E-Paper

মুষল পর্ব

গণপিটুনি তো কোনও বিচার নয়, তা বেআইনি এবং এক সংগঠিত হত্যাকাণ্ড। পেহলু খান-সহ বিভিন্ন ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, সন্দেহের চোখে দেখলেই শাস্তি দিতে উদ্যত হয়ে উঠছে জনতা।

শেষ আপডেট: ০৯ মে ২০২৬ ০৭:৩৭

বিহারের কিষাণগঞ্জ জেলার বাখাতোলি গ্রামের মৌলানা তৌসিফ রাজ়ার দেহ মিলেছে রেললাইনের ধারে। রেলপুলিশের বয়ান, দরজার ধার ঘেঁষে বসে থাকা ওই ব্যক্তি পিছলে কামরা থেকে পড়ে গিয়েছেন, লাইনের ধারের খুঁটিতে ধাক্কা খেয়েছেন, এটি দুর্ঘটনা। অথচ, প্রয়াতের স্ত্রী তবস্‌সুম খাতুন পাল্টা অভিযোগ করেছেন যে কেবল দাড়ি রাখা ও মাথা আচ্ছাদিত রাখার কারণে তাঁর স্বামীকে পিটিয়ে হত্যা করেছে হিংসা-উন্মত্ত জনতা। তিনি ভিডিয়ো কলে স্বামীর উপরে হামলার দৃশ্য দেখেছেন এবং এই দাবির সপক্ষে ভিডিয়ো প্রমাণও পেশ করেছেন। বরেলীর এই সংবাদের পরস্পরবিরোধী ব্যাখ্যা একেবারেই কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং তা সমকালীন ভারতের প্রায় মজ্জাগত হয়ে ওঠা এক অত্যন্ত বিপজ্জনক প্রবণতা। কখনও গোমাংস ভক্ষণ, কখনও শিশুচুরির অভিযোগ, কখনও ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে বারে বারে জনতা চড়াও হচ্ছে সহনাগরিকের উপর। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উস্কানির আগুনে তপ্ত হয়ে উঠে আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগের তোয়াক্কা না করে এ ভাবে সাধারণ মানুষ শাস্তির দণ্ড ছিনিয়ে নিয়ে তাণ্ডব শুরু করলেই সৃষ্টি হয় অরাজকতা।

গণপিটুনি তো কোনও বিচার নয়, তা বেআইনি এবং এক সংগঠিত হত্যাকাণ্ড। পেহলু খান-সহ বিভিন্ন ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, সন্দেহের চোখে দেখলেই শাস্তি দিতে উদ্যত হয়ে উঠছে জনতা। গুজব, সমাজমাধ্যমের অপপ্রচার এবং ধর্মীয় বা জাতিগত উত্তেজনা তাদের নিমেষে হিংস্র করে তুলছে। এই হিংসার মূলে রয়েছে ‘অপর’-এর প্রতি বিদ্বেষ, যে কোনও ভাবে নিজের বা সংখ্যাগরিষ্ঠের আয়না-ছবিটির সঙ্গে না মিললেই আক্রমণের ফুটন্ত বাসনা। যে-হেতু, ভিড়ের মধ্যে দোষীকে চিহ্নিত করায় অসুবিধা রয়েছে, তাই অপরাধীরা বারে বারে ছাড় পেয়ে যাচ্ছে। ফলে, এক প্রকার সামাজিক বৈধতা পেয়ে ভয়ঙ্কর এই রক্তলিপ্সা অবদমিত অবচেতন থেকে বারে বারে নখ-দাঁত বার করে প্রকাশ্যে আসছে। উত্তরপ্রদেশের মর্মান্তিক ঘটনাটির মতো, বহু ক্ষেত্রেই পুলিশ ও প্রশাসন এমন ঘৃণার রাজনীতি প্রসূত অপরাধকে আকস্মিক দুর্ঘটনা বলে সাজিয়ে লঘু করে সমর্থন জোগাতে দেখা গিয়েছে। এই ধরনের ঘটনা ও মনোভাব সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে ধ্বংস করে, মানবাধিকারকে ধূলিসাৎ করে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবিধানস্বীকৃত ব্যক্তির অধিকারকে নস্যাৎ করে। গণতান্ত্রিক আইনবদ্ধ সমাজে এই ঘটনাকে চলতে দেওয়া সভ্যতার পরাজয়।

নাগরিক নিরাপত্তা এবং অপরাধ ও অপরাধীকে শনাক্ত করে বিচারের দায়িত্ব রাষ্ট্রের, কখনওই জনতার নয়। বস্তুত, শীর্ষ আদালত গণপিটুনি রোধে নোডাল অফিসার নিয়োগ, দ্রুত তদন্তের ক্ষেত্রে জোর দেন বারংবার। সম্প্রতি এক রায়ে ফের জানিয়েছেন, ঘৃণাভাষণ ও ঘৃণার রাজনীতি থেকে উদ্গিরিত অপরাধ মোকাবিলায় বিদ্যমান আইনেই যথেষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে; প্রয়োজন কেবল নিরপেক্ষ ও কঠোর প্রয়োগ। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রয়োগই বার বার অনুপস্থিত থেকে যাচ্ছে। তাই প্রশ্ন ওঠে, রাজপথ বা রেলের মতো জনবহুল পরিসরে কেন এমন সঙ্ঘবদ্ধ ঘৃণার অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেই? কেনই বা আক্রান্ত পরিবারের তরফ থেকে প্রমাণ উপস্থিত করলে তবেই প্রশাসনের জগদ্দল পাথরটিতে আঁচড় পড়ে? এই অনর্গল গরলধারার পিছনে একটি বিপন্ন, বিদীর্ণ সমাজ, যার সুস্থতা, নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে হবে রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়কেই।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Mob Lynching Mass Lynching Lynching Act Lynching

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy