মুখের কথায় দু’পক্ষই আত্মবিশ্বাসী। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছেন, আগের চেয়ে বেশি আসন পেয়ে তাঁরা রাজ্যে চতুর্থ বারের জন্য ক্ষমতায় ফিরবেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের দাবি, বিজেপি রাজ্যে ১৭০টি আসন দখল করবে। কিন্তু এই দাবি-পাল্টা দাবির অন্তরালে, মাটির গভীরে পশ্চিমবঙ্গে এ বার কি রাজনৈতিক ভূমিকম্পের সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে? সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফলের সঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) গতিপ্রকৃতি মিলিয়ে দেখলে সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়ার উপায় নেই!
সহজ করে বলতে গেলে, রাজ্যের ১১টি জেলায় ছড়িয়ে থাকা ৬০টি বিধানসভা কেন্দ্রে নিহিত থাকতে পারে সম্ভাব্য সেই ভূমিকম্পের উৎসকেন্দ্র। তার মধ্যে ২৫টি কেন্দ্র খাস কলকাতা ও রাজধানী শহর সংলগ্ন উত্তর ২৪ পরগনা, হাওড়া ও হুগলি জেলায়। বাকি আসনগুলি মুর্শিদাবাদ, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া, দুই বর্ধমান ও দুই মেদিনীপুরে। এই আসনগুলির ফল কোন দিকে যাবে, তার মধ্যেই ধরা থাকতে পারে পশ্চিমবঙ্গে পরবর্তী সরকার গঠনের প্রাণ-ভোমরা।
মধ্য, দক্ষিণ ও রাঢ়বঙ্গে বিস্তৃত এই সব আসনেই গত লোকসভা নির্বাচনের নিরিখে জয়-পরাজয়ের (বিধানসভা ভিত্তিক ‘লিড’) ছিল ১০ থেকে ১৫ হাজার হাজার ভোটের মধ্যে। কয়েকটি আসনে সেই অঙ্ক হাজার ভোটেরও নীচে। সাধারণ ভাবেই পিছিয়ে থাকা পক্ষ এই স্বল্প ব্যবধানের অর্ধেক পূরণ করতে পারলে ফল উল্টে যেতে পারে। এখন তার সঙ্গে যোগ হয়েছে এসআইআর। খসড়া ও চূড়ান্ত তালিকা মিলে আগেই প্রায় ৬৪ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে গোটা রাজ্যে। এখন ‘বিবেচনাধীন’ তালিকার নিষ্পত্তির যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তাতে কম-বেশি আরও ২৫ লক্ষ মানুষের এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ মিলবে না বলেই ইঙ্গিত। ভোটার ঝাড়াই-বাছাইয়ের পরে ওই স্বল্প ব্যবধানের কেন্দ্রে কোন দলের বাক্সে কত সিঁদ কাটা হয়ে যেতে পারে, বোঝার উপায় কারও কাছেই নেই!
অল্প তফাতের ওই বিধানসভা কেন্দ্রগুলি মধ্যে ১৩টিই রয়েছে উত্তর ২৪ পরগনায়। মুর্শিদাবাদে ১০টি, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়ায় ৯টি, কলকাতায় ৪টি, হাওড়া ও হুগলি মিলে ৮টি, দুই বর্ধমান ও দুই মেদিনীপুরেও ৮টি করে। এ ছাড়াও, উত্তরবঙ্গের তিন জেলায় ৮টি, নদিয়ায় তিনটি এমন আসন আছে। পাশাপাশি, ভোটার তালিকায় ‘বিচারাধীনে’র সংখ্যা মুর্শিদাবাদে ছিল ১১ লক্ষ, উত্তর ২৪ পরগনায় ৫ লক্ষ ৯১ হাজার, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়ায় ৭৩ হাজার, গোটা কলকাতায় প্রায় এক লক্ষ ৪০ হাজার, হাওড়া ও হুগলিতে ৪ লক্ষ ৬১ হাজার, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুরে এক লক্ষ ৮৩ হাজার এবং পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমানে ৫ লক্ষ ৩ হাজার। নির্বাচন কমিশনের হিসেব অনুযায়ী, ‘বিচারাধীনে’র মধ্যে গড়ে ৪০% ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ যাচ্ছে। অর্থাৎ এসআইআর-এর হিসেব ওই চিহ্নিত আসনগুলিতে রাজনৈতিক নানা হিসেব-নিকেশই ওলটপালট করে দিতে পারে। প্রসঙ্গত, একটি হিসেব অনুযায়ী, নিষ্পত্তি শুরু হওয়ার আগে মোট প্রায় ১১১টি কেন্দ্রে ‘বিবেচনাধীন’ ভোটারের সংখ্যা ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের নিরিখে সেই আসনে জয়ের ব্যবধানের চেয়ে বেশি ছিল।
অঙ্কের হিসেব কষেই যুযুধান দুই শিবির অবশ্য কোমর বাঁধছে। তৃণমূল কংগ্রেসের একটি সূত্রের দাবি, মালদহ ও মুর্শিদাবাদ বাদ রেখে বেশির ভাগ জেলার অধিকাংশ আসনেই এসআইআর-এ নাম বাদের ধাক্কা তারা সামলে নিতে পারবে। ‘বিচারাধীন’ হয়ে যাওয়া ভোটারদের অনেককেই প্রয়োজনীয় সুবিধা দিয়ে তালিকায় আবার ফিরিয়ে আনা হয়েছে। স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতার কথায়, ‘‘অন্য বারও বিজেপির বদমায়েশি থাকে। কিন্তু এ বারের বদমায়েশিটা আলাদা! কেন্দ্রীয় সরকারের সমস্ত সংস্থা দিয়ে, কমিশনকে দিয়ে ভোট লুট করার, নাম কাটার সব রকম ষড়যন্ত্র করছে। কিন্তু খেলাটা আমরা ধরে ফেলেছি। যত নাম কেটেছে, আমরা আমাদের সাধ্য মতো চেষ্টা করেছি। এর বদলা ভোটের বাক্সে হবে!’’ ভবানীপুরে লোকসভা ভোটের ‘লিডে’র চেয়ে অনেক বেশি নাম কাটা গিয়েছে। তবে তৃণমূল প্রার্থী মমতার দাবি, আরও নাম কাটা হলেও বিজেপি সেখানে জিতবে না।
দোদুল্যমান জায়গায় থাকা ওই আসনগুলিতে কেবল তৃণমূল-বিজেপিই নয়, কোথাও বাম এবং কোথাও কংগ্রেসের ভোটও নির্ণায়ক ভূমিকা নিতে পারে। বিশেষত, বাম ভোটের দিকে নজর রয়েছে বিজেপির। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, সিপিএম প্রার্থীরা ‘ভোট কেটে নেওয়ায়’ লোকসভায় কিছু আসনে বিজেপির জয় আটকে গিয়েছিল। শুভেন্দুর কথায়, ‘‘তখন এসআইআর হয়নি। এখানে ২০০২ সালের পরে বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দুদের মধ্যে কিছু অংশের সমস্যা হয়েছে এসআইআর-এর কারণে। কিন্তু অবৈধ বাংলাদেশি মুসলিমের নামও হাজার-হাজার বাদ গিয়েছে। সব চেয়ে বড় কথা, সাত-আট দফা ভোটের সুযোগে যে মৃত ও অবৈধ ভোটারের নামে তৃণমূল ছাপ্পা মারত, এ বারে সেটা করতে পারবে না।’’
আর কী বলছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়? তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের প্রত্যয়, ‘‘আগামী ৪ মে-র পরে (ফলপ্রকাশের তারিখ) সুদে-আসলে সব হিসেব হবে!’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)