E-Paper

মেসি-মায়ায় নীল সাদা ঝড়

শহরটা ঘুরতে গিয়ে মনে হচ্ছে, নিউ ইয়র্কে যেমন হলুদের দাপট ছিল, তেমনই ক্যানসাস সিটির রং এখন নীল-সাদা। যত এগোচ্ছে লিয়োনেল মেসির এ বারের বিশ্বকাপে আত্মপ্রকাশের সময়, তত এই দু’টি রংয়ের আধিপত্য বাড়ছে।

সুমিত ঘোষ

শেষ আপডেট: ১৬ জুন ২০২৬ ০৭:১৫
একাগ্র: বিশ্বকাপ অভিযান শুরুর আগে মেসির প্রস্তুতি।

একাগ্র: বিশ্বকাপ অভিযান শুরুর আগে মেসির প্রস্তুতি। ছবি: পিটিআই।

নিউ জার্সিতে ব্রাজ়িল ম্যাচের দিন মাথার উপর সারাক্ষণ চক্কর কাটছিল হেলিকপ্টার। শুনছিলাম, এ বারের বিশ্বকাপে নিরাপত্তার আয়োজনে যাতে মাছিও না গলতে পারে, তার জন্য মাটির থেকেও উপর থেকে বেশি নজরদারি চলবে। ক্যানসাস সিটিতে এসে দেখা গেল, ম্যাচ পর্যন্তও অপেক্ষা করতে হচ্ছে না। আগের দিন থেকেই এখানকার অ্যারোহিড স্টেডিয়ামের আকাশের দখল নিয়ে ফেলেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক বাহিনী।

শহরটা ঘুরতে গিয়ে মনে হচ্ছে, নিউ ইয়র্কে যেমন হলুদের দাপট ছিল, তেমনই ক্যানসাস সিটির রং এখন নীল-সাদা। যত এগোচ্ছে লিয়োনেল মেসির এ বারের বিশ্বকাপে আত্মপ্রকাশের সময়, তত এই দু’টি রংয়ের আধিপত্য বাড়ছে। এখানে টাইমস স্ক্যোয়ার বা রকেফেলার সেন্টারের মতো জগদ্বিখ্যাত আকর্ষণ হয়তো নেই। নিউ ইয়র্কের মতো গমগমে, কোলাহলমুখর নয়, বরং ক্যানসাস সিটির একটা শান্ত, নিরিবিলি ধরন আছে। ট্র্যাফিক জ্যাম নেই, রাস্তাঘাট অনেক ফাঁকা। বিশেষ করে ডাউনটাউনের দিকটায়, যার কাছাকাছি অ্যারোহিড স্টেডিয়াম, যেখানে আর কয়েক ঘণ্টা বাদে কাতারে জেতা কাপ-রক্ষার অভিযানে নামবেন লিয়োনেল মেসিরা। আপাতত যদিও দেখেশুনে মনে হচ্ছে, শহরটার মেজাজ পাল্টে দিয়ে যাবেন নীল-সাদার ভক্তরা। শান্ত ক্যানসাস সিটিকে পাল্টে দিয়ে যাবেন ফুটবল কলরবের শহরে। বেসবল, বাস্কেটবলের তারকাদের মুখগুলো অস্পষ্ট করে দিয়ে মেসির শহরে পরিণত করে দিয়ে গেলেও কি অবাক হওয়ার থাকবে?

কাতারে অধরা কাপ জয়ের পরে ক্যানসাসে আবার বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলতে নামছেন মেসি। বিশ্বকাপ জিতে গিয়েছেন বলে, দিয়েগো মারাদোনার নাম তুলে আর কেউ হেয় করতে পারবে না বলে তিনি আমেরিকা বেড়াতে এসেছেন এমন ভাবার কোনও কারণ নেই। আর্জেন্টিনার সাংবাদিকদের মুখ থেকে শোনা কথা— দলের অনুশীলনে সব চেয়ে বেশি করে যিনি ভোকাল টনিক দিচ্ছেন, তাঁর নাম লিয়োনেল মেসি। ‘হাডল’-এ তাঁকেই বলার জন্য জায়গা ছেড়ে দিচ্ছেন কোচ স্কালোনি। ক্যানসাসে দু’দিন আগে মারাত্মক ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস ছিল। সকলকে বাইরে বেরোতে বারণ করা হয়েছিল। মেসিরা তাঁদের হোটেলে ‘বার্বিকিউ’ উৎসব করেন। সেখানে চমক হিসেবে গান গেয়ে যান আর্জেন্টিনার বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী লা মোনা জ়িমিনেজ়। মেসি যে ফুরফুরে মেজাজে আছেন, দলীয় একতা তৈরি করার সেই অনুষ্ঠানের কয়েকটি ভিডিয়ো থেকেই পরিষ্কার। দেখা যাচ্ছে লা মোনার গানের সঙ্গে তিনিও গলা মেলাচ্ছেন।

প্রতিপক্ষ আলজিরিয়া বলে একেবারেই হেলাফেলা করার মতো মেজাজে নেই আর্জেন্টিনা। প্রস্তুতি পর্বের ম্যাচে ভাল খেলেছে আফ্রিকার দেশ। জ়িদান-পুত্র নিয়ে হইচই হলেও তিনি একা নন। ইব্রাহিম মাজ়ার দিকেও ফুটবলবিশ্বের নজর রয়েছে। যাঁর ডাকনাম আবার ‘মারাদোনা’। বেয়ার লেভারকুসেনে খেলা মিডফিল্ডার আবার হুঙ্কার ছেড়ে রেখেছেন ‘‘তাঁরা মেসিকে হারানোর ক্ষমতা রাখেন।’’ কেউ কেউ তাই বলছেন, মঙ্গলবারের ম্যাচ (ভারতীয় সময় বুধবার ভোরে) মেসি বনাম ‘মারাদোনা’র!

হাজার-হাজার আর্জেন্টিনীয় সমর্থক গত দু’দিন ধরে শহরে ঢুকেছেন। এঁরা এমনকি ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাসেরও তোয়াক্কা করেননি। অনেকের কাছে ম্যাচের টিকিট নেই, তাতেও কুছ পরোয়া নেহি। ফ্যান জ়োনে গিয়ে খেলা দেখব তবু ঘরে বসে থাকব না। এখানকার বিখ্যাত ল্যান্ডমার্ক ইউনিয়ন স্টেশন। এক সময় আমেরিকার তৃতীয় বৃহত্তম রেল স্টেশন ছিল। যার স্থাপত্য কারুকাজ সারা পৃথিবীতে প্রশংসিত হত। এখন বিজ্ঞানের মিউজ়িয়াম, থিয়েটার-সহকারে ট্যুরিস্টদের অন্যতম প্রধান গন্তব্যস্থল। তার পাশেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতিস্থলে বিশ্বকাপের ‘ফ্যান ফেস্ট’-এর ব্যবস্থা করা হয়েছে। ম্যাচের দিন সেখানে বসে খেলা দেখার জন্য এত বেশি আর্জেন্টিনীয় সমর্থক খোঁজ নিচ্ছেন যে, কী করে সেই ভিড় সামলানো হবে তা ভেবেই নাজেহাল উদ্যোক্তারা।

বিমানবন্দর থেকে গত দু’দিন ধরেই নীল-সাদা জার্সির স্রোত নেমেছে এবং পিঠে যে দশ নম্বরের একচেটিয়া শাসন চোখে পড়বে, তাতে আর আশ্চর্যের কী! আবার অনেকের কাছে উড়ানের টিকিটের পয়সা নেই, তাঁরা সড়কপথে চলে এসেছেন। এত কষ্ট করার কারণ? জিজ্ঞেস করলে সকলের মুখে একটাই জবাব পাবেন— ‘‘লিয়োনেল মেসিকে দেখার এটাই শেষ সুযোগ। বাড়িতে বসে থেকে সেই সুযোগ নষ্ট করতে চাই না।’’ এই সব আর্জেন্টিনীয় ভক্তদের কথাবার্তা, হাবভাব দেখে মনে হবে এ বারের বিশ্বকাপ দু’ধরনের রং, আবেগ নিয়ে তাঁরা দেখতে এসেছেন। এক নম্বর হচ্ছে, কাতার জয়ের উৎসব করা। অনেকেরই সঙ্গী সেই বিখ্যাত ছবি— কাপে চুম্বন করছেন মেসি। দ্বিতীয়ত, মেসির বিদায়ী মঞ্চের সাক্ষী থাকা।

অন্তত কুড়ি হাজার নীল-সাদা সমর্থক আলজিরিয়ার বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচের জন্য ইতিমধ্যেই শহরে ঢুকে পড়েছেন। আরও অন্তত দশ হাজার ম্যাচের দিন সকালে হাজির হবেন বলে অনুমান করা হচ্ছে। সম্ভবত এ সব কারণেই নিরাপত্তার বাঁধুনি আরও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। একটি আলাদা অফিসই খুলে ফেলা হয়েছে আর্জেন্টিনীয় সমর্থকদের এই ভিড় সামলানোর জন্য। নিউ ইয়র্ক-নিউ জার্সির ব্রাজ়িল আর ক্যানসাস সিটির আর্জেন্টিনার মধ্যে বড় তফাত হচ্ছে, এখানে লিয়োনেল মেসি নামে এক মহাতারকা রয়েছেন। যাঁকে নিয়ে এমন নজিরবিহীন উন্মাদনা তৈরি হয়েছে যে, মনে হবে আমেরিকায় নয়, আর্জেন্টিনাতেই বিশ্বকাপ হচ্ছে। উত্তর নয়, দক্ষিণ আমেরিকাতেই বসে আছি। আর শহরটার নামও ক্যানসাস সিটি নয়, রোসারিয়ো। এখানকার যে বিলাসবহুল হোটেলে আর্জেন্টিনা দল রয়েছে, সেখানে হত্যে দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ে থাকছেন অনেক আর্জেন্টিনীয় ভক্তরা। সকলের গায়ে নীল-সাদা দশ নম্বর জার্সি। যদি একবার মেসির দর্শন পাওয়া যায়। কেউ কেউ কোচ স্কালোনিকে দেখতে পেয়েছেন, অন্যান্য ফুটবলারদের আসা-যাওয়া করতে দেখেছেন। কিন্তু প্রিয় তারকার দেখা মেলেনি। মেসি বেরোচ্ছেন শুধু দলের বাসে করে তাঁদের নিজস্ব ট্রেনিং সেন্টারে অনুশীলনে যাওয়ার জন্য। হোটেলের চারপাশে অবশ্য বিশাল বিশাল মেসির কাটআউট লাগানো হয়েছে। আসল মেসির দর্শন না পেয়ে সেই ছবির দিকে তাকিয়েই প্রার্থনা সেরে আসছেন অনেকআর্জেন্টিনীয় সমর্থক।

আর ট্রাম্পের সামরিক বাহিনীর হেলিকপ্টার যেমন একদিন আগে থেকেই আকাশের দখল নিয়ে ফেলেছে, ক্যানসাসে জড়ো হয়ে যাওয়া আর্জেন্টিনীয় ভক্তরাও তেমনই অপেক্ষা করতে নারাজ। এখানকার এক আর্জেন্টিনীয় মালিকের রেস্তরাঁয় গান-বাজনা, ড্রাম, পানীয় সহকারে অন্তত শ’পাঁচেক সমর্থক পার্টিতে মেতে ওঠেন। শুধু আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সি নয়, নিজেদের দেশের বিভিন্ন ক্লাবের জার্সি পরেও অনেকে উপস্থিত হয়েছিলেন। তা হলে আলজিরিয়াকে হারালে বা মেসি গোল করলে কী ধরনের বিজয়োৎসব হতে পারে, কল্পনা করুন।

বিশ্বজয়ী এই আর্জেন্টিনা দলকে তাঁদের দেশের ফুটবলভক্তরা ভালবেসে ‘স্কালোনেটা’ বলেও ডাকেন। স্কালোনির এই দলকে নিয়ে অনেক গান তৈরি হয়েছে। সেই সব গান এখন ক্যানসাস সিটির ‘থিম সং’-এ পরিণত হয়েছে। ম্যাচের দিন অ্যারোহিড স্টেডিয়ামে নিশ্চয়ই যা সর্বোচ্চ ডেসিবেলের পর্যায়ে পৌঁছবে। মেসিকে নিয়ে ভালবাসা, প্রার্থনা তো আছেই, ক্যানসাস সিটিতে আরও এক জনকে নিয়ে আর্জেন্টিনীয় ভক্তদের আবেগ চোখে পড়ার মতো। তিনি— কার্লোস পাসকুয়াল। ফুটবলবিশ্ব যাঁকে চেনে ‘টুলা’ নামে। আর্জেন্টিনার সব চেয়ে বিখ্যাত ফুটবল ভক্ত, কাতারে ‘সেরা ফ্যান’ হিসেবে ফিফা পর্যন্ত তাঁকে পুরস্কৃত করেছিল। দু’বছর আগে প্রয়াত ‘টুলা’র সেই বিখ্যাত ড্রাম নিয়ে এসেছেন তাঁর এক পরিচিত। ‘টুলা’র নাতি-নাতনিরাই নাকি ভীষণ ভাবে চেয়েছিলেন বিশ্বকাপে নিয়ে আসা হোক এই ড্রাম।

মাঠে মেসির জাদু চলবে, গ্যালারিতে রাজ করবে ঐতিহাসিক সেই বাদ্যযন্ত্র। কে জানে, টানা দ্বিতীয় বার লিয়োর হাতে কাপ উঠলে টুলা নিজেও হয়তো নেমে এলেনড্রাম বাজাতে!

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Argentina Lionel Messi

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy