছে, কিন্তু আলুগুলোর যায়নি।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘গত বছরও আলুর দাম পাইনি। রাখালকে বলেছিলাম, এ বার আর আলু করিস না। শুনল না। বলল, ‘এ বার যদি আলু বিক্রি করে টাকা আনতে পারি, ধার শোধ দেওয়া যাবে’। এক বিঘা জমিতে আলু চাষ করতে ৩৫ হাজার খরচ হল। পাঁচ হাজার টাকার বেশি দাম পাচ্ছি না। দেনা দেড় লক্ষ টাকায় পৌঁছেছে। পাওনাদারের চাপে বিষ খেয়েই হিসাব মেটাতে হল!’’

ভোটের মুখে রাখালের বাড়ি ঘুরে যাচ্ছেন নির্বাচনী লড়াইয়ে নামা সব পক্ষই। তৃণমূল প্রচার করছে, রাখালের পরিবারকে দু’লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্য পাঠিয়েছেন তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এলাকায় প্রচারে আসা বামেদের প্রশ্ন, তা হলে কি পশ্চিমবঙ্গ সরকার ‘কৃষক আত্মহত্যা’ স্বীকার করল! বছর বছর ‘ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস বুরো’র তথ্যে দেখা যায়, পশ্চিমবঙ্গে কৃষকের আত্মহত্যার সংখ্যা শূন্য। তৃণমূল-বিরোধী সব পক্ষের দাবি, এই ‘আর্থিক সহায়তা’য় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষোভ তৎক্ষণিক সামাল দেওয়া যায়, চাষের বিপর্যয়ে রাজ্যের দায় স্বীকার করতে হয় না। অন্য রাজ্যে অবশ্য আত্মঘাতী কৃষকের পরিবারকে সহায়তা দেওয়া হয় রাজকোষ থেকেই। বাম নেতাদের দাবি, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে শূন্য আত্মহত্যা দেখিয়ে রাজ্যের কৃষিক্ষেত্রকে সঙ্কটশূন্য দেখানোর যে চেষ্টা চলছে, তাতে রাখালের মৃত্যুও বদল আনতে পারল না।’’

পশ্চিম মেদিনীপুরের কৃষিপ্রধান অঞ্চলে আলুর দাম পাওয়া নিয়ে হাহাকার চলছে। জাতীয় সড়কের ধারে, জমিতেও পড়ে নষ্ট হচ্ছে জ্যোতি, কে-২২ আলু। আলু বোঝাই শয়ে শয়ে ট্রাক্টর, টোটো, লরি হিমঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে। সুলেখা সাঁপুই নামে এক আলুচাষি বললেন, ‘‘এক কুইন্টাল আলু ৫০-৬০ বা ৭০ টাকায় বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছি। মানে ৫০-৬০ পয়সা কেজি দরে আলু দিয়ে দিতে হচ্ছে। প্রতি বিঘায় ৩০, ৪০ হাজার টাকার ক্ষতি হচ্ছে। চাষি খাবে কী?’’ সেলিমা বিবি নামে আর এক চাষির মন্তব্য, ‘‘ঋণ নিয়ে মেটাতে না পারায় লক্ষ্মীর ভান্ডারের টাকাও দিয়ে দিতে হচ্ছে। এখন বুঝছি, ভাতা পেলেই হবে না। কাজ চাই।’’

চলতি বছরে আবহাওয়া অনুকূল থাকায় আলুর ভাল ফলন হয়েছে। সরকারি হিসাব, রাজ্যে প্রায় এক কোটি তিরিশ লক্ষ টন আলু হয়েছে। কিন্তু রাজ্যের হিমঘরে এত আলু মজুত করার জায়গা নেই। এই পরিস্থিতিতে অভাবী বিক্রি বন্ধ করার কথা জানিয়ে নির্বাচনের আগে, জ্যোতি আলু ওঠার ঠিক শুরুতে সাড়ে ন’টাকা কেজি দরে আলু কেনার কথা ঘোষণা করে রাজ্য সরকার। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের জন্য হিমঘরের মোট মজুত জায়গার ন্যূনতম ৩০ শতাংশ বরাদ্দ রাখার সিদ্ধান্ত হয়। সরকারি নির্দেশে জানানো হয়েছে, এ বার মাথাপিছু ৭০ বস্তা, অর্থাৎ, ৩৫ কুইন্টাল আলু হিমঘরে মজুত রাখতে পারবেন চাষিরা। মজুত করা এই আলুই হিমঘর মালিকদের থেকে কিনবে সরকার। ১ মার্চ থেকে ২০ মার্চ পর্যন্ত প্রথমে আলু মজুত করার সময় বেধে দেওয়া হয়। পরে আরও পাঁচ দিন বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু মেদিনীপুরের আলু চাষি স্বপন ঘড়াইয়ের দাবি, ‘‘সরকার বাছাই করা আলু কিনবে। বাকি আলু চাষি বিক্রি করবে কী করে, সে নিয়ে সরকারের কোনও মাথাব্যথা নেই। ব্যবসায়ী বা ফড়েদের হাত থেকে নিস্তার নেই আমাদের।’’

‘পশ্চিমবঙ্গ প্রগতিশীল আলু ব্যবসায়ী সমিতি’র রাজ্য সম্পাদক লালু মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘সহায়ক মূল্যে আলু কেনার আর্থিক দায় প্রাথমিক ভাবে এসে পড়েছে হিমঘর মালিকদের উপরে। সরকার ঋণ পাইয়ে হিমঘর মালিকদের আলু কেনার বন্দোবস্ত করে দিচ্ছে বলে জানিয়েছে এবং ভবিষ্যতে আলুর দামের উপরে ১০ শতাংশ লাভ দেবে বলেছে। কিন্তু আলুর দাম পড়লে, কোন হারে সরকার টাকা দেবে বা আদৌ কবে কিনবে, তা ভাবাচ্ছে ব্যবসায়ীদের। তাই হিমঘর মালিকদের বড় অংশই আলু কেনার ব্যাপারে উৎসাহ দেখাচ্ছেন না।’’

এই পরিস্থিতিতে তৃণমূল সরকারের রাজ্যের আলু বাইরে না পাঠানোর নীতির সমালোচনা করে পালে হাওয়া টানার চেষ্টা করছে বিজেপি। এক সময়ে পশ্চিমবঙ্গের আলুর ভাল বাজার ছিল ভিন্‌ রাজ্যে। ২০২৪ সালে আলুর দাম নিয়ন্ত্রণ করার তাগিদে রাজ্যের সীমান্তে পুলিশি ধরপাকড় করে আলুর ট্রাক আটকায় তৃণমূল সরকার। ‘পশ্চিমবঙ্গ প্রগতিশীল আলু ব্যবসায়ী সমিতি’র রাজ্য সম্পাদক লালু বলছেন, ‘‘এখন আর নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও ওড়িশা, ঝাড়খণ্ডের মতো রাজ্যে পশ্চিমবঙ্গের আলুর বাজার অনেকটাই নষ্ট হয়ে গিয়েছে। উত্তরপ্রদেশের আলু সেই বাজারের দখল নিয়েছে। আলুর দাম কম রাখার রাজনৈতিক লক্ষ্য আলু ব্যবসায়ী ও চাষিকে বিপন্ন করেছে।’’ মেদিনীপুরের আলু ব্যবসায়ী সুখেন সরকারের মন্তব্য, ‘‘আলু চাষের মরসুমে বীজ, সার প্রভৃতির কালোবাজারি প্রায় বাঁধাধরা। সেই অসাধু চক্র নিয়ন্ত্রণেও সরকার প্রতি বারই ব্যর্থ হয়। নিষেধাজ্ঞা জারি করে বাজারকে বিপর্যস্ত না করে, ফসল-বৈচিত্র এনে চাষকে লাভজনক করতে সহায়ক মূল্যকে ব্যবহার করুক সরকার।’’

এই পরিস্থিতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আলু চাষিদের ক্ষতিপূরণ হিসাবে শস্যবিমার কথা মনে করিয়েছেন। বাইরের রাজ্যে আলু বিক্রি করার ক্ষেত্রে কোনও বাধা নেই বলেও মনে করিয়েছেন। কিন্তু চাষির প্রশ্ন, বিমা তো মেলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে শস্য নষ্ট হলে। ভাল ফলন হলেও বিমায় ক্ষতিপূরণ মিলবে কি?

বর্ষা এলেই কৃষিপ্রধান গড়বেতা-১ ব্লকের শিলাবতী নদীর উপর লাখাটা পোল ভেঙে পড়ে। বিচ্ছিন্ন হয় ব্লক শহরের সঙ্গে ওই এলাকার পাঁচটি অঞ্চলের যোগাযোগ। এই অঞ্চলের কৃষিজাত পণ্য বাজারে পাঠানোই যায় না তখন। একই পরিস্থিতি হয় গড়বেতা-২ ব্লকের পাথরবেড়িয়ায়। ফি বছর সাঁকো তৈরি করে সরকার। তবে জল উঠলেই হয় ভেঙে পড়ে সাঁকো, নয় তলিয়ে যায়। স্থানীয় বাসিন্দা সোনালি বিবির মন্তব্য, ‘‘ভাঙা সাঁকো থেকে পড়ে স্কুলপড়ুয়ার মৃত্যু হলেও কিছুই বদলায় না!’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Farmers Suicide

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy