E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: সৌন্দর্যের সুস্থতা

সরকারি গ্রন্থাগারগুলির অবস্থাও তথৈবচ। নিয়োগ না হওয়ায় বহু পুরনো ও অমূল্য গ্রন্থ নষ্ট হচ্ছে। কোনও কোনও গ্রন্থাগার সপ্তাহে মাত্র দু’-তিন দিন পাঠকদের জন্য খোলা থাকে।

শেষ আপডেট: ১২ মে ২০২৬ ০৫:২৩

স্বাতী ভট্টাচার্যের লেখা ‘অসুন্দরের অত্যাচার’ (৩-৪) পাঠ করে ছোটবেলার একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল। তখন আমার বয়স দশ-বারো। এক দিন স্কুলে ইংরেজির স্যর অনুপস্থিত থাকায় আমরা ক্লাসে খুব হইচই করছিলাম। সেই সময় বাংলার স্যর এসে বললেন, এই পিরিয়ডটিতে ছবি আঁকার ক্লাস হবে। স্যর বললেন, “তোমরা ছবি আঁকবে। কোনও নির্দিষ্ট বিষয় নেই, যে যার মনের মতো আঁকো।” আমি একটি আমের ছবি এঁকে নীচে লিখেছিলাম— ‘আম’।

কলকাতা ও মফস্‌সলের নানা সৌন্দর্যায়ন দেখে বার বার সেই ঘটনার কথা মনে পড়েছে। যাঁরা এই সব কাজের উদ্যোগ করেছিলেন, তাঁরা কি কখনও মূল স্থাপত্য বা পরিবেশের সঙ্গে সেই সাজসজ্জার সামঞ্জস্য মিলিয়ে দেখেছিলেন? আমাদের নিজস্ব লোকশিল্পের কত ঐতিহ্য রয়েছে— ঢোকরা, মুখোশ, কাঠের পুতুল। সেই সব শিল্পকেই তো সুন্দর ভাবে শহর সাজানোর কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। কষ্ট লাগে যখন দেখি, পুজো মিটে গেলে প্রতিমার স্থান হয় রাস্তার ধারে। দিনের পর দিন রোদ, ঝড়, বৃষ্টিতে পড়ে থেকে সেই প্রতিমাগুলি যেন অবহেলার প্রতীক হয়ে ওঠে। এ জন্যই কি আমরা প্রতিমাপুজো করি?

সরকারি গ্রন্থাগারগুলির অবস্থাও তথৈবচ। নিয়োগ না হওয়ায় বহু পুরনো ও অমূল্য গ্রন্থ নষ্ট হচ্ছে। কোনও কোনও গ্রন্থাগার সপ্তাহে মাত্র দু’-তিন দিন পাঠকদের জন্য খোলা থাকে। অথচ শহরের প্রকৃত সৌন্দর্যের অন্যতম নিদর্শন হতে পারত এই গ্রন্থাগার বা সংগ্রহশালাগুলি। একই ভাবে জলাশয় ও সবুজ গাছপালাও হতে পারত সৌন্দর্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু সমীক্ষা বলছে, শহরের নানা এলাকায় জলাশয় বুজিয়ে বহুতল তৈরি হয়েছে। আবার সবুজায়নের নামে যত গাছ লাগানো হয়েছে, তার চেয়ে বেশি গাছ কাটা পড়েছে শহরের বুকে। নবগঠিত প্রশাসনের কাছে একান্ত অনুরোধ, শহরকে পরিকল্পনামাফিক সাজানোর চেষ্টা হোক। সৌন্দর্য যেন কেবল বাহুল্য বা প্রদর্শনী না হয়ে, শহরের নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত এক সুস্থ ভাবনার প্রকাশ হয়ে ওঠে।

তমাল মুখোপাধ্যায়, ডানকুনি, হুগলি

নৈতিক পথ

বহু দিন ধরেই দেখা যাচ্ছে, দেশের নানা রাজ্যে নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর জয়ী বিধায়ক, সাংসদ, পুরপিতা বা অন্য নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের শাসক দল নিজেদের দলে টেনে নিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই আবার বিরোধী দলও একই কাজ করছে বলে দেখা গিয়েছে। মানবিকতা, সত্য ও নৈতিকতার বিচারে তা অবশ্যই নিন্দনীয়। কারণ, নির্বাচনের সময় এক জন প্রার্থী শুধু ব্যক্তি হিসাবে নয়, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতীক, আদর্শ ও প্রতিশ্রুতি নিয়েই ভোটে অংশগ্রহণ করেন। ভোটাররাও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই দল ও তার নীতির উপর আস্থা রেখেই ভোট দেন।

কোনও জনপ্রতিনিধি যদি দল পরিবর্তন করতে চান, তা হলে প্রথমেই তাঁর নির্বাচিত পদ থেকে পদত্যাগ করা উচিত। তার পরে নতুন দলে যোগ দিয়ে সেই দলের প্রার্থী হিসাবে পুনর্নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা প্রয়োজন। সেই পুনর্নির্বাচনে জয়ী হলে বোঝা যাবে, ভোটাররা ব্যক্তি হিসাবেই আসলে তাঁকে সমর্থন করেছেন। আর যদি তিনি পরাজিত হন, তা হলে স্পষ্ট হবে যে আগের নির্বাচনে ভোটাররা মূলত তাঁর দলকেই সমর্থন করেছিলেন।

এ ধরনের নিয়ম চালু হলে দলবদলের প্রবণতা অনেকটাই কমবে এবং গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের আস্থাও বাড়তে পারে।

পঙ্কজ সেনগুপ্ত, কোন্নগর, হুগলি

ভূমিপুত্র

‘অভিনব’ (কলকাতার কড়চা, ১১-৪) শীর্ষক সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদনটি পড়ে জানা গেল, ২০২৩ সালে যামিনী রায়ের কলকাতার বাড়িটিকে পূর্ণাঙ্গ সংগ্রহশালা হিসাবে গড়ে তোলার কাজ শুরু করেছে দিল্লির একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তাঁর জন্মভূমি বাঁকুড়া জেলার বেলিয়াতোড়ে, তাঁর জন্মভিটে ও বসতভিটেকে ঘিরে আজও তেমন কোনও সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগ চোখে পড়ে না। অথচ বিখ্যাত গান ‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই...’ শোনেননি এমন সংস্কৃতিমনস্ক বাঙালি বোধ হয় নেই। সেই গানেই মান্না দে শোনান— “একটা টেবিলে সেই তিন-চার ঘণ্টা চারমিনার ঠোঁটে জ্বলত/ কখনো বিষ্ণু দে কখনো যামিনী রায় এই নিয়ে তর্কটা চলত।” বেলিয়াতোড়বাসী হিসাবে শুনলে আজও বুক গর্বে ভরে যায়।

শুনেছি, দুর্গাপুজো হোক বা কালীপুজো, সারা দিন নাওয়া-খাওয়া ভুলে যামিনী রায় বসে থাকতেন বেলিয়াতোড়ের পোটোপাড়ায়। বাড়ির দেওয়ালে আঁকিবুকি কাটতে কাটতেই বড় হয়ে উঠেছিলেন চিত্রকলার সেই মহান জাদুকর। সেখান থেকেই তাঁর শিল্পশিক্ষার শুরু। পরে এক সময় পাশ্চাত্য শিল্পরীতির প্রতি আগ্রহ হারাতে থাকেন তিনি। যেন পরসংস্কৃতির অনুকরণে হাঁপিয়ে উঠেছিলেন। তাই বাংলার লোকশিল্প, বিশেষত প্রান্তিক মানুষের শিল্পভাবনাই তাঁকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছিল। বাংলার কালীঘাটের পটশিল্পকে তিনি বিশ্বদরবারে পৌঁছে দেন। নিজে পটুয়া না হয়েও নিজেকে ‘পটুয়া’ পরিচয় দিতেই বেশি ভালবাসতেন। পটশিল্পকে এক আন্তর্জাতিক মর্যাদার উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি।

রামায়ণ, মহাভারত, রাধাকৃষ্ণের প্রেমকাহিনি— এই সবই ছিল তাঁর ছবির প্রধান উপজীব্য। তাঁর ছবিতে ব্যবহৃত হয়েছে দেশজ উপাদান— নানা রঙের মাটি, গাছগাছালি ও লতাপাতার রস থেকে তৈরি রং। সাধারণ মানুষের জন্য তিনি অসংখ্য ছবি এঁকেছেন। তাঁর ছবির অন্যতম বৈশিষ্ট্য সেই বিখ্যাত পটলচেরা চোখ— মানুষ, দেবদেবী কিংবা বিড়াল, সর্বত্রই যার উপস্থিতি। শোনা যায়, বহু বার বিদেশ থেকে আমন্ত্রণ এলেও তিনি কখনও বিদেশে যাননি। তাঁর কথায়, “আমরা গরিব দেশের মানুষ, এত পয়সা খরচ করে ওদের দেশে যাব কেন? ওদের অনেক পয়সা, ওরা এসে আমাদেরটা দেখে যাক।” প্রশ্ন জাগে, যে শিল্পী বাংলার লোকশিল্পকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন, তাঁর নিজের জন্মভিটেটিই কি আরও যত্ন ও মর্যাদার দাবিদার নয়?

বিপদতারণ ধীবর, বেলিয়াতোড়, বাঁকুড়া

একটু হাসুন

মে মাসের প্রথম রবিবার ‘বিশ্ব হাসি দিবস’ পালন করা হল। হাসি শরীর ও মনের জন্য এক প্রাকৃতিক ওষুধ। আজ বিশ্বের বহু দেশে মানুষ পার্কে, ক্লাবে, কর্মক্ষেত্রে বা খোলা জায়গায় একত্রিত হয়ে ‘লাফটার সেশন’-এ যোগ দেন, যেখানে কোনও নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই হাসার চেষ্টা করা হয়। আশ্চর্যের বিষয়, কিছু ক্ষণের মধ্যেই সেই কৃত্রিম হাসি সত্যিকারের হাসিতে পরিণত হয়।

উদ্বেগ, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা, পারিবারিক দায়িত্ব, তার সঙ্গে মোবাইল ও সমাজমাধ্যমের নিরন্তর উপস্থিতি। বাইরে থেকে সব কিছু স্বাভাবিক দেখালেও ভিতরে ভিতরে অনেক মানুষই ক্লান্ত, নিঃসঙ্গ ও অবসন্ন। এই পরিস্থিতিতে হাসি মানসিক চাপ, উদ্বেগ এবং হালকা অবসাদ কমাতে সাহায্য করে। মানুষকে মানুষের কাছাকাছি আনে। ছোট্ট হাসি, হালকা মজা বা বন্ধু-সহকর্মীদের সঙ্গে কয়েকটি আনন্দের মুহূর্ত সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে তোলে। আজ যখন মানুষ ক্রমশ একা হয়ে পড়ছে, তখন এই ছোট মানবিক সংযোগগুলির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।

তবে কাউকে ছোট করে, অপমান করে বা কষ্ট দিয়ে যে হাসি, তা কখনওই প্রকৃত হাসি নয়। সত্যিকারের হাসি তখনই, যখন সেই আনন্দে সবাই যোগ দিতে পারে এবং কেউ আঘাত পায় না। ‘বিশ্ব হাসি দিবস’ আমাদের খুব সহজ অথচ গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা দেয়— জীবন সব সময় সহজ হবে না, সমস্যা থাকবেই, কিন্তু তার মাঝেও হাসতে শেখা দরকার।

রামকৃষ্ণ দত্ত, রায়না, পূর্ব বর্ধমান

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

statues Urban Culture Sculpture

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy