এলপিজি সঙ্কট এবং পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ-উদ্ভূত বাণিজ্যিক পরিস্থিতির জন্য অগণিত পরিযায়ী শ্রমিক কাজ হারিয়ে ফিরে আসছেন পশ্চিমবঙ্গে। অথচ, গ্রামগুলিতে দীর্ঘ কাল স্থগিত একশো দিনের কাজের (মনরেগা) প্রকল্প। গ্রামীণ কাজের নতুন প্রকল্প, ‘বিকশিত ভারত গ্যারান্টি ফর রোজগার অ্যান্ড আজীবিকা মিশন-গ্রামীণ’ রূপায়ণও শুরু হয়নি। মনরেগা থেকে নয়া প্রকল্পে পৌঁছতে সময় লাগবে, তা ধরে নিয়েই এ বছর কেন্দ্রীয় বাজেট মনরেগার জন্য ৩০ হাজার কোটি টাকা, এবং নয়া প্রকল্পে ৯৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। ১৯ এপ্রিল কেন্দ্র মনরেগার জন্য প্রথম দফার ১৭,৭৪৪ কোটি টাকা ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে সে টাকা আদৌ পৌঁছবে কি? ভিবি-জিআরএএম-জি প্রকল্পের পরিকাঠামো (যার মধ্যে রয়েছে শ্রমিকের মুখ চেনার ডিজিটাল ব্যবস্থা) তৈরির কাজ শুরু হয়নি। সারা দেশেই মনরেগা খুঁড়িয়ে চলছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে যত কর্মদিবস তৈরি হয়েছে, তা জানুয়ারি-মার্চ, ২০২৫-এর তুলনায় অন্তত ৩০ শতাংশ কম। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল রেখে মজুরি বাড়ানো হয়নি, ১০ হাজার কোটি টাকা মজুরি বকেয়া রয়ে গিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের পাওনা অন্তত দেড় হাজার কোটি টাকা। ডিসেম্বর ২০২১-এ গ্রামে সরকারি কাজের খরা শুরু হয়েছিল, আজও তা কাটেনি। আদালতের নির্দেশ, কেন্দ্রীয় সরকারের বিজ্ঞপ্তি, কোনও কিছুই পশ্চিমবঙ্গের মনরেগায় প্রাণসঞ্চার করতে পারেনি। ভোটের ঢক্কানিনাদে গ্রামের মানুষের ক্ষোভ, প্রতিবাদ, সবই চাপা পড়ে গিয়েছে।
গ্রামীণ রোজগার নিশ্চয়তার অভাব সবচেয়ে তীব্র ভাবে অনুভূত হয় যখন বহু মানুষ এক সঙ্গে কাজ হারান। কোভিডের সময়ে কর্মচ্যুতি এবং রোজগারহীনতার ‘শক’ কাটাতে সাহায্য করেছিল মনরেগা-র কাজ। এ বার তা-ও নেই। পশ্চিমবঙ্গ-সহ বহু রাজ্যের শ্রমিকদের একটা বড় অংশ ভিন রাজ্যে কর্মরত, তাঁদের কাজ বিশ্ববাজারের সঙ্গে সংযুক্ত। যখনই অতিমারি, যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অপর কোনও সঙ্কট বড় আকারে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রকে বেসামাল করবে, তখন এক সঙ্গে বহু শ্রমিক কাজ হারাবেন, তা আজ প্রত্যাশিত। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না-হওয়া পর্যন্ত যদি তাঁদের বিকল্প রোজগারের ব্যবস্থা করা না যায়, তা হলে খাদ্য ও বাসস্থানের অভাব, সঞ্চয়ের ক্ষয়, ঋণগ্রস্ততা, অচিকিৎসা, এমন নানা সমস্যা গ্রাস করবে শ্রমজীবী পরিবারগুলিকে। আজ রাষ্ট্র ও বাজারব্যবস্থা চুক্তি এবং গিগ কাজের মাধ্যমে শ্রমশক্তির যথোপযুক্ত ব্যবহারে বিশ্বাসী। ফলে শ্রমবাহিনীর একটি বড় অংশ কোনও নির্দিষ্ট সংস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকছে না। যে শিল্পে যখন যেমন প্রয়োজন, তখন সে ভাবে নিযুক্ত হচ্ছে। তার কিছু সুফল শ্রমিকেরাও পাচ্ছেন— রোজগারে বৃদ্ধি, নানা ধরনের কাজে দক্ষতা তৈরি, পছন্দের কাজ খুঁজে নেওয়ার সুযোগ, প্রভৃতি। কিন্তু এর বিপরীতে রয়েছে কর্মনিরাপত্তার অভাব। চুক্তি-নির্ভর, নমনীয় নিয়োগব্যবস্থাকে ন্যায্য, দীর্ঘমেয়াদি এবং দারিদ্র-প্রতিরোধী করতে হলে সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থাকে শক্তসমর্থ করা প্রয়োজন।
সম্প্রতি যুদ্ধ ও এলপিজি-র দামবৃদ্ধির জন্য কর্মহীন শ্রমিকরা সুরাত থেকে বাড়ি ফেরার জন্য ট্রেন ধরতে গিয়ে চরম নাকাল হলেন, পুলিশের দ্বারা নিগৃহীত হলেন। সন্ত্রস্ত মানুষের ছুটোছুটির দৃশ্য দেখিয়ে দিল যে পরিযায়ী শ্রমিকদের সুরক্ষার কাজ হয়েছে অতি সামান্যই। সঙ্কটের মোকাবিলা করতে নিয়োগকারী অথবা স্থানীয় সরকার, কোনও পক্ষ পরিযায়ী শ্রমিকদের পাশে দাঁড়াল না। আপৎকালীন সহায়তা থেকে ঘরে ফেরার সুষ্ঠু ব্যবস্থা, কিছুই হল না। ‘বলে দিয়ো বন্ধু, আর আসব না’ সুরাতের এক পরিযায়ী শ্রমিকের এই কথা দেশবাসীকে বিদ্ধ করেছে। যাঁদের শ্রমের উপর দেশ নির্ভর করে, তাঁরা আর দেশের প্রশাসনের উপর নির্ভর করতে পারছেন না— দেশের সরকার বা নাগরিক সমাজ, কোনও পক্ষই এই দায় এড়াতে পারে না।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)