E-Paper

হয়নি শিল্প, কাঁটা আলুর দামও, হিসাব মেলাতে পারবেন কে

শুধু ঘাটাল নয়, রাজনীতির ‘ব্ল্যাকবোর্ড’-এ মেদিনীপুর, কেশপুর, চন্দ্রকোনা, দাসপুর, গড়বেতা, শালবনী নিয়ে এখন চুলচেরা হিসাব চলছে দলের মধ্যে।

নীলোৎপল বিশ্বাস

শেষ আপডেট: ১০ এপ্রিল ২০২৬ ১০:২৭
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

প্রার্থী তালিকা প্রকাশের দিন সাতেক আগের ঘটনা। ভোটকুশলী সংস্থার ফোন এল ঘাটালের এক ব্লক নেতার কাছে। যাঁর সম্পর্কে তথ্য চাওয়া হল, তিনি মাত্র বছর তিনেক হল পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি হয়েছেন। জীবনপঞ্জি-সহ তাঁকে নিয়ে কলকাতার অফিসে দেখা করতে বলা হল নেতাকে। গুঞ্জন খবরে বদলে গেল সাত দিন পরেই। দেখা গেল, ওই ব্যক্তিই এ বার প্রার্থী ঘাটালে। প্রার্থী পদের দাবিদার দুই গোষ্ঠীর কারও নাম নেই। চর্চা শুরু হল— কোন অঙ্কে এই হিসাব বেরোল?

শুধু ঘাটাল নয়, রাজনীতির ‘ব্ল্যাকবোর্ড’-এ মেদিনীপুর, কেশপুর, চন্দ্রকোনা, দাসপুর, গড়বেতা, শালবনী নিয়ে এখন চুলচেরা হিসাব চলছে দলের মধ্যে। আরএলাকায় ঘুরলেই শোনা যাচ্ছে চাকরির অভাব, শিল্পের ঘোষণা সত্ত্বেও কিছু না-হওয়া, পরিযায়ী স্বর্ণশিল্পীদের ফিরিয়ে আনতে না পারা ঘিরে ক্ষোভ। রয়েছে দুর্নীতি, স্বজনপোষণের অভিযোগও। উঠে আসছে চাষযোগ্য জমি দখল করে ভেড়ি তৈরি, আলুর দাম না পাওয়া, হাসপাতালের পরিকাঠামো, রেল স্টেশনের কাছে উড়ালপুল তৈরি না হওয়ার আক্ষেপও।

২০২১ সালে মাত্র ৯৬৬ ভোটে ঘাটাল হাতছাড়া হয়েছিল শাসকদলের। সেই স্মৃতি ভোলাতে তার আগের দুই বিধানসভা ভোটে জয়ী প্রার্থীকে এ বার টিকিট দেয়নি তৃণমূল। তা নিয়ে দানা বেঁধেছে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব। এরই মধ্যে সমস্ত হিসাব উল্টেপঞ্চায়েত সমিতির সভাপতিকে প্রার্থী করেছে শাসকদল। বিজেপি অবশ্য গত বারের বিজয়ীকেই প্রার্থী রেখেছে। ঘাটালের সাংসদ দীপক অধিকারী ওরফে দেব এই প্রসঙ্গে বললেন, ‘‘গত বার হারের কারণ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। হিসাব করেই প্রার্থী দেওয়া হয়েছে।’’ আরও বলছেন, ‘‘ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান কিন্তু রাজ্যসরকার করেছে। যাঁরা কাজটা করছেন, তাঁরা না জিতলে কিন্তু রাজনীতি জিতে যাবে।’’

যদিও বড় অংশেরই অভিযোগ, পলি তোলা শুরু হওয়া ছাড়া মাস্টার প্ল্যানের তেমন কিছুই এগোয়নি। সেই সঙ্গে রয়েছে ঘাটালের সঙ্গে রেল যোগাযোগ বাস্তবায়িত না হওয়ার অস্বস্তিও। গত ভোটে জয়ী বিজেপি প্রার্থী শীতল কপাট অবশ্য বলছেন, ‘‘২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে ঘাটালে তৃণমূল লিড পেলেও পুর এলাকা ওদের হাতছাড়া হয়েছিল। এ বার গ্রাম, শহর উজাড় করে আমাদের ভোট দেবে।’’ প্রথম বার ভোটে দাঁড়ানো তৃণমূল প্রার্থী শ্যামলী সর্দার বললেন, ‘‘দল ডেকে নিয়ে প্রার্থী করেছে। আশা করি, মর্যাদা দিতে পারব।’’

খুঁটিনাটি অঙ্ক মেদিনীপুর কেন্দ্র নিয়েও। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে মেদিনীপুর শহর থেকে পাঁচ হাজারের কিছু বেশি ভোটে এগিয়ে ছিল বিজেপি। গ্রামীণ এলাকা থেকে তৃণমূল সাত হাজারের কিছু বেশি ভোট না পেলে মান রক্ষা হত না।২০২১-এর ভোটে ২৪ হাজারের কিছু বেশি ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূল প্রার্থী। কিন্তু এ বার এসআইআর-এ নাম বাদ গিয়েছে প্রায় ২৫ হাজার ভোটারের। কার ভোট কাটা গেল, অঙ্ক কষা চলছে।

তৃণমূলের দাবি, এই কেন্দ্রেই ১৫ মাস আগের উপনির্বাচনে প্রায় ৩৪ হাজার ভোটে জয়ী হয়েছে তারা। সেই ভোটে জয়ী তৃণমূল প্রার্থী সুজয় হাজরা এ বারও লড়ছেন। বললেন, ‘‘১৫ মাসে যা কাজ করেছি, জয়ের জন্য যথেষ্ট।’’ বিজেপি প্রার্থী, অঙ্কের শিক্ষক শঙ্কর গুছাইতের আবার দাবি, ‘‘সহজ অঙ্কেই বিজেপি জিতবে।’’ কিন্তু মেদিনীপুরে কান পাতলেই যে শোনা যায় শুভেন্দু অধিকারীবনাম দিলীপ ঘোষের গোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব! শঙ্করের দাবি, ‘‘অঙ্কে দলাদলি হয় না। সব পক্ষই জানেন, আমি শুধু পদ্মফুলের লোক।’’

ভরসার আসন শালবনীতে ভোট-অঙ্ক অনেকটাই তাদের পক্ষে বলে দাবি তৃণমূলের। তাদের আশা তিন বারের বিধায়ক শ্রীকান্ত মাহাতো। এই কেন্দ্রে তফসিলি জনজাতি ভোট প্রায় ২০ শতাংশ। কুর্মি ও সংখ্যালঘু ভোট যথাক্রমে ১০.৮১ এবং ৯.৯৭ শতাংশ। শালবনীতে বামেদের সমর্থনে আইএসএফ প্রার্থী করেছিল আদিবাসী সমাজের শিক্ষক পীযূষ হাঁসদাকে। পরে তাঁকে বদলে প্রার্থী করা হয়েছে আদিবাসী সমাজেরই মোহন টুডুকে। লড়াইয়ের দাবি শোনা যাচ্ছে কংগ্রেস প্রার্থীর মুখেও। শ্রীকান্ত অবশ্য বলছেন, ‘‘শালগাছে নতুন পাতা এসেছে। শালবনীতে ঘাসফুলই ফুটবে।’’ তবে বিদ্ধ করছে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের কারখানা না হওয়া, কর্মসংস্থানের অভাবের কথা। কাঁটা হয়ে ফুটছে আলুর দাম না পাওয়ার প্রসঙ্গও।

আলুর দাম না পাওয়ায় যে কেন্দ্রে সব চেয়ে বেশি শোরগোল, সেটি চন্দ্রকোনা। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে এই কেন্দ্র থেকে আট হাজার ভোটে তৃণমূল এগিয়ে থাকলেও তিনটি পুর এলাকার মধ্যে দু’টিতে ‘লিড’ ছিল বিজেপির। গত বারের জয়ী প্রার্থীকেও এ বার বদল করেছে তৃণমূল। এই কেন্দ্রে এ বার তিন দলের তিন দলুইয়ের লড়াই। কৃষিপ্রধান গড়বেতাতেও আলুর দাম নিয়ে আলোচনা। এখানকার বিজেপি প্রার্থী প্রদীপ লোধা ২০১৬ সালে ১২ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। ২০২১ সালে টিকিট না পাওয়ায় নির্দল হয়ে দাঁড়ান। শেষ মুহূর্তে বিজেপির নেতারা তাঁকে নিরস্ত করেন। এ বার তাঁকে প্রার্থী করেছে বিজেপি।

প্রদীপের সঙ্গে লড়াই গত বারের জয়ী তৃণমূলের উত্তরা সিংহের। বামেদের প্রার্থী তপন ঘোষ আবার গড়বেতায় সন্ত্রাস চালানোর অভিযোগে জেলেও গিয়েছিলেন। হিমঘর, আলুর ব্যবসায় যুক্ত তপন আর প্রদীপ— দু’পক্ষেরইএক সুর, ‘‘কোনও সমস্যা নিয়েই বিধায়কের কাছে যাওয়া যায় না।’’ উত্তরার অবশ্য দাবি, ‘‘আলুর জন্য মানুষের ক্ষোভ নেই। বরং, এসআইআর নিয়ে মানুষকে হয়রান করানোর ফল বিজেপি পাবে।’’

এ সবের মধ্যে দাসপুর দেখতে চলেছে এক সময়ের সহযোগী, এখন যুযুধান দুই প্রার্থীর লড়াই। বাম প্রার্থী রণজিৎ পাল বললেন, ‘‘বিজেপি প্রার্থী কয়েক বছর আগেও তৃণমূলে ছিলেন। তাঁর ছেড়ে দেওয়া পদে যিনি বসেছিলেন, তিনি এ বার তৃণমূল প্রার্থী। বিজেপি-তৃণমূল দুই ভাই।’’ তাঁর প্রশ্ন, স্বর্ণ হাব চালু হবে কবে? কেন স্বর্ণশিল্পীদের ফেরানোর প্রতিশ্রুতি পূরণ হল না? তৃণমূল প্রার্থী আশিস হুতাইত এবং বিজেপি প্রার্থী তপন দত্ত, কেউই অতীত নিয়ে কথা বলতে চাননি। শুধু বলেন, ‘‘ভোটের অঙ্কে জয় আমাদেরই।’’

আত্মবিশ্বাসী কেশপুরের তৃণমূল প্রার্থী শিউলি সাহাও। এই কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু সামন্ত, বামেদের গুরুপদ মণ্ডলও লড়াইয়ে থাকার দাবি করছেন। যদিও হিসাব বলছে, বাম অধ্যায়ের শেষ বা তৃণমূল সরকারের শুরু— আগে রাজ্যে পালাবদল হবে, তার পরে কেশপুর বদলাবে। গত কয়েকটি ভোটে তৃণমূলেরশক্ত ঘাঁটি কেশপুরের লক্ষাধিক ভোটের লিড দেওয়ার দস্তুর বদলেছিল ২০২১-এর বিধানসভায়। সে বার তৃণমূল জেতে ২০ হাজারের কিছু বেশি ভোটে। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে অবশ্য ঘাটালের ফল একাই তৃণমূলের পক্ষে টেনে নিয়ে গিয়েছিল কেশপুর। এ বারও সেই ধারাই কি বজায় থাকবে?

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

ghatal TMC

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy