E-Paper

কেন্দ্রীভূত

উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি কী পড়াবে, কী ভাবে পড়াবে, কারা তা পড়াবেন, কী নিয়ে সেমিনার বা গবেষণা হবে তা নির্ধারণ একান্ত ভাবেই প্রতিষ্ঠানগুলির নিজস্ব ব্যাপার।

শেষ আপডেট: ১২ মে ২০২৬ ০৪:৪১

গত বছর ডিসেম্বরে লোকসভায় কেন্দ্রীয় সরকার উত্থাপন করেছিল ‘বিকশিত ভারত শিক্ষা অধিষ্ঠান ২০২৫’ বিল, এই মুহূর্তে নানা খুঁটিনাটি বিচার-বিবেচনা করে যার আইন হয়ে ওঠার পথটি সুগম করার চেষ্টা চলছে। কেন্দ্রীয় সরকারের যদিও গোড়া থেকেই বক্তব্য যে এই বিল তথা আইনবলে ভারতে উচ্চশিক্ষার চেহারা বদলে যাবে, সেই দাবি নিঃসংশয় নয়— কিছু বিরোধী দল ও নাগরিক গোষ্ঠী গত কয়েক মাসে এর বিরুদ্ধযুক্তিও পেশ করেছে। জাতীয় কংগ্রেস আগেই এই বিলকে বলেছিল ‘সাংবিধানিক সীমা-বহির্ভূত’, সম্প্রতি তামিলনাড়ুর শিক্ষাবিদদের একটি গোষ্ঠী সংসদীয় যৌথ কমিটির প্রধানকে চিঠি লিখে জানিয়েছেন, এই বিল পাশ হলে ভারতে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির স্বায়ত্তশাসন ও বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা খর্ব হবে।

কেন্দ্রে বিজেপি-শাসনে ভারতের নানা প্রান্তে বিশ্ববিদ্যালয়-সহ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের ছাত্রগোষ্ঠীর উপর আক্রমণের ঘটনাগুলি যদি তর্কের খাতিরেও সরিয়ে রাখা যায়, বাদ দেওয়া চলে না পাঠ্যক্রম থেকে পঠনপাঠন, উপাচার্য নিয়োগের মতো ক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপকে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি কী পড়াবে, কী ভাবে পড়াবে, কারা তা পড়াবেন, কী নিয়ে সেমিনার বা গবেষণা হবে তা নির্ধারণ একান্ত ভাবেই প্রতিষ্ঠানগুলির নিজস্ব ব্যাপার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির মাথার উপরে ইউজিসি, এআইসিটিই ও এনসিটিই-র মতো সংস্থা রয়েছে, যাদের কাজ অর্থ বরাদ্দ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়মকানুন, প্রত্যয়ন ইত্যাদির বিবেচনা ও মূল্যায়ন। অথচ কেন্দ্রের প্রস্তাবিত বিলে বলা হয়েছে বারো সদস্যের একটি সর্বোচ্চ ও কেন্দ্রীয় কমিশনের কথা, যার অধীনে নানা কাউন্সিল কোনও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ, মান নির্ধারণ ও প্রত্যয়নের কাজগুলি করবে— সমস্ত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এই কাউন্সিলগুলির কথা মেনে চলতে হবে।

এখানেই এসে পড়ে শিক্ষার কেন্দ্রীভবনের, তাকে কেন্দ্রীয় সরকারের কুক্ষিগত করে রাখার বিপদাশঙ্কার কথা। বিজেপি-শাসনে শিক্ষার গৈরিকীকরণের যে অভিযোগ বারংবার উঠেছে বিরোধীদের তরফে, তা এখনও পর্যন্ত মুখ্যত উচ্চশিক্ষার পঠনপাঠন বিষয়ে। কিন্তু নতুন বিল আইন হয়ে উঠলে সবচেয়ে বড় বিপদটি হবে সার্বিক নিয়ন্ত্রণের— সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও তার অধীন কাউন্সিলগুলির নির্দেশ মেনে চলার বাধ্যবাধকতার অন্যথা হলে যে কোনও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পড়াশোনা, গবেষণা বা পরিকাঠামো খাতে বরাদ্দ অর্থ হয়তো আটকে যাবে, কিংবা প্রতিষ্ঠানটির অ্যাক্রেডিটেশন তথা মানের স্বীকৃতিও। শাসকের রাজনৈতিক মতাদর্শের রঙে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে চলতে বাধ্য করার ছবিটি তো চার পাশে বহু দৃষ্ট, অন্য দিকে তার আর্থিক ও পরিকাঠামোগত নিয়ন্ত্রণের রাশও নিজেদের হাতে টেনে ধরে রাখার আইনি ব্যবস্থাটি নিশ্চিত করলে মুক্তবুদ্ধির পীঠস্থান বলে নন্দিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে সব দিক থেকেই ঢিট করা সহজ হবে। উপরন্তু, কেন্দ্রের বেঁধে দেওয়া কমিশন বা কাউন্সিলে যোগ্য শিক্ষাবিদদের বদলে পছন্দের রাজনীতিক ও আমলাদের বসিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা অমূলক নয়। সবচেয়ে বড় কথা, সংবিধান-নির্দিষ্ট কেন্দ্র-রাজ্য যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো, বা রাজ্য-তালিকায় থাকা ‘শিক্ষা’র উপযুক্ত মর্যাদারক্ষার বিষয়টিও প্রশ্নের মুখে পড়বে ক্রমাগত।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Indian Education System Central Government Lok Sabha

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy