ভোটের আগে প্রধানমন্ত্রীর জনসভা ঘিরে রাজনীতির সওয়াল-জবাবের প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু প্রায় একই সময়ে শনিবার দু’দলের কর্মী- সমর্থকদের মধ্যে ঘটে যাওয়া সংঘর্ষকে সামনে এনে বিজেপিকে কাঠগড়ায় তুলল তৃণমূল কংগ্রেস। এই ঘটনা নিয়েই বিজেপিকে বিঁধে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সমাজমাধ্যমে লিখলেন, ‘‘এটাই বিজেপির সংস্কৃতি!’’
সংঘর্ষে আক্রান্ত মন্ত্রী শশী পাঁজাকে সামনে রেখেই বিজেপির এই ‘পরিবর্তন সঙ্কল্প সভা’র পরিণতি বোঝাতে নেমে পড়ল রাজ্যের শাসকদল। শশীর প্রশ্ন, ‘‘এই পরিবর্তনই আনতে চাইছেন আপনারা!’’ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য সম্পর্কে কিছু না-বললেও সংঘর্ষ নিয়ে অভিষেকের বার্তা, ‘‘বহিরাগত জমিদারেরা শান্তি নষ্ট করে ভীতি ছড়াতে চাইছে। আমরা এটা ভুলব না, ক্ষমাও করব না!’’ ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনে (এসআইআর) রাজ্যে বিপুল সংখ্যক মানুষের নাম বাদ ও বিবেচনাধীন তালিকায় চলে যাওয়া নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর মুখে কোনও কথা শোনা যাচ্ছে না কেন, সেই প্রশ্ন তুলেছে সিপিএম।
ব্রিগেড ময়দানের সভায় নানা প্রসঙ্গেই রাজ্য সরকার ও শাসক তৃণমূলকে আক্রমণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। সভা শেষ হতেই জবাবি আক্রমণে নেমেছে তৃণমূল। শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু বলেছেন, ‘‘এই রকম মানবতা-বিরোধী বক্তৃতা পৃথিবীতে আর কেউ দেননি! (শুনলে) মনে হয়, ফ্যাসিবাদ থেকে আমরা খুব বেশি দূরে নেই।’’ তাঁর কথায়, ‘‘প্রধানমন্ত্রী পর্যটক হয়ে বারবার আসুন। কিন্তু তথ্য-নির্ভর কথা বলুন।’’ অনুপ্রবেশ, দুর্নীতির প্রশ্নে তৃণমূলকে নিশানা করেছেন মোদী। জবাবে ব্রাত্য বলেন, ‘‘বলা হল, রোহিঙ্গা ও অনুপ্রবেশকারী নাকি থিকথিক করছে। এসআইআর ( ভোটার তালিকার সংশোধন) হল। সেখানে কত জন রোহিঙ্গা খুঁজে পেয়েছেন? কত জন অনুপ্রবেশকারী খুঁজে পেয়েছেন?’’
এই তরজা প্রত্যাশিতই ছিল। কিন্তু সভা শুরুর আগে গিরিশ পার্কে বিজেপি ও তৃণমূলের সংঘাতে রক্তাক্ত হয়েছেন দু’পক্ষের অনেকে। তাতেই রাজ্যের মন্ত্রীর বাড়ি আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাকে পরিকল্পিত হামলা বলে উল্লেখ করে বিজেপিকে কাঠগড়ায় তুলতে চেয়েছে তৃণমূল। ব্রাত্য বলেছেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রী খুঁজে খুঁজে হিসেব নেওয়ার হুমকি দিলেন। বিজেপির কর্মীরা তার একটি নিদর্শন রেখেছেন মন্ত্রীর বাড়ি আক্রমণ করে।’’ তাঁর কথায়, ‘‘নির্বাচনের আগে এই গুন্ডামিকে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।’’ শশী বলেন, ‘‘এত দিন এসআইআর-এর মাধ্যমে মানুষকে মারতে চেয়েছে। এখন দেখছি, এরা শারীরিক ভাবে মারতে চাইছে। রামের নামে হিংস্র হয়ে উঠল!’’ রাজনৈতিক বিরোধিতাকে ব্যক্তিগত আক্রমণের দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতার জন্য বিজেপি ও তৃণমূলকে দুষেও সিপিএমের প্রাক্তন সাংসদ বিকাশ ভট্টাচার্যের বক্তব্য, ‘‘মোদীর সভায় যাওয়ার পথে শহরের বুকে এক মন্ত্রীর বাড়িতে আক্রমণ অসভ্যতা ভিন্ন কিছু নয়।’’
অনুপ্রবেশ, সংখ্যালঘু তোষণ, কর্মসংস্থান নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগ খণ্ডন করে ব্রাত্য বলেছেন, ‘‘একই কথা উত্তরপ্রদেশে বলেছেন, ঝাড়খণ্ড, মধ্যপ্রদেশেও বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। নারীর সুরক্ষাই হোক বা কর্মসংস্থান, এ সব নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কথা বলার কোনও অধিকার নেই। উন্নাও, হাথরসে নারী নির্যাতনের সময়ে ওঁর এ সব কথা মনে পড়েনি?’’ সেই সঙ্গেই ব্রাত্যের বক্তব্য, ‘‘বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতে কর্মসংস্থানের অবস্থা আমরা জানি। এ রাজ্যে চাকরির আশায় দলে দলে লোক আসছেন বিহার, উত্তরপ্রদেশ থেকে। এসএসসি পরীক্ষা দিতে কত জন আমাদের এখানে এসেছেন, সেই হিসেব আগেও দিয়েছি।’’
ব্রিগেডের সভা থেকে পরিবর্তনের ডাক দিয়ে প্রধানমন্ত্রী এ দিন বলেছেন, তৃণমূলকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। সেই প্রশ্নে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের মন্তব্য, ‘‘এত দিন কে বাঁচাচ্ছে? উনি বাঁচাতেন! রাজনাথ সিংহ, উমা ভারতী, অরুণ জেটলিরা যখনই এসেছেন, তৃণমূল নেত্রীর প্রশাংসা করেছেন। মোদী আগে এই ব্রিগেডে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ৩৪ বছরে সিপিএম যে গাড্ডা বানিয়েছে, তা ভরতে দিদিকে সময় দিতে হবে। এখন আবার লড়াইয়ের নাটক চলছে।’’ সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী বলেছেন, ‘‘সংখ্যালঘু, মতুয়া, আদিবাসী থেকে শুরু করে সন্ন্যাসী পর্যন্ত যাঁদেরই কাগজের জোর কম, এসআইআর-এর নামে তাঁদের ভোটার তালিকা থেকে ছারখার করে দেওয়া হল। নির্বাচন কমিশনকে কাজে লাগিয়ে মানুষের সাংবিধানিক অধিকার যারা কেড়ে নিচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গ তাদের ছেড়ে কথা বলবে না!’’
প্রধানমন্ত্রী মোদী ব্রিগেডে সভা করার দিনেই তাঁর উদ্দেশে গ্যাস-সঙ্কট, বিদেশনীতি এবং বাণিজ্য চুক্তির ব্যর্থতার মতো নানা অভিযোগ তুলে খোলা চিঠি লিখেছেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার। ‘সাধারণ নাগরিক’ হিসাবে শুভঙ্করের বক্তব্য, “ডোনাল্ড ট্রাম্প ২৮ বার দাবি করেছেন তাঁর কথাতেই ‘অপারেশন সিঁদুরে’র সময় ভারত যুদ্ধবিরতি করেছিল। অথচ সেই ট্রাম্পের সঙ্গেই বাণিজ্য চুক্তি করলেন। ব্যর্থ বিদেশনীতির কারণে দেশের রান্নাঘরে গ্যাসের অভাবে মায়েরা চোখের জল ফেলছেন।” ব্রিগেডে এটাই বিজেপির শেষ সভা বলেও দাবি করেছেন প্রদেশ সভাপতি।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)