E-Paper

পরিবর্তনের স্বরূপ

দু’রাজ্যের রাজনীতির চরিত্রগত ফারাকও বিস্তর। দক্ষিণ ভারতের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার পরিসর বাংলার চেয়ে আলাদা। এটি কেবল দল বা নেতার চরিত্রগত ভিন্নতা নয়— বরং ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক চেতনাগত পার্থক্য।

শ্রাবণী মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১২ মে ২০২৬ ০৪:৫৪
নেতা: উপস্থিত সমর্থকদের সঙ্গে নিজস্বী তুলছেন তামিলনাড়ুর সদ্য-নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী বিজয়। ১০ মে, চেন্নাই।

নেতা: উপস্থিত সমর্থকদের সঙ্গে নিজস্বী তুলছেন তামিলনাড়ুর সদ্য-নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী বিজয়। ১০ মে, চেন্নাই। ছবি: পিটিআই।

তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ফলাফলকে কী ভাবে ব্যাখ্যা করা উচিত? রুপোলি পর্দার তারকাদের প্রতি চিরকালীন মোহাবিষ্ট রাজ্যে আরও এক বার এক তারকার জয়? এক অকস্মাৎ সুনামি? না কি ক্রমে গড়ে ওঠা, পরিপক্ব স্থিতিশীল অর্থনীতির উপরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা একটি অদৃশ্য রাজনৈতিক ক্ষোভের প্রতিফলন? পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ফলাফলের সঙ্গে যেন একটি সাদৃশ্য আছে তামিলনাড়ুর— মানুষ নতুন বিকল্প খুঁজেছেন।

তবে, দু’রাজ্যের রাজনীতির চরিত্রগত ফারাকও বিস্তর। দক্ষিণ ভারতের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার পরিসর বাংলার চেয়ে আলাদা। এটি কেবল দল বা নেতার চরিত্রগত ভিন্নতা নয়— বরং ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক চেতনাগত পার্থক্য। পশ্চিমবঙ্গে রাজনীতি দীর্ঘ দিন ধরে শ্রেণি চিন্তার দ্বারা প্রভাবিত, দলভিত্তিক সংগঠন সে রাজনীতির মূল— অন্য দিকে, তামিলনাড়ুর রাজনীতি গড়ে উঠেছে দ্রাবিড় আদর্শকে কেন্দ্র করে। এখানে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা বেশি। কাজেই, সে রাজ্যের নির্বাচনে কেন অভিনেতা চন্দ্রশেখরন জোসেফ বিজয়ের নেতৃত্বাধীন কার্যত আনকোরা একটি দল এমন ভূমিকম্প ঘটাতে পারে— কেন রাজ্য রাজনীতিতে সুদৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠিত দুই দল দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাঝাগাম (ডিএমকে), এবং অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাঝাগাম (এআইএডিএমকে)-এর চিরাচরিত দ্বিপাক্ষিক দ্বন্দ্ব-পরিসর ভেঙে, শক্তিশালী সংগঠন ও স্থিতিশীল ভোটব্যাঙ্কের নিশ্চয়তাকে উল্লঙ্ঘন করে মাত্র দু’বছর আগে তৈরি হওয়া তামিলাগা ভেট্রি কাঝাগাম (টিভিকে) জয় ছিনিয়ে নিতে পারে— বঙ্গীয় রাজনীতির চশমায় সে কথা বোঝা মুশকিল।

প্রথম প্রশ্নটি ক্ষমতাবিরোধী মনোভাব নিয়ে। এম কে স্ট্যালিনের সরকার প্রশাসনিক ভাবে ব্যর্থ ছিল, এমন দাবি করার উপায় নেই। কিন্তু, সমস্যা ছিল অন্যত্র। স্ট্যালিনের সরকারের বিরুদ্ধে যা কাজ করেছে, তাকে রাজনৈতিক অর্থনীতির ভাষায় বলে ‘ডিমিনিশিং মার্জিনাল রিটার্ন টু ওয়েলফেয়ার পলিসিজ়’। জনকল্যাণমূলক পরিষেবা প্রদান যখন একটি স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়— অন্তত মানুষ যখন ধরে নেন যে, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল এই জাতীয় কল্যাণ প্রকল্প চালাবেই— তখন তা আর রাজনৈতিক আনুগত্য সৃষ্টি করে না। বরং, মানুষের মধ্যে প্রত্যাশা বাড়ে যে, সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে, বিশেষত কর্মসংস্থান ও সামাজিক-অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে, উন্নতির জন্য আরও অনেক বেশি ট্রান্সফর্মেটিভ বা রূপান্তর-সক্ষম পদক্ষেপ করবে। কল্যাণমূলক কর্মসূচি দিয়ে আর ভোট টানা যাচ্ছে না, এ কথাটি স্ট্যালিনের বিপক্ষে গিয়েছে।

তামিলনাড়ুর ভোটাররা, বিশেষ করে তরুণ ও শহুরে ভোটাররা, সম্ভবত ক্রমে আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী হয়ে উঠছেন। ‘সম্পদ পুনর্বণ্টন-ভিত্তিক রাজনীতি’ থেকে ‘উচ্চাকাঙ্ক্ষা-ভিত্তিক রাজনীতি’-র দিকে এই যে পরিবর্তন, তা বর্তমান ক্ষমতাসীনদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি এবং ভোটারদের প্রত্যাশার মধ্যে একটি ব্যবধান তৈরি করেছে। সামাজিক ন্যায়বিচার ও যুক্তরাষ্ট্রীয় অধিকারের উপরে তাদের চিরাচরিত গুরুত্বের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা ডিএমকে-র নির্বাচনী প্রচার হয়তো এই পরিবর্তনের গতিপ্রকৃতিকে পুরোপুরি ধরতে পারেনি। বলা চলে যে, এই নির্বাচনী ফলাফল রাজ্যের ডিএমকে সরকারের প্রতি সরাসরি প্রত্যাখ্যান নয়, বরং এই শাসনব্যবস্থার যে সীমাবদ্ধতাগুলি ক্রমে প্রকট হয়ে উঠছিল, সেগুলির প্রতি অনাস্থা। স্পষ্টতই, আর্থিক ভাবে স্থিতিশীল রাজ্যের ভোটাররা আর শুধু ‘সন্তুষ্ট’ হতে চান না, তাঁরা ‘উন্নতি’ দেখতে চান।

রাজ্যের বিরোধী পরিসরটিও এই নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। জয়ললিতার মৃত্যুর পরে এআইএডিএমকে রাজ্য রাজনীতিতে ক্রমেই নিজের শক্তি হারিয়েছে। ফলে, বিরোধী পরিসরে একটি শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, যা পূরণ করে তলপতি বিজয়ের নেতৃত্বাধীন টিভিকে। তারা কোনও নতুন আদর্শগত অবস্থানের কথা বলেনি। বরং, রাজনৈতিক অর্থনীতির ভাষায় যাকে বলা হয় ‘ভাসমান ভোটার’, অর্থাৎ প্রতিষ্ঠিত দলীয় পরিচয়ের প্রতি যাঁদের আনুগত্য শিথিল, তাঁদের দ্রুত একত্রিত করার দিকে জোর দিয়েছে, এবং সক্ষমও হয়েছে। ক্যারিশম্যাটিক আবেদন, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক জনসংযোগ এবং প্রজন্মগত পরিবর্তনের আখ্যান— এই সব কিছুর এক সমন্বিত প্রয়াসের মাধ্যমে টিভিকে রাজ্যের সরকারের প্রতি বিক্ষিপ্ত অসন্তোষকে একটি সুসংহত নির্বাচনী শক্তিতে পরিণত করেছে। আজকের সমাজমাধ্যম-নির্ভর গণসংযোগ-ব্যবস্থা এই রাজনীতির সহায়ক হয়েছে। কারণ, যত কম সময়ের মধ্যে রাজনৈতিক অসন্তোষের কথা যত বেশি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তত দ্রুত সংহত করা যায় নিজেদের পক্ষে সমর্থনকে। প্রাক্-সমাজমাধ্যমের যুগে বিজয়ের পক্ষে এত দ্রুত জনসমর্থন অর্জন করা সম্ভব হত কি না, সে প্রশ্ন উড়িয়ে দেওয়ার কোনও উপায় নেই।

এই নির্বাচনে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হ্রাস পেয়েছে। এআইএডিএমকের নেতৃত্বের ঘাটতি নির্বাচনকে একটি দ্বিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরিণত করেছিল। এমন পরিস্থিতিতে ডিএমকে-বিরোধী ভোট বিভাজিত হয়নি; ভোটাররা স্থিতাবস্থার বিরুদ্ধে একটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গ্রহণ করেছেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক অর্থনীতি একটি রূপান্তরের চৌকাঠে দাঁড়িয়ে আছে। ভাষা বা পুনর্বণ্টনের মতো যে প্রশ্নগুলি অতীতে দ্রাবিড় রাজনীতির পরিচয়ের অংশ ছিল, সেগুলি একটি নতুন বাস্তবতায় স্থানান্তরিত হয়েছে— নগরায়ণ, অনিশ্চিত চাকরির বাজার এবং একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান। এই পরিবর্তন পুরনো দলগুলিকে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক করে দেয় না বটে, কিন্তু তাদের সামনে নিশ্চিত ভাবেই নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।

পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে আরও নিবিড় ভাবে তুলনা করলে তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক গতিপথের স্বকীয়তা স্পষ্ট ভাবে ফুটে ওঠে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ২০২৬ সালের বিজয়টি ছিল ভোট-শেয়ার বা প্রাপ্ত ভোটের হারে এক দশকব্যাপী নিরবচ্ছিন্ন উত্থানেরই ধারাবাহিকতা। এটি সাংগঠনিক গভীরতা বৃদ্ধির ধ্রুপদী মডেল, যেখানে বুথ-স্তরে দলের সাংগঠনিক শক্তিবৃদ্ধি ও বিস্তার নির্বাচনী আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত হিসেবে কাজ করে। এর বিপরীতে, তামিলনাড়ুর ক্ষেত্রে একটি আকস্মিক পরিবর্তনের চিত্র দেখা যায়। সেখানে টিভিকে-র উত্থান ভোট-শেয়ারের কোনও ধীরলয়ের ক্রমবৃদ্ধির পথ ধরে ঘটেনি, তা ঘটেছে একটি নির্বাচনের পরিসরেই— ভোটারদের দ্রুত ও ব্যাপক একত্রীকরণের মাধ্যমে। পশ্চিমবঙ্গ যদি ‘সাংগঠনিক সঞ্চয়নের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক পালাবদল’-এর প্রতিনিধিত্ব করে, তবে তামিলনাড়ু প্রতিনিধিত্ব করে ‘বিরোধী শক্তির প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে সঙ্কুচিত রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস’-এর। প্রথমোক্ত প্রক্রিয়াটি ‘পাথ-ডিপেন্ডেন্ট’, বা পূর্বনির্ধারিত গতিপথের উপরে নির্ভরশীল; দ্বিতীয় প্রক্রিয়াটি নির্ভর করে সঠিক সময়, নেতৃত্বের যথাযথ বার্তা, এবং বিরোধী শিবিরের বিভাজনের মতো বিষয়গুলোর উপরে।

তা হলে, স্ট্যালিনের ব্যক্তিগত পরাজয়ের ব্যাখ্যা কী? তাঁর পরাজয়কে ব্যক্তিগত ব্যর্থতার চেয়ে বরং ব্যবস্থাগত পরিবর্তনের একটি লক্ষণ হিসাবেই দেখা বিধেয়। রাজনৈতিক অর্থনীতির তত্ত্ব বলে যে, যখন কোনও একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থায় মানুষের অসন্তোষ স্থানীয় না থেকে সামূহিক হয়ে ওঠে, তখন সেই অসন্তোষের অভিমুখে থাকা দলের কোনও নেতার ব্যক্তিগত বিশ্বাসযোগ্যতা তাঁর জয় নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়। প্রার্থী স্ট্যালিনের পরাজয়কে রাজ্যের শাসনব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং নির্বাচনী ফলাফলের মধ্যেকার এক বৃহত্তর বিচ্ছেদের প্রতীক হিসাবে দেখা প্রয়োজন।

তামিলনাড়ু এবং পশ্চিমবঙ্গ, উভয় রাজ্যেই কাজ করেছে সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ। পশ্চিমবঙ্গে যেখানে প্রধান রাজনৈতিক দল হিসাবে বিজেপির ধাপে ধাপে উত্থান ঘটেছে, তামিলনাড়ুতে তা ঘটেনি— টিভিকে-র উল্কাসম উত্থান ঘটেছে। কিন্তু, এই আপাত-অমিলের গভীরে একটি কথা রয়েছে, যা দু’রাজ্যের ক্ষেত্রেই সমান সত্য— ভোটারদের মধ্যে অস্থিরতা বাড়লেও তাকে রাজনৈতিক পালাবদলে রূপান্তরিত করতে চাই বিকল্প শক্তির জোগান। যেখানে এই ধরনের জোগান প্রাতিষ্ঠানিক, সেখানে পরিবর্তন টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা বেশি; যেখানে এই জোগান আকস্মিক, সেখানে পরিবর্তনের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ বেশি।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Tamil Nadu Assembly Elections 2026 Tamil Nadu Vijay Thalapathy TVK

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy