E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: বেঁধে বেঁধে থাকি

বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্র-পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের কলমে আলোচ্য সাবধানবাণীটি উচ্চারিত হয়েছিল। আজও তা সমান প্রাসঙ্গিক। সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প বিভিন্ন সময়ে বাংলা তথা ভারতের আকাশ-বাতাস আচ্ছন্ন করে রাখলেও ভারতের আদর্শ বরাবরই মৈত্রীর আদর্শ— প্রেম, প্রীতি ও শান্তির আদর্শ।

শেষ আপডেট: ১০ মে ২০২৬ ০৭:৪৩

‘এটুকু তো বলতে পারি’ (১২-৪) শীর্ষক প্রবন্ধে শিশির রায় হয়তো কবি শঙ্খ ঘোষের এই দু’টি লাইনই বলতে চেয়েছেন— “আয় আরো হাতে হাত রেখে/ আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি”। নববর্ষের প্রাক্কালে সাম্প্রদায়িকতার বিষ থেকে ‘প্ররোচিত, বিভ্রান্ত এবং বিদ্বিষ্ট’ বাঙালিকে মুক্ত হওয়ার জন্য প্রবন্ধকার যে আহ্বান করছেন তা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নববর্ষে’ কবিতার সুপরিচিত পঙ্‌ক্তিগুলিকেই স্মরণ করে— “ক্ষমা করো আজিকার মতো/ পুরাতন বরষের সাথে/ পুরাতন অপরাধ যত।”

বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্র-পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের কলমে আলোচ্য সাবধানবাণীটি উচ্চারিত হয়েছিল। আজও তা সমান প্রাসঙ্গিক। সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প বিভিন্ন সময়ে বাংলা তথা ভারতের আকাশ-বাতাস আচ্ছন্ন করে রাখলেও ভারতের আদর্শ বরাবরই মৈত্রীর আদর্শ— প্রেম, প্রীতি ও শান্তির আদর্শ। ভারত বহুর মধ্যে এক-কে খুঁজে পাওয়ার সাধনাতেই নিমগ্ন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু থেকে শুরু করে রামকৃষ্ণ পরমহংস, সারদা দেবী, স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর— এঁদের প্রত্যেকেরই ব্রত ছিল বৃহত্তর মানবধর্মের জয়গান গাওয়া, প্রেম-মৈত্রী-ঐক্যের ধ্বজা উচ্চে তুলে ধরা। সেই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হয়ে এই দায়িত্ব স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের উপর বর্তায়— এই বঙ্গভূমি কিংবা আমাদের এই দেশ যাতে কখনও বিভেদধর্মী ‘সাম্প্রদায়িকতা’র চাষের উপযুক্ত না হয়ে ওঠে, সেই লক্ষ্যে সচেষ্ট থাকা।

শেষ করার আগে একটাই কথা। সঙ্কটকাল উপস্থিত হলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যজিৎ রায়ের মতো কবি, শিল্পী বা সমাজের বরেণ্যদেরই অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করে সমাজকে সতর্ক করতে হবে এবং বিপদ থেকে তাকে মুক্তি দিতে হবে। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ আর্নল্ড টয়েনবি এই মানুষগুলোকেই হয়তো বলেছিলেন ‘ক্রিয়েটিভ মাইনরিটি’ অর্থাৎ ‘সৃজনশীল সংখ্যালঘু’। বিপদের মুখে এই গোষ্ঠীর মানুষরাই এগিয়ে আসেন, কিংবা তাঁদেরই এগিয়ে আসা উচিত।

গৌতম নারায়ণ দেব, কলকাতা-৭৪

গরলধারা

শিশির রায়ের ‘এটুকু তো বলতে পারি’ প্রবন্ধেই বিধৃত, সাম্প্রদায়িকতার বীজ বহুকাল আগে থেকেই এ বঙ্গে প্রোথিত। বর্তমানে ইন্টারনেট, সমাজমাধ্যমের দৌলতে সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ও বিদ্বেষের ভাষ্য যেন আরও বেশি করে চার পাশে ছড়িয়ে পড়ছে।

রাজনীতি এখন বাঙালির সমাজ ও জীবনে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছে। পথচলতি ট্রেনে, বাসে, অটোয় সহযাত্রীদের সঙ্গে কথাবার্তা, কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীদের আলোচনায় সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের গরল উপচে উঠছে। এ বিষয়ে আমার একটি সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা উল্লেখ করি। স্কুলে যাওয়ার পথে এক অটোচালক রাজনীতির প্রসঙ্গে অবলীলায় ভিন্নধর্মী একটি সম্প্রদায়ের মানুষদের সম্পর্কে নানা কুকথা, বিদ্বেষপূর্ণ উক্তি অন্য যাত্রীদের সঙ্গে বিনিময় করছিলেন। চালকের পাশে বসে থাকা আমি বলে ফেললাম, “আচ্ছা, আমি তো ওই ধর্মের মানুষ। আমাকে কি তা হলে অটো থেকে নামিয়ে দেবেন?” সবাই কেমন বিস্মিত হয়ে চুপ করে গেল। আমি আমার গন্তব্যস্থলে নেমে পড়লাম। পরে ভাবছিলাম, তা হলে কি রুটি-রোজগারের কথা ভেবে মনের ক্লেদকে জোর করে হজম করে নেওয়া হচ্ছে? আর বাকি সময় সাম্প্রদায়িকতার দাঁতকপাটি ঠেলে বেরিয়ে আসছে?

স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, “সম্প্রদায় থাকুক, সাম্প্রদায়িকতা দূর হোক।” এত বছর পরেও তা হল কই!

অরুণ মালাকার, কলকাতা-১০৩

প্রতিরোধের পথ

শিশির রায় তাঁর ‘এটুকু তো বলতে পারি’ প্রবন্ধে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সমাজের প্রতিরোধশক্তির কথা বলেছেন। এই মুহূর্তে সমাজে যে প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুতর তা হল, একটি ঘোষিত গণতান্ত্রিক সর্বজনীন রাষ্ট্র কেন সাম্প্রদায়িক হবে? গণতান্ত্রিক হতে তার অসুবিধা কোথায়? বৌদ্ধ, হিন্দু, মুসলিম প্রভৃতি বিশেষ ধর্মীয় পরিচয়ে পরিচালিত সামন্ততান্ত্রিক রাষ্ট্রের সামাজিক বিকাশের পথেই তো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উদ্ভব।

গণতন্ত্রে ধর্মীয় পরিচয়কে রাষ্ট্রীয় পরিচয় থেকে পৃথক করে ব্যক্তিগত পরিচয়ের স্তরে নিয়ে আসা হয়েছে। তবে আবার কেন ইতিহাসের চাকাকে পিছনে ঘোরানো? রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ধারণার মধ্যে কোথাও কি কিছু অসম্পূর্ণতা থেকে গিয়েছে? রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ধারণা ও সমাজের গণতান্ত্রিক ধারণা— যা মূলত যুক্তি ও তর্কের উপর নির্ভরশীল— তাদের মধ্যে কোথাও কি ফারাক রয়ে গিয়েছে? রাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া সাম্প্রদায়িক ভাবনাকে অতীতের মতো সহজে সমাজ আজ আর তার আপন শক্তিতে প্রতিরোধ করতে পারছে না।

বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা চার পাশে ঘৃণা ও বিদ্বেষের বন্যা বইতে দেখছি। কারণ, মানুষকে বোঝানো হচ্ছে— শাসনতান্ত্রিক ব্যর্থতা নয়, তার দুরবস্থার জন্য দায়ী এক ‘অপর’ শক্তি। মানুষের সামনে শত্রু হিসাবে এক কাল্পনিক ‘অপর’কে দাঁড় করানো হচ্ছে। এই সব কিছুর পরেও বর্তমান সঙ্কটের এ একমাত্র দিক নয়। রয়েছে সামাজিক শক্তির জোর, সত্যের জোর। মিথ্যা কখনও স্থায়ী হয় না। সাময়িক ভাবে তা সমাজের অনেকখানি ক্ষতি করতে পারে, যা আমরা আজ চার পাশের বদলে যাওয়া মানুষদের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি। তবু কোনও ভয়ঙ্কর অপশক্তিও সমাজের এই অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধশক্তিকে কখনও সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিতে পারে না। তা হলে সমাজ ও সভ্যতা অতীতের মারাত্মক সব আক্রমণ অতিক্রম করে আজকের অবস্থানে পৌঁছতে পারত না।

আজ সমাজের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন— এই পরিকল্পিত বিভেদ ও বিদ্বেষের বিরুদ্ধে নাগরিক সমাজের সক্রিয়তা। সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক পরিচয়ের অস্বস্তি কাটিয়ে বুক চিতিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো। সমাজের বনিয়াদি স্তর পর্যন্ত মানুষের কাছে এর ক্ষতিকর দিকগুলি তুলে ধরা জরুরি। খেটে খাওয়া মানুষটিকেও বোঝাতে হবে, বিদ্বেষ শেষ পর্যন্ত তারই সর্বাধিক ক্ষতি করে। শিক্ষিত মানুষের মধ্যেও শিক্ষা ও যুক্তির সম্পর্কটিকে দৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে পূর্বজদের রেখে যাওয়া গভীর শিক্ষাগুলিরও মননশীল চর্চা দরকার। যা আসলে সমাজের গণতন্ত্রীকরণের অসম্পূর্ণতাকে পূর্ণতা দেওয়ার প্রচেষ্টা, এবং একই সঙ্গে সমাজের প্রতিরোধক্ষমতাকে শক্তিশালী করে তোলার পথ।

সমুদ্র গুপ্ত, কলকাতা-৬

অতীতের আয়না

শিশির রায়ের ‘সাম্প্রদায়িকতার পথ থেকে বাঙালিকে ফেরানোর ডাক কোথায়’ প্রবন্ধে বাঙালি শিল্পী-সাহিত্যিক তথা বুদ্ধিজীবীদের সাম্প্রদায়িক বিভেদ এবং যুক্তিহীন ধর্মীয় আবেগের বিরুদ্ধে বাঙালি ঐতিহ্যের অভিপ্রেত উচ্চকিত কণ্ঠস্বরের অভাব ও সামাজিক দায়বদ্ধতার অক্ষমতাজনিত আপাত-নীরবতার প্রসঙ্গটি সাম্প্রতিক এই বাঙালিত্বের দুর্দিনে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

এ-পার বাংলায় সত্তরের দশকের গোড়া থেকেই দিল্লির তরফে হিন্দি ভাষা জোরালো ভাবে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। বাংলার তৎকালীন বহু বুদ্ধিজীবীই কেন্দ্রীয় সরকারের হিন্দিবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে ভাল চোখে দেখেননি। বাংলার সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষাপণ্ডিত সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ছিলেন এই রকমই এক আপাদমস্তক বাঙালি মনীষী। বাংলায় হিন্দি ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার নানা সরকারি প্রয়াসের বিরুদ্ধে তাঁর তীব্র ক্ষোভের সাক্ষী হয়ে থাকার একটি ঘটনা আজও আমি ভুলতে পারিনি।

তখন আমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের স্নাতকোত্তর ছাত্র। কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকায় আমার বাসার কাছাকাছি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামি ইতিহাসের অধ্যাপক ওসমান গনি এক দিন আমাকে সঙ্গে করে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের বালিগঞ্জের ‘সুধর্মা’ বাড়িতে নিয়ে যান। দোতলায় ওঠার সিঁড়ির মুখে, লনের ডান পাশে রাখা ছিল তখনকার টেলিফোন। ইন্দিরা গান্ধী সরকারের বাংলায় হিন্দি ভাষা নানা ভাবে চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে কোনও পরিচিতজনের সঙ্গে টেলিফোনে তাঁর ক্ষোভের গর্জন আজও আমার কানে বাজে।

সাজেদুল হক, কলকাতা-১৪৪

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Rabindranath Tagore Satyajit Ray Communalism Communal harmony

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy