E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: হিংসা নয়, সৌহার্দ

ফলাফল ঘোষণার পর কোনও দল বা জোটের জয়লাভ এবং সরকার গঠন একটি প্রত্যাশিত পরিণতি। জয়ের আনন্দ উদ্‌যাপনও মানবিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে স্বাভাবিক।

শেষ আপডেট: ০৮ মে ২০২৬ ০৭:৪২

গণতন্ত্রের মূল সৌন্দর্য তার অংশগ্রহণমূলক চরিত্রে। এই ব্যবস্থায় জনগণই সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী, আর সেই ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটে নির্বাচনের মাধ্যমে। তাই নির্বাচনকে গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠ উৎসব বলা হয়— একটি এমন উৎসব যেখানে মত, পথ ও আদর্শের প্রতিযোগিতা হয়, কিন্তু লক্ষ্য থাকে জনকল্যাণ। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মসূচি নিয়ে জনগণের দরবারে হাজির হয়, মানুষ বিচার-বিবেচনা করে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে। এই প্রক্রিয়াই গণতন্ত্রকে জীবন্ত ও গতিশীল রাখে।

ফলাফল ঘোষণার পর কোনও দল বা জোটের জয়লাভ এবং সরকার গঠন একটি প্রত্যাশিত পরিণতি। জয়ের আনন্দ উদ্‌যাপনও মানবিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে স্বাভাবিক। মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটে এই জয়ে, তাই উচ্ছ্বাস, আনন্দ— সবই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু এই আনন্দ যদি হিংসা ও প্রতিহিংসা প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রকাশ পায়, তবে তা গণতন্ত্রের মূল চেতনাকেই আঘাত করে।

এ বছর পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে দীর্ঘ ১৫ বছর পর একটি রাজনৈতিক দলের পরাজয় এবং নতুন একটি দলের উত্থান এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। এই পরিবর্তন গণতন্ত্রের স্বাভাবিক নিয়মেই ঘটে— জনগণের রায়ই এখানে চূড়ান্ত। তাই এই ফলাফলকে সম্মান জানানো, মেনে নেওয়া এবং নতুন সরকারকে কাজ করার সুযোগ দেওয়াই গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার পরিচয়।

এই প্রেক্ষাপটে সকল রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকদের প্রতি বিনীত আহ্বান— বাংলার সুপ্রাচীন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে অটুট রেখে আনন্দ উদ্‌যাপন করুন। বাংলার মাটি বরাবরই সহনশীলতা, সৌহার্দ ও মানবিকতার বার্তা বহন করে এসেছে। নির্বাচনোত্তর সময়ে সেই ঐতিহ্য যেন কোনও ভাবেই কলঙ্কিত না হয়। হিংসা কখনওই সমস্যার সমাধান নয়, বরং তা নতুন করে বিভাজন সৃষ্টি করে, সামাজিক বন্ধনকে দুর্বল করে।

উৎসব হোক সবার, আনন্দ হোক সর্বজনীন। জয়-পরাজয় গণতন্ত্রের অঙ্গ, কিন্তু মানবিকতা ও সহমর্মিতা প্রদর্শন তার ভিত্তি। তাই, সকলে মিলে এমন এক পরিবেশ গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে রাজনৈতিক ভিন্নমত থাকলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা অটুট থাকে। ভবিষ্যতের উন্নয়ন ও শান্তির লক্ষ্যে এগিয়ে যাই আমরা সবাই এক সঙ্গে। নতুন সরকার গড়তে চলেছে। আগামী দিনগুলি যেন আর রক্তে রঞ্জিত না হয়। শুধু হাসি, আশা আর নতুন স্বপ্ন থাকুক প্রতিটি মুখে।

পার্থ প্রতিম মিত্র, ছোটনীলপুর, বর্ধমান

নতুন যুগ

দেওয়াল লিখন স্পষ্ট ছিল, পড়তে পারেনি তৃণমূল শাসক দলের উপরতলা। ক্ষোভ ছিল, অসন্তোষ ছিল, বিরক্তি ছিল— তবু একটা সময় পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের নাগরিকরা সয়ে নিচ্ছিলেন সব কিছু। কামদুনি, পার্ক স্ট্রিট থেকে শুরু করে তোলাবাজি, কাটমানি, খুন, ধর্ষণ, সারদা, নারদা, চাকরি চুরি, কয়লা চুরি, রেশন চুরি-র পথ ধরে আর জি কর কাণ্ডেও প্রতিবাদ যখন যেখানে উঠেছে, সবলে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। অপেক্ষায় ছিলেন পশ্চিমবঙ্গবাসী। কিন্তু একটা আশঙ্কা ছিলই, মানুষ কি নির্ভয়ে ভোট দিতে পারবেন? ইভিএম-এ বোতাম টেপার সুযোগ পাওয়া যাবে তো? নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদ, মানুষকে নিজের মতামত স্পষ্ট ভাবে জানানোর সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।

ভারতীয় জনতা পার্টি ক্ষমতায় এল। তবে, তাদের কাছে রাজ্যবাসীর খুব একটা প্রত্যাশা নেই। এই ভোট মূলত তৃণমূল-বিরোধী ভোট। এখনও পশ্চিমবঙ্গবাসীর মতামত নিলে বোঝা যাবে যে বেশ কিছু বামপন্থী নেতাকে তাঁরা বিজেপির যে কোনও রাজ্যস্তরের নেতার থেকে বেশি যোগ্য ভাবেন। তা হলে বামপন্থীরা ভোট পেলেন না কেন? কারণ, মানুষের কাছে বাম ফ্রন্ট রাজত্বের শেষ কয়েক বছরের স্মৃতি এখনও গভীর ক্ষতের মতো। কিন্তু ভরসা করার আগে ভয় ঢোকে, প্রতিবাদের ভোট ভাগ হয়ে যাবে না তো? তাই বিরোধী ভোট এককাট্টা হয়ে পড়েছে বিজেপি-তেই।

বিজেপি আসায় আরও একটা আশা— রাজ্য এবং কেন্দ্রে একই সরকার থাকলে আয়ুষ্মান ভারত-সহ অন্যান্য জনকল্যাণমুখী প্রকল্পের সুযোগ আরও বেশি করে রাজ্য পাবে। তবে প্রথম ও প্রধান দাবি থাকবে দুর্নীতিমুক্ত এক প্রশাসন। তৃণমূল সরকারের নেতাদের ঔদ্ধত্য ও স্বেচ্ছাচারিতা আকাশ ছুঁয়ে ছিল। অপরাধীদের আড়াল করা এবং দুষ্কৃতীদের প্রশাসনের অংশ করে নেওয়া হয়ে উঠেছিল তৃণমূল সরকারের রাজ্য চালানোর চাবিকাঠি। আশা, নতুন সরকার সেই পথে হাঁটবে না। রাজ্যবাসী ভয়ের এবং প্রতিশোধের রাজনীতি মোটে চায় না। রাজ্যস্তরের বিজেপি নেতাদের প্রথম কাজই হওয়া উচিত ভোট-পরবর্তী হিংসা, যা ক্রমশ বেড়েই চলেছে, তা থেকে মানুষকে সুরক্ষিত রাখা।

না হলে? আবারও ভোট হবে। আবার সিংহাসন থেকে নামিয়ে আনতে একটুও দ্বিধা করবেন না মানুষ। বাঙালির মধ্যে উদয়ন পণ্ডিত আছেন। মনে রাখতে হবে।

অনির্বাণ জানা, কৃষ্ণনগর, নদিয়া

সত্তার জাগরণ

এ বারের রাজ্য বিধানসভার ভোটে প্রতিষ্ঠান-বিরোধী হাওয়া তো ছিলই, সঙ্গে ছিল জনবিন্যাস বদলে যাওয়ার ভয়। মাফিয়ারাজের বিপদ, নিয়োগ-দুর্নীতির ভয়ঙ্করতা কিংবা আর জি কর-কাণ্ডের ভয়াবহতা— প্রতিটি বিষয়কে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর নির্বাচনী বক্তৃতায় যথাযথ ভাবে তুলে ধরেছিলেন। তিনি এ ধরনের উদ্বেগ সম্পর্কে রাজ্যবাসীকে সচেতন করেছেন এবং তাঁদের মনে আশা-ভরসা জাগাতে সক্ষমও হয়েছেন। অন্য দিকে, রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাঙালি অস্মিতা রক্ষার আবেদন ছিল শুধুই আড়ম্বরসর্বস্ব, মানুষ তাতে সায় দেয়নি। মাছভাতে তৃপ্ত বাঙালির খাদ্যাভ্যাস নিয়ে উদ্বেগ গড়ে তোলার তৃণমূলের কৌশলও মাঠে মারা গেছে।

প্রসঙ্গত, এ বারের রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে বাঙালি ভদ্রলোক শ্রেণির ভূমিকা নিয়ে দু’-একটি কথা বলা দরকার। ২০১১ সালের আগে রাজ্য রাজনীতিতে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় ছিলেন এই ভদ্রলোক শ্রেণি। নিয়ন্ত্রণ-ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের জন্য এ বারের নির্বাচনে এই মধ্যবিত্তদের সক্রিয় ভূমিকায় দেখা গিয়েছে। এমনিতেই বাঙালির মনে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে উত্তরোত্তর উদ্বেগ বাসা বাঁধছিল। যেমন, রাজ্যটা সব দিক থেকে পিছিয়ে পড়ছে, হিংসার রাজনীতি বেড়েই চলেছে। আত্মপরিচয়ের সঙ্কটও তাঁদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে। ভোটের ফল প্রকাশের পর ক্যালিফোর্নিয়া বা লন্ডনে বাঙালি সম্প্রদায়ের মধ্যে যে উচ্ছ্বাস দেখা গেছে, তাতে বোঝা যায় এ বারের লড়াইতে বাঙালি জাতিসত্তার জাগরণের এই বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে। বিশেষ বিশেষ সঙ্কটাপন্ন মুহূর্তে এ-হেন জাতিসত্তার বিষয়টি বাঙালিজীবনে অগ্রাধিকার পায়। ভোটের ফলেও তা স্পষ্ট।

শিবাশিস দত্ত, কলকাতা-৮৪

দুই আবেদন

অনেক দিন ভাল ঘুমোতে পারিনি। শুধু একটাই চিন্তা। পরের প্রজন্মকে কোথায় রেখে যাব। তাদের ভবিষ্যৎ তো চিমনির কালো ধোঁয়ার থেকেও অন্ধকার। তাদের তো চাকরি, কয়লা, চাল কিছুই চুরি করতে শেখাইনি। কিন্তু যে দিন আর জি করের চিকিৎসক-পড়ুয়ার ওই পরিণতি দেখলাম, সে দিন কান্নার থেকে রাগ বেশি হয়েছিল। বুঝেছিলাম, নিজের ও দেশের ভালর জন্য প্রত্যেকের রাজনীতি করা কতখানি দরকার। অনেকে বলছেন বিজেপি এসে রাজ্যের কী ভাল হবে। পরিবর্তন সত্যিই আসবে কি না, সময়ই তা বলবে। তবে, নতুন সরকারের কাছে দু’টি আবেদন। এক, এটা যেন দুর্নীতিগ্রস্তদের সরকার না হয়। দুই, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতিতে পশ্চিমবঙ্গ যেন আবার তার সম্মানের জায়গাটি ফিরে পায়।

মিতালি মুখোপাধ্যায়, কলকাতা-৮৪

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

West Bengal Politics West Bengal government BJP TMC

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy