বিশ্বকাপে অভিযান শুরুর আগে ফিটনেস টেস্ট নিয়েই যেন বেশি ব্যস্ত থাকতে হল আর্জেন্টিনা কোচ লিয়োনেল স্কালোনিকে। কোথাও তিনি স্বস্তি পেলেন, কোথাও অপেক্ষা করল উদ্বেগ। সব চেয়ে বড় স্বস্তি অবশ্যই গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেসের উন্নতি। অ্যাস্টন ভিলার হয়ে ইউরোপা কাপের ফাইনাল খেলতে গিয়ে ডান হাতের আঙুলে চোট পান কাতার বিশ্বকাপ ফাইনালের নায়ক। পরীক্ষায় ধরা পড়ে আঙুলের হাড়ে চিড় ধরেছে। তার পর থেকেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তিনি প্রথম ম্যাচে খেলতে পারবেন কি না।
আমেরিকায় এসে পৌঁছনোর পরেও মার্তিনেসের মাথার উপর মেঘাচ্ছন্ন আকাশ পরিষ্কার হচ্ছিল না। প্রথম বার যখন পরীক্ষা হয়, বিরাট কোনও উন্নতি ধরা পড়েনি। তখন আর্জেন্টিনা দলের মেডিক্যাল টিম নতুন কিছু প্রক্রিয়া প্রয়োগ করে যাতে তাদের এক নম্বর গোলরক্ষক দ্রুত সেরে উঠতে পারেন। চোট পাওয়া আঙুলে প্রচুর ‘টেপ’ লাগিয়ে দেওয়া হয়। এক দিন আগে অনুশীলনে নামিয়ে দেখা হয় মার্তিনেসকে। চোট লাগার পরে এই প্রথম তিনি বলে হাত দিলেন। দেখেশুনে মেডিক্যাল টিমের মনে হয়েছে, তিনি অনেকটাই সুস্থ। সেই কারণে আলজিরিয়ার বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচে তাঁর খেলার সম্ভাবনা উজ্জ্বল।
সমুদ্রসৈকতের জন্য বিখ্যাত আর্জেন্টিনার মার দেল প্লাটা শহরের জনপ্রিয় তারকা মার্তিনেস ব্যক্তিগত কীর্তির সামনেও দাঁড়িয়ে রয়েছেন। সব চেয়ে বেশি সংখ্যক ম্যাচে গোল না খাওয়ার দৌড়ে তিনি এখন দু’নম্বরে। ৫৯ ম্যাচের ৪১টিতে গোল খাননি। আর্জেন্টিনার জার্সিতে এই রেকর্ড রয়েছে সের্জিয়ো রোমেরোর। ৯৬ ম্যাচ খেলে ৪৭টিতে গোল খাননি রোমেরো। আর মার্তিনেস এমন এক জন ফুটবলার যিনি পরিসংখ্যানের নেশায় ডুবে থাকেন। কয়েকদিন আগে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘‘আমার এই রেকর্ডটা চাই। আমি সব সময় নিজের সামনে একটা বড় লক্ষ্য রেখে এগোতে চাই।’’ তবে ব্যক্তিগত চাঁদমারির চেয়ে দলগত নিশানাকে যে সব সময় এগিয়ে রাখেন, তা মনে করিয়ে দিতেও ভোলেননি। ‘‘কোনও কিছুই দলীয় লক্ষ্যের আগে নয়,’’ বলে দেন তিনি। আর সত্যিই তো গোল বাঁচানোর মুকুট তো তাঁর মাথাতেই সব চেয়ে ভাল শোভা পায়। কে ভুলতে পারবে কাতার বিশ্বকাপ ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে সেই দুরন্ত ‘সেভ’। না হলে মেসির কাপ-জয়ের স্বপ্নপূরণ হয় কি না, সন্দেহ। মার্তিনেস পরীক্ষায় পাশ করে গেলেও নিকোলাস ট্যাগলিয়াফিকো প্রথম ম্যাচ থেকে ছিটকে গিয়েছেন। কাতার বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনার হয়ে খেলা দলটির প্রায় নব্বই শতাংশ ফুটবলার এখানেও প্রথম ম্যাচে থাকতে পারেন, যা কার্যত নজিরবিহীন।
ফুটবলবিশ্ব যদিও আর্জেন্টিনা দলের চোট-আঘাত নিয়ে ভাবিত নয়। তাদের মুখে মুখে ঘুরছে একটাই প্রশ্ন— লিয়োনেল মেসি কি পর-পর দু’বার বিশ্বকাপ জেতার অনন্য নজির গড়তে পারবেন? এখনও পর্যন্ত দু’টি দেশ টানা দু’বার বিশ্বকাপ জিতেছে। ইটালি— ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালে। ব্রাজ়িল— ১৯৫৮ ও ১৯৬২-তে। কিন্তু এই দু’টি জয়ের ক্ষেত্রে দু’টি দলই একবার করে কাপ জিতেছে তাদের মহাদেশে। মেসির আর্জেন্টিনা যদি এ বার কাপ জেতে, দু’বারই তাঁরা জিতবেন বাইরের মহাদেশে। জ়াভি, ইনিয়েস্তাদের সেই মায়াবী স্পেনের মতো এই আর্জেন্টিনা দলের সাম্প্রতিক সাফল্যও কিন্তু উৎসাহিত হওয়ার মতো। পর-পর তিনটি বড় ট্রফি জিতেছে তারা। ২০২১-এ কোপা আমেরিকা, ২০২২-এ বিশ্বকাপ, ২০২৪-এ কোপা। লাতিন আমেরিকার অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এই দলটার সব চেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে কাতারের মতো তারা পুরোপুরি মেসি-নির্ভর নয়। তিনটি ম্যাচের উল্লেখ করা যেতে পারে যেখানে মেসিকে ছাড়াই আর্জেন্টিনা বড় ব্যবধানে জিতেছে। বলিভিয়াকে তাদের দেশে ৩-০ হারানো। নিজেদের দেশে চিলির বিরুদ্ধে ৩-০ জয়। উরুগুয়েকে তাদের দেশে ১-০ হারানো। মেসি নিশ্চয়ই এখনও আর্জেন্টিনার হৃদয় কিন্তু আরও কয়েক জন ভাল তরুণ ফুটবলার এসে গিয়েছে। দু’টো নাম বিশেষ ভাবে শোনা যাচ্ছে। জুলিয়ান আলভারেস ও থিয়াগো আলমাডা। কিন্তু যতই তরুণ তুর্কিরা আসুন, ড্রেসিংরুমে মেসির মহাপুরুষের মতো উপস্থিতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে। ক’দিন আগেই সমাজমাধ্যমে এখনও পর্যন্ত খেলা পাঁচটি বিশ্বকাপের ছবি তুলে দিয়েছিলেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে রদ্রিগো দি পল সেখানে মন্তব্য করেন— ‘‘সব কিছুর জন্য ধন্যবাদ, ক্যাপ্টেন।’’ অধিনায়কের প্রতি কতটা সম্মান, শ্রদ্ধা রয়েছে তরুণ প্রজন্মের, তা এই সব মন্তব্য থেকেই পরিষ্কার হয়ে যায়। তিনি আর্জেন্টিনা না স্পেনের, এমন অপবাদ আগে হয়তো ধেয়ে আসত। কাতারে বিশ্বকাপ জয় সে সব আলোচনাকে অতলান্তিকে ভাসিয়ে দিয়েছে। ১৯৮৬-তে বিশ্বকাপ জেতার পরে ১৯৯০-তেও আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছিলেন দিয়েগো মারাদোনা। চিরকাল যাঁর পাশাপাশি রেখে মেসির অবদানকে মেপেছে আর্জেন্টিনীয় জনতা। মারাদোনা আর নেই, কিন্তু তাঁর ফুটবল কোহিনুরগুলো তো আর অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার নয়। বিশেষ করে ১৯৮৬-র পরে এ বারে আবার যেখানে মেক্সিকোতে বিশ্বকাপ হচ্ছে। যদিও মেসি সেখানে খেলতে যাচ্ছেন না।
কেমন দল আলজিরিয়া? নিজেদের দিনে ফেভারিদের চমকে দিতেই পারে। জ়িদান-পুত্র লুকা জ়িদান গোলরক্ষক। রিয়াধ মাহরেজ আছেন, ম্যাঞ্চেস্টার সিটির হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতা ফুটবলার। যদিও ৩৫ বছর বয়সে তিনি আগের মতো অত সক্রিয় হয়তো নন। ইব্রাহিম মাজ়া আছেন, যাঁকে ‘মারাদোনা’ বলে ডাকা হচ্ছে। মহম্মদ আমুরার দিকেও নজর থাকবে।
চোট-আঘাতের ধাক্কার জন্যই স্কালোনিকে ছক পাল্টাতে হয় কি না, দেখার। ৩-৫-২ নাকি ৪-৪-২? অনুশীলনে নাকি দুই ধরনের নকশাই পরখ করে দেখেছেন আর্জেন্টিনীয় কোচ। সে ক্ষেত্রে রক্ষণে তিন জন হতে পারেন ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো, নিকোলাস ওটামেন্ডি ও লিসান্দ্রো মার্তিনেস। গিলিয়ানো সিমিওয়েনে এবং থিয়াগো আলমাডা দুই উইঙ্গার। এই থিয়াগোকেই অ্যাঙ্খেল দি মারিয়ার উত্তরসূরি ভাবছেন স্কালোনি। কাতারেও তিনি ছিলেন, তবে মাত্র ৬ মিনিট খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন। দারুণ বুদ্ধিদীপ্ত ফুটবল খেলতে পারেন, পাসিং ভাল, প্রচুর পরিশ্রম করতে পারেন এবং কয়েকটি ম্যাচে দেখিয়েছেন মেসির সঙ্গে বোঝাপড়াও দারুণ। উরুগুয়ে এবং কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে তাঁর আসাধারণ গোলের প্রশংসা করেছেন স্বয়ং কোচ। মাঝে রদ্রিগো দি পল, আলেক্সিস ম্যাক-অ্যালিস্টার,এনজ়ো ফার্নান্দেস। উপরে মেসির সঙ্গী হওয়ার ব্যাপারে এগিয়ে লাউতারো মার্তিনেস। তবে জুলিয়ান আলভারেসও আলোচনায় আছেন। যদি সম্পূর্ণ ফিট থাকেন, স্কালোনি তাঁর কথাও ভাবতে পারেন।
স্কালোনি অবশ্য কয়েক দিন আগেই বলেছেন, ছকে যাই পরিবর্তন করতে হোক না কেন, খেলার ভঙ্গি পাল্টাবে না আর্জেন্টিনা। পাস খেলতে খেলতে সামনের দিকে এগোও— এই হচ্ছে তাঁর মন্ত্র। সুন্দর ফুটবলের লক্ষ্য ত্যাগ করতে রাজি নন তিনি। যাঁর দলে লিয়োনেল মেসি নামক জাদুকর আছে, দু’একটা চোট-আঘাতে কি তাদের সৌন্দর্যে কোনও ব্যাঘাত ঘটে? রডোডেনড্রনের শোভা সেই অটুটই থাকে!
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)