প্যারিসের ফিলিপে শঁতিয়ে কোর্টে শনিবার দুপুরে যখন মীরা আন্দ্রিভা নামছেন, তখন তাঁর চোখমুখে এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস। উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে এ বারের চমক অবাছাই মাজ়া খোয়ালিনস্কা। তাতে কী? আন্দ্রিভা জানতেন, নিজের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে পারলে চ্যাম্পিয়ন হওয়া থেকে তাঁকে আটকানো কঠিন। সেটাই করলেন আন্দ্রিভা। স্ট্রেট সেটে (৬-৩, ৬-২) খোয়ালিনস্কাকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হলেন তিনি। জিতলেন কেরিয়ারের প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যাম। রোলঁ গারোজের লাল সুরকি পেল নতুন রানি।
ফাইনালে ওঠার পথে মাত্র একটি সেট খুইয়েছিলেন আন্দ্রিভা। প্রথম সারির কোনও প্রতিপক্ষ পাননি তিনি। ফাইনালেও তাঁর সামনে ছিলেন অবাছাই। ফলে প্রথম বার গ্র্যান্ড স্ল্যামের ফাইনাল খেলার চাপ সে রকম ছিল না। যদিও কেরিয়ারে এর আগে গ্র্যান্ড স্ল্যামে কোনও দিন কোয়ার্টার ফাইনাল টপকাতে পারেননি আন্দ্রিভা। ফলে ফাইনালে তিনি স্নায়ুর চাপ ধরে রাখতে পারবেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। সেই প্রশ্নে লেটার মার্কস নিয়ে পাশ করলেন আন্দ্রিভা। আরও একটি নিখুঁত ম্যাচ খেললেন।
মাত্র ১৯ বছর বয়স আন্দ্রিভার। এই অল্প বয়সেই নজর কেড়়েছেন। অষ্টম বাছাই হিসাবে নেমেছিলেন ফরাসি ওপেনে। মাত্র তিন বছর আগে মহিলাদের জুনিয়র এক নম্বর ছিলেন আন্দ্রিভা। পেশাদার টেনিস শুরু করার পর অবশ্য তাঁর কৃতিত্ব প্যারিস অলিম্পিক্সে মহিলাদের ডাবলসে রুপো জয় ও দু’টি ডব্লিউটিএ ১০০০ ট্রফি জেতা। গ্র্যান্ড স্ল্যামে এই প্রথম কোনও ট্রফিতে নিজের নাম খোদাই করলেন তিনি।
আন্দ্রিভার প্রতিপক্ষ খোয়ালিনস্কা এ বারের ফরাসি ওপেনের চমক। আন্দ্রিভার থেকে পাঁচ বছরের বড় হলেও টেনিস ক্রমতালিকায় ১১৩ নম্বরে থাকা খোয়ালিনস্কা অবাছাই হিসাবে সুযোগ পেয়েছিলেন। একের পর এক প্রতিপক্ষকে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছিলেন পোল্যান্ডের এই খেলোয়াড়। এমনিতেই টেনিস বা ব্যাডমিন্টনের মতো প্রতিযোগিতায় বাঁহাতি খেলোয়াড়দের বাড়তি সুবিধা থাকে। তাঁর কোর্টের কোণ অনেক ভাল ব্যবহার করতে পারেন। তবে তার জন্য তো নিজের পছন্দের শট খেলতে হবে। গোটা ম্যাচে আন্দ্রিভা খোয়ালিনস্কাকে বাধ্য করলেন ব্যাক হ্যান্ডে খেলতে। ফলে লম্বা র্যালি হল বটে। কিন্তু খোয়ালিনস্কার পাওয়ার গেম কাজে আসল না।
প্রথম সেটের তৃতীয় গেমেই খোয়ালিনস্কার সার্ভিস ভেঙে এগিয়ে যান আন্দ্রিভা। কিন্তু তা কাজে লাগাতে পারেননি। কারণ, পরের গেমেই তাঁর সার্ভিসও ভেঙে দেন খোয়ালিনস্কা। সেই গেমের পরেই আন্দ্রিভা খেলার ধরন বদলে ফেলেন। দুপুরের ম্যাচে লাল সুরকির কোর্টে টপস্পিন কতটা কাজে দেবে তা বুঝতে পারছিলেন তিনি। ফলে পাওয়ার টেনিসের বদলে টপস্পিন কাজে লাগাতে শুরু করেন তিনি। এই পরিকল্পনাতেই বাজিমাত করেন রাশিয়ার খেলোয়াড়।
সপ্তম গেমে আবার খোয়ালিনস্কার সার্ভিস ভাঙেন আন্দ্রিভা। পর পর দু’টি আনফোর্সড এরর করে সার্ভিস খোয়ান তিনি। সেট জেতার সুযোগ পেয়ে যান আন্দ্রিভা। সেই সুযোগ হারাননি তিনি। পরের গেমে নিজের সার্ভিস ধরে রাখেন। পিছিয়ে পড়ে খোয়ালিনস্কা আরও ভুল করতে শুরু করেন। হাজার হোক, প্রথম বার কোনও গ্র্যান্ড স্ল্যামে এত দূর এগিয়েছেন। একটু চাপ তো ছিলই। সেটা সামলাতে পারলেন না পোল্যান্ডের খেলোয়াড়। আরও একটি সার্ভিস খোয়ালেন তিনি। সেই সঙ্গে প্রথম সেট জিতে নেন আন্দ্রিভা।
সার্ভিস কাজে লাগালেন আন্দ্রিভা। প্রথম সার্ভিসের ৫৮ শতাংশ থেকে পয়েন্ট তুললেন। দ্বিতীয় সার্ভিস তো আরও ভাল হল। ৬৭ শতাংশ দ্বিতীয় সার্ভিস থেকে পয়েন্ট তুললেন। উল্টো দিকে দ্বিতীয় সার্ভিস সমস্যায় ফেলল খোয়ালিনস্কাকে। তাঁর দ্বিতীয় সার্ভিসের মাত্র ২০ শতাংশ থেকে পয়েন্ট এল। তার ফলেই গোটা ম্যাচে ১২ বার খোয়ালিনস্কার সার্ভিস ভাঙার সুযোগ পান আন্দ্রিভা। ভাঙেন সাত বার।
আরও পড়ুন:
দ্বিতীয় সেটের দ্বিতীয় গেমেই খোয়ালিনস্কা সার্ভিস ভেঙে ২-০ এগোন আন্দ্রিভা। তৃতীয় গেমে একটা সময় ০-৪০ পিছিয়ে ছিলেন আন্দ্রিভা। দেখে মনে হচ্ছিল, খোয়ালিনস্কা খেলায় ফিরবেন। কিন্তু পর পর চারটি পয়েন্ট জিতে সেই গেম জেতেন আন্দ্রিভা। সেই ধাক্কা থেকে আর ফিরতে পারেননি খোয়ালিনস্কা। ০-৫ পিছিয়ে থাকা অবস্থান দু’টি গেম জিতলেও লাভ হয়নি তাঁর। অষ্টম গেম নিজের নামে করে সেট ও ম্যাচ জিতে যান আন্দ্রিভা। শুয়ে পড়েন লাল সুরকির ওপর। বিশ্বাস হচ্ছিল না রাশিয়ার খেলোয়াড়ের।
আন্দ্রিভার প্রথম ফাইনাল দেখতে ফিলিপে শঁতিয়ে কোর্টে হাজির হয়েছিল তাঁর পরিবার। চ্যাম্পিয়ন হয়ে সোজা গ্যালারিতে ছুটলেন তিনি। প্রিয়জনদের সঙ্গে করলেন উল্লাস। তবে ফিলিপে শঁতিয়ে কোর্ট প্রশংসা করল খোয়ালিনস্কারও। অবাছাই হিসাবে নেমে গত দু’সপ্তাহে যে খেলা তিনি খেলেছেন, তা বুঝিয়ে দিল, আগামী দিনে আরও চমক দিতে পারেন তিনি।