দুর্নীতি-দাগে পরোয়া নেই বালুর, ‘নিশ্চিন্ত’ নারায়ণও

শিয়রে ভোট। কী পরিস্থিতি জেলায় জেলায়? খোঁজ নিল আনন্দবাজার

অনির্বাণ দাশগুপ্ত

শেষ আপডেট: ২১ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৪১
জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক (বালু)।

জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক (বালু)। —ফাইল চিত্র।

চৈত্রের দুপুরে দলের স্থানীয় নেতার বাড়ির তেতলায় বসে কর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক (বালু)। অগত্যা নীচে অপেক্ষা। কথা হচ্ছিল শাসকদলের কর্মীদের সঙ্গে। অল্পবয়সি একটি ছেলে হাসতে হাসতে বললেন, ‘‘বাণীপুরের জনসভায় দিদি বালুদা-কে ফেভারিট বলেছেন। তার পর থেকে দাদা দারুণ চনমনে। পুরনো মেজাজটা ফিরে এসেছে।’’

হাবড়ার তিন বারের বিধায়ক তথা প্রাক্তন খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয়কে নিজের পরিচয় দিয়ে বাঙালি শিষ্টাচার মেনে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘‘কেমন আছেন?’’ আকর্ণ বিস্তৃত হাসি হেসে তাঁর পাল্টা প্রশ্ন, ‘‘আমাকে কেমন দেখছেন?’’ সত্যিই চনমনে তিনি। রেশন দুর্নীতি মামলায় গ্রেফতারের ঘটনাকে যেন অনেকটাই পিছনে ফেলে দিয়েছেন। একে প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার হাওয়া, তার উপরে গত লোকসভা নির্বাচনের নিরিখে হাবড়া বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপির ১৯ হাজারের মতো ভোটে এগিয়ে থাকা। বালু মল্লিক কি এ বার কঠিন লড়াইয়ের মুখোমুখি? মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে বললেন, ‘‘গত বার কুড়ি হাজারের বেশি ব্যবধান সামলে সাড়ে তিন হাজারের বেশি ভোটে রাহুল সিংহকে হারিয়েছিলাম। আমার বিরুদ্ধে সে বার প্রচার করে গিয়েছিলেন খোদ অমিত শাহ। এসেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী, দিলীপ ঘোষ, তথাগত রায়, মিঠুন চক্রবর্তীরা। কিস্যু করতে পারেনি। আমার তো একটাই সম্বল—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।’’

এ বারে জ্যোতিপ্রিয়ের প্রধান অস্ত্র উন্নয়ন। প্রতিটি ওয়ার্ডে ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসা পরিষেবা, ‘কলতান’ কমিউনিটি হল, থানার পরিকাঠামোর উন্নতি, মসৃণ রাস্তাঘাট—সব আসছে প্রচারে। তিনি জানালেন, এ বার জিতলে পানীয় জলের ‘সুবন্দোবস্ত’ এবং গোটা হাবড়ার নিকাশি ব্যবস্থার আমূল সংস্কার হবে। জ্যোতিপ্রিয়ের দাবি, আরও একটা কারণে হাবড়াবাসী তাঁর পাশেই থাকবেন। তা হল আইনশৃঙ্খলা। তাঁর কথায়, ‘‘একদা হিংসাদীর্ণ হাবড়ায় এখন শান্তি বিরাজ করছে। তাই এই অঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্য বেড়েছে।’’

ভোটে কি তা হলে দুর্নীতি কোনও প্রভাব ফেলবে না? মুখ্যমন্ত্রীর ‘ফেভারিট’ বালুর কথায়, ‘‘দিদি তো বলেই দিয়েছেন, বিজেপি আর সিপিএমের অপকর্ম আমি খুঁজে বার করছিলাম। তাই আমাকে ফাঁসাতে গ্রেফতার করা হয়েছিল। এই বিধানসভা এলাকার বাসিন্দারা আমাকে চেনেন। দুর্নীতির সঙ্গে কোনও অবস্থাতেই যুক্ত নই, তা হাবড়ার মানুষকে নতুন করে বলতে হবে না।’’ তা হলে জয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত? চেয়ারে গা এলিয়ে বালু বলছেন, ‘‘ভেবেছিলাম বিজেপির এমন কেউ প্রার্থী হবেন, যাঁর সঙ্গে দারুণ ফাইট হবে। কিন্তু যাঁকে দাঁড় করিয়েছে, তাতে সুবিধা হয়েছে আমার।’’

কুমড়া অঞ্চলের এক বাড়িতে বসে কর্মীদের নিয়ে বিকেলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘মেরা বুথ সব সে মজবুত’ অনুষ্ঠান শুনছিলেন হাবড়ার বিজেপি প্রার্থী দেবদাস মণ্ডল। ডাকাবুকো মানুষ, কথাও বলেন সোজাসাপটা। তাঁকে প্রতিপক্ষ তেমন গুরুত্ব দিচ্ছেন না শুনে প্রথমে একটু হাসলেন। তার পরে বললেন, ‘‘উনি আয়নায় নিজের মুখ দেখছেন না। যদি দেখতেন, তা হলে ঠিক উত্তরটা দিতেন। উনি নিজেও জানেন, প্রাক্তন হয়ে গিয়েছেন।’’ প্রচারে অভূতপূর্ব সাড়া পাচ্ছেন বলে দাবি দেবদাসের। তৃণমূলের অত্যাচার-অনাচারের বিরুদ্ধে এ বার তাঁর লড়াই, জানালেন তিনি। জিতলে তাঁর অগ্রাধিকার হাবড়া হাসপাতালের উন্নতি এবং যানজট মুক্ত হাবড়া।

এই এলাকায় বিজেপির একটা চোরাস্রোত গত শতকের নব্বইয়ের দশক থেকেই। পশ্চিমবঙ্গে প্রথম যে পুরসভা বিজেপি একক শক্তিতে জিতেছিল, সেটা হাবড়া। এ বার বিধানসভাতেও পদ্ম ফোটাতে আশাবাদী দেবদাস। বললেন, ‘‘পঞ্চায়েত থেকে পুরসভা—সর্বত্র দুর্নীতি আর অত্যাচার। এ বার বদলের হাওয়া বুঝতে পেরে মানুষ মুখ খুলছেন।’’ তাই দুর্নীতি, নারী নির্যাতন থেকে এলাকার ‘অনুন্নয়ন’, কোনও কিছুই মানুষের সামনে তুলে ধরতে ছাড়ছেন না পদ্মপ্রার্থী। জানালেন, জিতলে তৃণমূলের সব দুর্নীতির তদন্ত হবে।

এই কেন্দ্রে সিপিএম এ বার প্রার্থী করেছে ঋজিনন্দন বিশ্বাসকে। জয় নিয়ে ভাবছেন না, তাঁর মূল লক্ষ্য ভোটের হার বাড়ানো। বললেন, ‘‘তৃণমূলের দুর্নীতি, অপশাসনে মানুষ অতিষ্ঠ। এখানকার তৃণমূলের কর্মীরাই তো বলছেন, ওই জেলখাটাকে প্রার্থী না করলেই ভাল হত। বিজেপির হিন্দু-মুসলিমের রাজনীতিতে সবাই বিরক্ত। ফলে বিকল্প বামেরাই।’’

হাবড়ার পাশের কেন্দ্র অশোকনগর। এই কেন্দ্রেরও পদ্ম-যোগ রয়েছে। গত শতকের নব্বইয়ের দশকের শেষে অশোকনগর থেকেই উপনির্বাচনে জিতে বিজেপির প্রথম বিধায়ক হন বাদল ভট্টাচার্য। অতীতকে গুরুত্ব দিতে চান না বিধায়ক তথা তৃণমূল প্রার্থী নারায়ণ গোস্বামী। বলছিলেন, উন্নয়নই শেষ কথা। তাঁর কথায়, ‘‘সারা বছর এলাকাবাসীর পাশে থাকি। অশোকনগরের উন্নয়ন হয়নি, এ কথা কেউ বলতে পারবে না।’’ আগামী দিনে অশোকনগরে আধুনিক মানের রিসর্ট এবং ইকো-টুরিজ়মের পরিকল্পনা রয়েছে নারায়ণের। এই কেন্দ্রে বামফ্রন্ট সমর্থিত আইএসএফ প্রার্থী তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়। গত বারও প্রার্থী ছিলেন। এ বার একটু বেশিই মরিয়া। বলছিলেন, ‘‘মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণির বাস অশোকনগরে। ফলে শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি এই এলাকায় তৃণমূলকে প্রবল ধাক্কা দেবে। গ্রামে এসআইআরের ফল ভুগতে হবে দুই ফুলকেই।’’

দেগঙ্গা এবং স্বরূপনগর মুসলিম প্রধান আসন। তাই তৃণমূল খানিকটা সুবিধায়। এই অঞ্চলের তৃণমূল নেতারা ভাতাকেই উন্নয়নের সমার্থক ধরে নিয়েছেন। তবে পঞ্চায়েত স্তরে তৃণমূলের দুর্নীতি, স্বজনপোষণ ও স্থানীয় কিছু নেতার দাদাগিরি নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে। এই দুই কেন্দ্রে বাম-আইএসএফের প্রচার চোখে পড়ার মতো। নজর থমকে যায়, প্রচারে তরুণ ও যুবকদের উপস্থিতি দেখলে। বাম শিবিরের দাবি, দুর্নীতি-অপশাসনের পাশাপাশি ভোটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে এসআইআর।

হাবড়া, অশোকনগর, দেগঙ্গা, স্বরূপনগরের মতো কেন্দ্রগুলিতে এসআইআরে নাম বাদ গিয়েছে মূলত নমঃশূদ্র, মতুয়া এবং মুসলিমদের। হাবড়ার গ্রামাঞ্চলে বছর বাইশের এক সনাতনী তরুণ বলছিলেন, ‘‘আমার বাবারা সাত ভাই। আমাদের পরিবারের মোট ২২ জন সদস্য। সবার নাম উঠেছে, শুধু বাদ গেল ছোট কাকিমার নাম। এটা হয় কী করে? এর ফল ভুগতে হবে।’’ স্বরূপনগরের সায়েস্তানগরে গাছের ছায়ায় বসে আখের রস বিক্রি করছিলেন এক মুসলিম বৃদ্ধ। ক্ষোভের সুরে বললেন, ‘‘আমার বৌয়ের নাম বাদ গিয়েছিল। অনেক দৌড়াদৌড়ি করে নাম তুলতে পারলাম। ইচ্ছে করে বিএলও নাম কেটেছিল। সেই নাম তুলতে যা হেনস্থা হলাম, তা বলার নয়। ভোটটা বুঝেশুনে দিতে হবে।’’ এমন ক্ষোভের আগুন উত্তর ২৪ পরগনার গ্রামাঞ্চল ও মফ্‌ফসলের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে। সেই আগুন কার ঘর পোড়াবে, উত্তরের জন্য অপেক্ষা ৪ মে পর্যন্ত।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Jyotipriya Mallick TMC MLA Jyotipriya Mallik

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy