সিঙ্গুরের রাজনৈতিক ও শিল্পগত ঐতিহ্যকে পুনর্নির্মাণ করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন পশ্চিমবঙ্গের বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। শুক্রবার সংবাদসংস্থা পিটিআই-কে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, রাজ্য সরকার আবার টাটা গোষ্ঠীকে হুগলিতে ফিরিয়ে আনতে চায়।
রাজ্যে বিজেপির জয়ের পর শিল্প ভাবনা নিয়ে পিটিআই-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শমীক বলেন, “যদি টাটাকে আবার সিঙ্গুরে ফিরিয়ে আনা যায়, তা হলে প্রায় দু’দশক আগে ন্যানো প্রকল্পকে রাজ্য থেকে বিতাড়িত করায় বিনিয়োগকারীদের কাছে যে ‘ভুল বার্তা’ গিয়েছিল, তা মুছে ফেলা যাবে।” তিনি আরও বলেন, “আমরা চাই টাটারা ফিরে আসুক এবং সিঙ্গুরেই। আমরা পুরো দেশ ও বিশ্বের কাছে বার্তা দিতে চাই যে, পশ্চিমবঙ্গ বিনিয়োগবান্ধব এবং বিনিয়োগকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত।”
২০০৮ সালে সিঙ্গুর থেকে ন্যানো প্রকল্পের বিদায় সংক্রান্ত বিতর্কের কথা উল্লেখ করে শমীক বলেন, “শিল্পের প্রতি বাংলার অনীহার একটি স্থায়ী প্রতীক হয়ে উঠেছিল টাটার কারখানা ভেঙে ফেলার ঘটনা। রাজ্য সম্পর্কে একটা ভুল বার্তা ছড়িয়ে যায় যে, বাংলায় শিল্পকে স্বাগত জানানো হয় না। পরবর্তী কালে, কাটমানি সংস্কৃতি, সিন্ডিকেট রাজ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি সেই পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তোলে। আমরা সেই ধারণা সংশোধন করতে চাই।”
টাটাদের সিঙ্গুরে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত কি আগের সরকারের করা ভুলের ‘প্রায়শ্চিত্ত’? শমীক বলেন, “টাটার চলে যাওয়া রাজ্যে বিনিয়োগের পরিবেশের স্থায়ী ক্ষতি করেছে। আমরা চাই টাটারা অটোমোবাইল বা অন্য যে কোনও সেক্টরে সিঙ্গুর বা বাংলায় ফিরে আসুক। তারা আমাদের দেশের অন্যতম প্রাচীন, সম্মানিত এবং বিশ্বস্ত গোষ্ঠী।”
সিঙ্গুরকে বেছে নেওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিক ভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শমীক জানান, টাটার বিরুদ্ধে আন্দোলন যদি তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ক্ষমতায় আসতে সাহায্য করে থাকে, তবে বহু বিনিয়োগকারীর চোখে এই আন্দোলন ছিল শিল্প থেকে বাংলার মুখ ফিরিয়ে নেওয়ারও প্রতীক। ২০০৮ সালে ন্যানো প্রকল্পের বিদায় এবং পরবর্তীতে প্রায় তৈরি হয়ে যাওয়া কারখানা ভেঙে ফেলা কর্পোরেট ইন্ডিয়াকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। শমীকের মতে, বিজেপি সেই সিঙ্গুরকে শিল্পের বিদায়ের প্রতীক থেকে প্রত্যাবর্তনের প্রদর্শনী হিসাবে পুনর্নির্মাণ করতে চাইছে।
যে সিঙ্গুর এক সময় শিল্পায়ন এবং জমির অধিকারের মধ্যে সংঘাতের প্রতীক ছিল, সেখানে টাটা গোষ্ঠীকে ফিরিয়ে আনার বিজেপির এই চেষ্টা তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন শমীক। তিনি জানান, যে জায়গা শিল্পের বিদায়ের প্রতীক ছিল, তাকেই শিল্পের প্রত্যাবর্তনে রূপান্তরিত করাই বিজেপির লক্ষ্য।
বিধানসভার ভোটের আগেই সিঙ্গুরের মাটিতে দাঁড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগ ফেরানোর প্রসঙ্গ ছুঁয়ে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তবে তখন সিঙ্গুরে টাটাকে ফিরিয়ে আনা নিয়ে স্পষ্ট কিছু বলেননি। কিন্তু রাজ্য বিজেপির সভাপতি স্পষ্টই জানালেন তাঁরা সিঙ্গুরে টাটাকেই ফেরাতে চান এবং তার মাধ্যমে গোটা ভারতে এই বার্তাই পৌঁছোতে চান যে পশ্চিমবঙ্গ একটি ‘বিনিয়োগবান্ধব’ রাজ্য।
শমীক এ-ও জানান, জমি অধিগ্রহণ নীতির আমূল পরিবর্তন ছাড়া বাংলায় শিল্পের পুনরুজ্জীবন সম্ভব নয়। তিনি বলেন, “আমাদের সামগ্রিক জমি নীতি ছিল না। মমতা ঘোষণা করেছিলেন যে, সরকার শিল্পের জন্য এক ইঞ্চি জমিও অধিগ্রহণ করবে না। কোম্পানিগুলিকে সরাসরি জমি কিনতে হবে। শিল্পপতিরা এমন একটি অদ্ভুত এবং ত্রুটিপূর্ণ নীতির অধীনে জমি অধিগ্রহণের জন্য বাড়ি বাড়ি ঘুরতে পারেন না।”
শমীক এখনই সরকারের নতুন ভূমিনীতি বিষয়ে বিস্তারিত বলতে রাজি হননি। তিনি বলেন, “জমি নীতি ছাড়া শিল্পায়ন হবে না। সরকার এ নিয়ে কাজ করছে এবং আগামীতে এর ফল বোঝা যাবে।”