সকালে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত থেকে পতাকা নিয়েছিলেন। তখনই আন্দাজ করা গিয়েছিল, কী হতে চলেছে। অবশেষে বিকালে অভিষেক প্রার্থিতালিকা পড়তে গিয়ে জানালেন, নন্দীগ্রাম থেকে তৃণমূলের টিকিটে লড়বেন পবিত্র কর।
তার পর থেকেই নানা গুঞ্জন রাজনৈতিক মহলে। নন্দীগ্রাম বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর ‘গড়’। গত বিধানসভা নির্বাচনে সেখানেই শুভেন্দু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করেছিলেন ১,৯৫৬ ভোটে। এ হেন ‘ওজনদার’ নন্দীগ্রামে পবিত্র কি আদৌ কোনও শক্তপোক্ত প্রার্থী? না কি শুভেন্দুকে ফাঁকা মাঠ দিয়ে দেওয়া হল? রাজনৈতিক মহলের একাংশের বক্তব্য, যে হেতু এ বার নন্দীগ্রামের পাশাপাশি শুভেন্দু ভবানীপুরেও লড়ছেন, তাঁই নন্দীগ্রামে ওজনদার কাউকে না-দিয়ে আসলে বিরোধী দলনেতাকে ‘বার্তা’ দেওয়া হয়েছে। সে বার্তার মর্মার্থ, তিনি তো নন্দীগ্রামে জিতবেনই। ফলে যাতে তিনি ভবানীপুরে অতিরিক্ত মনোনিবেশ না-করেন। আবার অন্য অনেকের মতে, নন্দীগ্রামে তুলনায় কম ওজনের প্রার্থী দিলে শুভেন্দু তো সেখানেই বরং কম মনোনিবেশ করে ভবানীপুরের ময়দানে সর্বশক্তি দিয়ে নামবেন। বস্তুত, বিজেপির একটি অংশ সেই মর্মে প্রচারও শুরু করে দিয়েছে। তাদের বক্তব্য, নন্দীগ্রাম শুভেন্দুকে ‘ওয়াকওভার’ দিয়ে দিল তৃণমূল। পরাজিত হওয়ার ‘ভয়’ থেকেই এমন সিদ্ধান্ত।
তবে তৃণমূলের অন্দরে খোঁজ নিয়ে জানা যাচ্ছে, অঙ্ক কষেই পবিত্রকে প্রার্থী করা হয়েছে নন্দীগ্রামে। কী সেই অঙ্ক? নন্দীগ্রাম ২ নম্বর ব্লকের বয়াল অঞ্চলের নেতা পবিত্র। এক সময়ে তিনি তৃণমূল করতেন। ২০২০ সালে শুভেন্দুর পিঠোপিঠি সময়েই তিনি বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁর স্ত্রী বিজেপির টিকিটে জেতা পঞ্চায়েত প্রধান। তৃণমূলের বক্তব্য, নন্দীগ্রামে যে তিন নেতার উপর শুভেন্দু ভরসা করতেন, তাঁদের মধ্যে পবিত্র অন্যতম। তৃণমূল দেখাতে চাইছে তারা শুভেন্দুর ঘর ভেঙেছে!
একটা সময়ে ‘হিন্দু সংহতি’ নামে একটি ধর্মীয় সংগঠন করতেন পবিত্র। পরবর্তীতে ‘সনাতনী সেনা’ নামেও একটি সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। গত নির্বাচন থেকেই নন্দীগ্রামে ধর্মীয় মেরুকরণ প্রকট। নন্দীগ্রাম ১ নম্বর ব্লকে যেমন সংখ্যালঘুদের আধিপত্য, তেমনই ২ নম্বর ব্লকে হিন্দু ভোটারেরাই নিয়ন্ত্রক। গত বিধানসভায় বয়াল ১ এবং ২ নম্বর অঞ্চল থেকেই সবচেয়ে বেশি ভোটে এগিয়ে ছিলেন শুভেন্দু। যেখানে জাদুকাঠির কাজ করেছিল হিন্দু ভোট। এ বার সেই বয়াল থেকেই এক জন হিন্দু মুখকে বিজেপি থেকে এনে প্রার্থী করল তৃণমূল। যাঁর পরিচিতির সঙ্গে জুড়ে রয়েছে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের অতীতও। তৃণমূলের অনেকের বক্তব্য, ১ নম্বর ব্লকের সংখ্যালঘুদের ভোট জোড়াফুল চিহ্নেই আসবে। কিন্তু ২ নম্বর ব্লকে হিন্দু ভোটে চিড় ধরাতে পারলে হিসাব অন্য রকম হয়ে যেতে পারে। গত পাঁচ বছরের নন্দীগ্রামের রাজনীতির দিকে ফিরে তাকালে দেখা যাবে, এই জনপদে হিন্দুত্বের হিল্লোল চলেছে। বিরোধী দলনেতা নিজেই অজস্র ধর্মীয় কর্মসূচিতে হাজির ছিলেন। গত জানুয়ারি মাসে রামন্দির প্রতিষ্ঠার দ্বিতীয় বর্ষ উদযাপনে গোটা নন্দীগ্রাম জুড়ে যে পরিমাণ গেরুয়া পতাকা এবং হনুমানের ছবি ঝোলানো হয়েছিল, তা চোখে পড়ার মতো।
প্রসঙ্গত, নন্দীগ্রামে দাঁড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী তথা একদা বিজেপিতে চলে গিয়ে আবার তৃণমূলে ফেরত-আসা রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়কে। কিন্তু তিনি বলেছিলেন, তাঁর পুরোন কেন্দ্র ডোমজুড় থেকেই লড়তে চান। মঙ্গলবার প্রকাশিত প্রার্থিতালিকা বলছে, রাজীব ডোমজুড়ে টিকিট পাননি। তাঁকে পাঠানো হয়েছে পশ্চিম মেদিনীপুরের ডেবরায়। যেখানকার বিধায়ক ছিলেন প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীর। তাঁকে পাঠানো হয়েছে মুর্শিদাবাদের ডোমকলে। তৃণমূলের খাতায় ডেবরা ‘ইতিবাচক’ আসন হিসাবেই চিহ্নিত। রাজীব গত লোকসভা ভোটে তমলুকে সাংগঠনিক দায়িত্বে ছিলেন। নন্দীগ্রাম তমুলেক লোকসভার অন্তর্গত। তাই তাঁকে নন্দীরগ্রামে লড়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। রাজীব অবশ্য প্রথম থেকেই নন্দীর্গামে লড়ার বিষয়ে তাঁর অনিচ্ছার কথা জানিয়ে এসেছেন।
প্রসঙ্গত, নন্দীগ্রামে তৃণমূলের গোষ্ঠীকোন্দল সর্বজনবিদিত। সেখানে দলের মধ্য থেকে কাউকে প্রার্থী করা হলে অন্তর্ঘাতের সম্ভাবনা ছিল। ফলে হলদি নদীর তীরে যে তৃণমূল তাদের স্থানীয় কোনও নেতাকে প্রার্থী করবে না, তা এক প্রকার স্পষ্টই ছিল। জল্পনা ছিল, বাইরে থেকে কাউকে নিয়ে গিয়ে প্রার্থী করা হতে পারে। সে কারণেই প্রাথমিক ভাবে বেশ কয়েক মাস আগে রাজীবকে এ ব্যাপারে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তিনি রাজি না হওয়ায় খুঁজে খুঁজে পবিত্রকে বার করেছে তৃণমূল। এ ব্যাপারে বড় ভূমিকা নিয়েছে সরকার এবং দলের পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাক। প্রার্থিপদ ঘোষণা হওয়ার পরেই নন্দীগ্রামে প্রচারে বেরিয়ে পড়েছেন পবিত্র। তৃণমূলের তমলুক সাংগঠনিক জেলা সভাপতি সুজিত রায়ের সঙ্গে চষে বেড়াচ্ছেন নন্দীগ্রামের বিভিন্ন এলাকা। তাঁরও দাবি, এ বার নন্দীগ্রামে ভিন্ন ছবি দেখা যেতে চলেছে। কিন্তু সে দাবি কতটা বাস্তবে প্রতিফলিত হয়, তা স্পষ্ট হবে ৪ মে।