E-Paper

অভিষেক পর্ব

এ বারের নির্বাচনে রাজ্যবাসী এমন ভাবে ভোট দিয়েছেন, যেন তাঁদের প্রত্যাশা রূপায়ণের দিকে এগোনোর শেষ ট্রেনটিতে তাঁরা চড়ছেন। এ রাজ্যের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্য জন্ম থেকেই দুর্বল, পরবর্তী দশকগুলিতে সেই দুর্বলতা রীতিমতো পঙ্গুতায় পরিণত।

শেষ আপডেট: ১১ মে ২০২৬ ০৮:২৬

পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টির প্রথম সরকারের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর শনিবারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান ছিল সমগ্র ভারতের দৃষ্টি আকর্ষণের মতো একটি ঘটনা। যে কোনও নতুন মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণই একটি বিশেষ মুহূর্ত— আশা ও প্রতিশ্রুতিতে উজ্জ্বল। তবে এ বারের শপথ যেন তার মধ্যেও অতিবিশেষ। স্বাধীন পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির প্রথম বার ক্ষমতায় অধিষ্ঠানমুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দুই জনেই উপস্থিত রইলেন, অনেক দিন পর জেলার নেতা মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে রাজ্যের শীর্ষে অভিষিক্ত হলেন। উল্লেখ্য, এ বারে ভারতীয় জনতা পার্টির নির্বাচনী প্রচারে বারংবার শোনা গিয়েছে বাংলার উন্নয়নের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার বার্তা, পশ্চিমবঙ্গের চেহারা পাল্টে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। সুতরাং ২০২৬ সালের ১০ মে থেকে পশ্চিমবঙ্গবাসী নতুন সরকার ও নতুন মুখ্যমন্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকবেন যে পরিমাণ প্রত্যাশা নিয়ে, তার ভারটি সামান্য নয়। বারংবার মোদী গ্যারান্টি, শাহ-র সঙ্কল্প এবং ‘ডাবল ইঞ্জিন’-এর জয়গান সেই প্রত্যাশাকে আরওই ঊর্ধ্বমুখী করেছে। অর্ধশতক কাল পরে কেন্দ্র ও রাজ্যে এক দলের সরকার গঠনে স্বভাবতই ‘কেন্দ্রের বঞ্চনা’র কোনও স্থান থাকবে না, তাই ওই গুরুভার বহনে বিজেপি মন্ত্রী ও নেতারা সক্ষম হবেন, এমনও আশা করা যাচ্ছে। তবু মনে করিয়ে দেওয়া দরকার, এই অভিষেক-প্রহরে নতুন মুখ্যমন্ত্রী ও নতুন মন্ত্রিসভার কাছে রাজ্যের কিছু প্রত্যাশা বিশেষ গুরুতর— যেগুলি এ বারের বিধানসভা নির্বাচন শুরু হওয়ার আগেই এই সম্পাদকীয় স্তম্ভে (‘দাবি’, ২২-৪) উল্লিখিত হয়েছিল।

এ বারের নির্বাচনে রাজ্যবাসী এমন ভাবে ভোট দিয়েছেন, যেন তাঁদের প্রত্যাশা রূপায়ণের দিকে এগোনোর শেষ ট্রেনটিতে তাঁরা চড়ছেন। এ রাজ্যের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্য জন্ম থেকেই দুর্বল, পরবর্তী দশকগুলিতে সেই দুর্বলতা রীতিমতো পঙ্গুতায় পরিণত। একের পর এক শিল্প-সম্ভাবনার গোড়ায় কুঠারাঘাতের ইতিহাস উনিশশো ষাট-সত্তরের দশকের বামাদর্শ-যাত্রা থেকে শুরু করে একুশ শতকের প্রথম দশকের শেষে বাম-অস্তাচল ও তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থান পর্যন্ত বিস্তৃত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনে গত পনেরো বছরে রাজ্যের শিল্পক্ষেত্রে কোনও সুসংবাদ শোনা যায়নি, শিল্পপতি-সমাবেশ সঞ্জাত শত প্রতিশ্রুতি-লতা জন্মমাত্র শুকিয়ে বিলীন হয়েছে। এই সম্পাদকীয় স্তম্ভ ক্রমাগত নির্দেশ করে গিয়েছে সেই অমিত ব্যর্থতার দিকে, আইন-শৃঙ্খলা ও শিল্পবান্ধব পরিকাঠামোর আত্যন্তিক অভাবের দিকে। বৃহৎ পুঁজির আবাহন এবং দুর্নীতির বৃহৎ নেটওয়ার্কের উৎপাটনের দ্বৈত লক্ষ্যে নতুন সরকার দ্রুত অগ্রসর হোক। কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি বিজেপির প্রচারে বারংবার উচ্চারিত, সেই দিকে বিশেষ লক্ষ থাকুক। এ কাজ রাতারাতি সাধনযোগ্য নয়, কিন্তু সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও সেই পরিকল্পনার দক্ষ রূপায়ণ যেন সঠিক অভিমুখে হয়, পশ্চিমবঙ্গের অনুরোধ।

আইনশৃঙ্খলা এবং নারী নিরাপত্তা: এই নির্বাচনের আরও দুই কেন্দ্রীয় বিষয়। এই দুই বিষয়ে কিন্তু দৃপ্ত প্রতিশ্রুতির সঙ্গে কিছু নম্র স্বীকৃতিও কাম্য, কেননা বিজেপি-শাসিত অন্য কিছু রাজ্য এখনও এই দুই ক্ষেত্রে যথেষ্ট পশ্চাৎপদ। পশ্চিমবঙ্গ আশা করছে, দলমত-নিরপেক্ষ ভাবে আইনের রাজ বলবৎ করবে নতুন প্রশাসন। বাঙালি মেয়েরা সবলা, কর্মকুশলা, তাদের নিরাপদ ভাবে ঘরে-বাইরে কাজ করার পরিসর মিলবে। যে ব্যাপক দুর্নীতি-ঊর্ণজালে রাজ্যের মুখ ঢেকে গিয়েছিল, তার ক্লিন্ন জট ছিন্ন করার দাবি রইল। আর দাবি রইল, জাতধর্ম-পরিচয় না দেখে সমস্ত মানুষ যেন ন্যায়বিচার ও সুস্থ জীবনের অধিকার পান। শেষে একটি গুরুতর কথা— রাজ্যের যে সকল মানুষ অযৌক্তিক ভাবে এসআইআর প্রক্রিয়ায় ভোটাধিকারহীন হয়েছেন, তাঁদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার দ্রুত বন্দোবস্ত হোক। এই শেষ বিষয়টি কিন্তু রাজ্যের অষ্টাদশতম সরকারের একটি অত্যাবশ্যক নৈতিক দায়িত্ব।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Oath Taking Ceremony BJP West Bengal Chief minister West Bengal government West Bengal Politics

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy