হঠাৎ করে ভারতের কোনও পড়শি রাষ্ট্রের পালাবদল-পরবর্তী ছবি মনে পড়তে পারে। অথবা, কোনও গ্রামীণ খাপ পঞ্চায়েতের বিচারশালার নিদান! পশ্চিমবঙ্গের সদ্য প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর আদলে সাদা শাড়ি পরা এক জনকে কোমরে দড়ি বেঁধে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। প্রবল উল্লাসে পিছন থেকে তাঁকে দমাদ্দম লাথি কষাচ্ছে কয়েক জন। নেটরাজ্যের এই ভিডিয়ো সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
আর একটি দৃশ্যের জন্ম আবার তৃণমূলের ‘যুবরাজ’ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রাসাদোপম বাড়ির সামনে। দক্ষিণ কলকাতায় তৃণমূলের অবিসংবাদিত গড়ে পথ-নাট্যের ধাঁচে অভিষেকের বিচারের ‘গণ-আদালত’ বসেছে। মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে বাংলাদেশে পাঠানোর রায় শুনে অভিষেকের মুখোশ আঁটা যুবক লুটিয়ে পড়ে কাঁদছেন। ‘ও পিসি, পিসি’ ডাকতে ডাকতে বাঁচার জন্য ‘জয় শ্রী রাম’ বলে ফেলছেন। নিরুত্তাপ ভাবে সে দিকে তাকিয়ে কয়েক জন পুলিশকর্মী।
তাসের ঘরের মতো তৃণমূলী শাসন অতীত হওয়ার পরে জনরোষের এমন আশ্চর্য সব ছবি দেখা যাচ্ছে। এতে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বা সিপিএমের তরুণ প্রার্থীদের নিয়ে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কদর্য মন্তব্য বা মমতাকে নিয়ে প্রয়াত অনিল বসুর কুকথার তোড়ও অনেকের মনে পড়ছে। এই ভোটের আগেও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে এক্স হ্যান্ডলে উত্তরপ্রদেশের কোনও একটি অ্যাকাউন্টে কদর্য মিম দেখা গিয়েছিল। তাতে নির্বাচন কমিশন বা কোনও রাজ্যের প্রশাসন পদক্ষেপ করেছে বলে জানা যায়নি। এ বার ভোটের ফলের পরেও কদর্যতার ধারাবাহিকতা অটুট। খোদ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর জেলার তৃণমূল কর্মী মহিলাকে নিয়ে কদর্যতম ভাষায় গেরুয়া আবির মাখা রাজনৈতিক সমর্থকদের ধর্ষকামী ভিডিয়োও দেখা গিয়েছে।
রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের পূর্ব ক্ষেত্রের সহ-প্রচার প্রমুখ জিষ্ণু বসু অবশ্য দ্ব্যর্থহীন ভাবে এ প্রবণতার নিন্দা করছেন। তাঁর কথায়, ‘‘রাজনীতির লড়াইয়ে ভোটে হার-জিত হয়েছে। মধ্যযুগের কোনও একটি জাতি অন্য জাতিকে পদানত তো করেনি। এমনটা হওয়া উচিত নয়।’’ কিন্তু সেই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতির এই অধঃপাতের জন্য এক শ্রেণির সাংস্কৃতিক বুদ্ধিজীবী বা বামমনস্ক প্রচারমাধ্যমের দায়ও জিষ্ণু মনে করাচ্ছেন। তাঁর কথায়, ‘‘২০২১-এর বিধানসভা ভোটের পরের হিংসায় ৬২ জন মারা গিয়েছিলেন। ক’জন প্রতিবাদ করেছিলেন? এ সংস্কৃতি তো বিজেপি আমদানি করেনি।’’ অর্থনীতির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা তথা নারী অধিকার রক্ষা কর্মী শাশ্বতী ঘোষও এই ধরনের ভিডিয়োর নারী বিদ্বেষ বা ক্ষেত্র বিশেষে জাতি বিদ্বেষী কিছু প্রবণতার নিন্দায় মুখর। তবে তিনিও বলছেন, ‘‘এমন ভিডিয়োর চরম নিন্দা করেও অপ্রত্যাশিত বলতে পারছি না।’’ অতীতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে ঠাট্টার মিমে পুলিশি ধরপাকড়ও তিনি মনে করাচ্ছেন। শাশ্বতীর মতে, ‘‘পুলিশের বা এখনকার শাসকদলের সাইবার সেলের এ বিষয়টি দেখা উচিত।’’
এই ধরনের ভিডিয়োর নিন্দা করেও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক তথা বিজেপির মিডিয়া সেলের নেতা বিমলশঙ্কর নন্দ বলছেন, ‘‘এ সবই জনরোষের নমুনা। হয়তো তৃণমূলের মার্কামারা তোলাবাজ, নেতারা কেউ কেউ আইনের আওতায় এলেই এ সব কমে যাবে।’’ জিষ্ণুরও বিশ্বাস, ‘‘সবে তিন দিনের সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। কেউ আইন হাতে তুলে নেবে না। আইনের শাসনই কার্যকর হবে।’’
অর্থনীতির প্রবীণ অধ্যাপক সৌরীন ভট্টাচার্য মনে করেন, ‘‘এখনও বলব, প্রতিবেশী কোনও রাষ্ট্রের তুলনায় ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ভোটে ক্ষমতা হস্তান্তর পর্ব অনেক শান্তিপূর্ণ। তবে এই দৃশ্যমানতার যুগে এমন ভিডিয়োর অভিঘাত বেশ ভীতিপ্রদ ঠেকে।’’
ভোটে ইন্দিরা গান্ধীর বা বাম সরকারের পতনের পরেও উল্লাসের নানা বাড়াবাড়ি দেখা গিয়েছিল। এ বার মমতার বিদায়ে সেই প্রবণতাই কি কয়েক ধাপ এগিয়ে গা-সওয়া হয়ে ওঠার উপক্রম?
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)