E-Paper

ক্ষতে প্রলেপ

বাস্তব রূপায়ণের ক্ষেত্রটিতে প্রশ্ন থেকেই যায়। যে প্রতিবন্ধী অধিকার সংক্রান্ত আইনে অন্তর্ভুক্তিকরণের কথা বলা হয়েছে, সেই আইন কি সর্বত্র সমান ভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে?

শেষ আপডেট: ০৮ মে ২০২৬ ০৮:১৪

লড়াই শুধু কয়েক দিনের নয়, জীবনভর। লড়াই শুধুমাত্র প্রাণে বেঁচে যাওয়ারও নয়, প্রতি মুহূর্তে যন্ত্রণা, ভয়, কষ্ট, অনিশ্চয়তাকে সঙ্গী করে বেঁচে থাকারও। সম্প্রতি সেই অ্যাসিড-আক্রান্তদের সংজ্ঞাকে আরও খানিক বিস্তৃত করে তাঁদের এক বৃহৎ অংশই যাতে প্রতিবন্ধীদের অধিকার সংক্রান্ত আইনের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন, তার জন্য বিশেষ পদক্ষেপ করল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। এর আগে ‘অ্যাসিড আক্রান্ত’ বলতে তাঁদেরই বোঝানো হত, যাঁদের দেহের বহিরাংশ অ্যাসিডের হামলায় ঝলসে গিয়েছে। আদালত সম্প্রতি জানিয়েছে, প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার সংক্রান্ত আইনের আওতায় আনা হবে সেই সব আক্রান্তকেও, যাঁদের জোরপূর্বক অ্যাসিড খাওয়ানো হয়েছে, এবং তাতে তাঁদের গভীর ক্ষতি হয়েছে। অতঃপর সংশ্লিষ্ট আইনে উপযুক্ত সংশোধনী আনার কথা কেন্দ্রীয় সরকারকে জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। অ্যাসিড-আক্রমণ মূলত লিঙ্গভিত্তিক হিংসা। আক্রান্তদের অধিকাংশই মেয়ে। আক্রমণ-পরবর্তী কালে সমাজে সুস্থ-স্বাভাবিক ভাবে বেঁচে থাকার ক্ষমতাটি তাঁদের প্রায় থাকে না। সুতরাং, আইনের দিক থেকে উপযুক্ত সহায়তা দানের প্রচেষ্টাটি জরুরি। নিঃসন্দেহে বিচারবিভাগের এ-হেন ইতিবাচক চিন্তা তাঁদের লড়াইয়ের পথটি খানিক মসৃণ করবে।

তবে বাস্তব রূপায়ণের ক্ষেত্রটিতে প্রশ্ন থেকেই যায়। যে প্রতিবন্ধী অধিকার সংক্রান্ত আইনে অন্তর্ভুক্তিকরণের কথা বলা হয়েছে, সেই আইন কি সর্বত্র সমান ভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে? ২০১৬ সালের আইনটিতে ২১ ধরনের প্রতিবন্ধকতাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, বিশেষ ভাবে সক্ষমদের সঙ্গে বৈষম্য না করার কথা, সরকারি চাকরি ও শিক্ষাক্ষেত্রে সংরক্ষণের কথা, এবং সমস্ত গণভবনে প্রবেশের জন্য উপযুক্ত পরিকাঠামো নির্মাণের কথা। এই আইনের উদ্দেশ্য ছিল যাতে প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষ সমাজের মূল স্রোতে মেশার সুযোগ পান এবং আত্মনির্ভরতার মন্ত্রে নিজেকে দীক্ষিত করতে পারেন। কিন্তু দেখা গিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যগুলি আইন অনুযায়ী কাজের ক্ষেত্রে বহু পিছিয়ে। অ্যাসিড-আক্রান্তদের ক্ষেত্রে যে এই চিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে যাবে, তেমন ভাবার কারণ নেই। লক্ষণীয়, ২০২৩ সালের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গ অ্যাসিড-আক্রমণের ঘটনায় দেশের সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছে। অথচ, এখানেই পুলিশি সহায়তা না-পাওয়ার অভিযোগ বিস্তর। অ্যাসিড হামলার প্রাথমিক ক্ষতিপূরণ যেখানে ১৫ দিনের মধ্যে পাওয়ার কথা, নিখরচায় আইনি সহায়তাও পাওয়ার কথা— সে সব ক্ষেত্রে অযথা বিলম্ব, এমনকি বঞ্চনার অভিযোগও প্রায়শই শোনা যায়। দুই ক্ষেত্রেই যেখানে অ-প্রাপ্তির তালিকাটি এমন দীর্ঘ, সেখানে উপরোক্ত সদর্থক পদক্ষেপ কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাবে কি না— সন্দেহ যথেষ্ট।

সর্বোপরি, অ্যাসিড-আক্রমণের ক্ষেত্রে হামেশাই শোনা যায় অভিযুক্তের শাস্তি না-পাওয়ার কথা। আক্রান্তের অধিকার নিশ্চিত করতে হলে অবিলম্বে এই ক্ষেত্রে কঠোরতা জরুরি। আপসের চেষ্টা নয়, পুলিশ-প্রশাসনের আইনানুগ ব্যবস্থা করা আবশ্যক। আক্রান্তের পাশে দাঁড়াতে হবে সমাজকেও। অধিকাংশ অ্যাসিড-আক্রমণের পিছনে বিয়ে, বা প্রেমে প্রত্যাখ্যানের ঘটনা কারণ হিসাবে উঠে আসে। এই মানসিকতা থেকে সমাজের আরোগ্য লাভ জরুরি। নয়তো অধিকার প্রতিষ্ঠার আশ্বাসটি অপূর্ণই থেকে যাবে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Supreme Court of India Acid Attack Victim Acid Attack Survivor Acid Attack

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy