E-Paper

স্বার্থরক্ষার চুক্তি

চুক্তি অনুযায়ী, নিউ জ়িল্যান্ড ভারত থেকে আমদানি করা সমস্ত পণ্যের উপর থেকে শুল্ক তুলে নেবে।

শেষ আপডেট: ০৭ মে ২০২৬ ০৮:৪২

সম্প্রতি ভারত ও নিউ জ়িল্যান্ডের মধ্যে স্বাক্ষরিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ)-টি দিল্লির অর্থনৈতিক অংশীদারির তালিকায় কেবল আর একটি সংযোজন নয়, বরং অস্থিতিশীল বিশ্বব্যবস্থায় এক সুচিন্তিত ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশলও বটে। এমনিতেই বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও)-র দুর্বল হয়ে পড়ায় নিয়ম-ভিত্তিক বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। ফলে, বিভিন্ন দেশ আজ তাদের পারস্পরিক স্বার্থরক্ষার সঙ্গে যুক্ত দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সম্পাদনেই বেশি আগ্রহী। তবে, এই চুক্তির নেপথ্যে ভারতীয় উৎপাদকদের জরুরি পরিস্থিতির বিষয়টিও ভুললে চলবে না— এক দিকে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সঙ্কট ও ক্রমবর্ধমান সরবরাহ খরচের ধাক্কা আর অন্য দিকে, আমেরিকার অনিয়ন্ত্রিত শুল্কনীতির জেরে বিশ্ববাণিজ্যের অনিশ্চয়তা। নিউ জ়িল্যান্ডের ক্ষেত্রেও চুক্তিটি সমান গুরুত্বের। ওয়েলিংটন দীর্ঘ দিন ধরেই তার বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার চিনের উপর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। তবে সাম্প্রতিক কালে বেজিংয়ের মন্থর অর্থনৈতিক বৃদ্ধি এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা পরিস্থিতি তাদের বাণিজ্যের বৈচিত্রকরণকে এখন আর নীতিগত চাহিদা নয়, অর্থনৈতিক প্রয়োজনে পরিণত করেছে।

চুক্তি অনুযায়ী, নিউ জ়িল্যান্ড ভারত থেকে আমদানি করা সমস্ত পণ্যের উপর থেকে শুল্ক তুলে নেবে। ভারতও ও দেশ থেকে আমদানিকৃত ৯৫ শতাংশ পণ্যের উপর থেকে শুল্ক তুলে নেবে বা কমিয়ে দেবে। তা ছাড়া, চুক্তির জেরে অন্যান্য সুবিধাও মিলবে দিল্লির। একটি উচ্চ-মূল্যের বাজার হিসেবে নিউ জ়িল্যান্ড বস্ত্র, ওষুধশিল্প, এঞ্জিনিয়ারিং পণ্য, পরিষেবা (আইটি ও আইটিইএস-সহ), শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবার মতো বিবিধ ক্ষেত্রে সুযোগ করে দিচ্ছে ভারতীয় উৎপাদকদের। পাশাপাশি আগামী ১৫ বছরে ভারতে তাদের ২০০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেশের শিল্প পরিকাঠামো এবং উৎপাদন ক্ষেত্র বিকাশের প্রচেষ্টাকে আরও জোরদার করবে বলেই আশা করা যায়। তবে, উল বা ওষুধপত্রের মতো সামগ্রীতে আমদানি শুল্ক হ্রাস করা হলেও, এই তালিকা থেকে বাদ রাখা হয়েছে চিনি, কৃত্রিম মধু, রত্ন ও গহনা এবং দুগ্ধজাত ও কৃষি পণ্যকে। লক্ষণীয়, ভারত সেই সব পণ্যের আমদানির বিষয়ে সংবেদনশীল, যা দুগ্ধ ও কৃষির মতো দেশীয় ক্ষেত্রগুলিকে প্রভাবিত করতে পারে। আজও এই ক্ষেত্রগুলি লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকার উৎস হওয়ায় ভারত অন্যান্য দেশের সঙ্গেও তার বাণিজ্য চুক্তিতে এই অভ্যন্তরীণ স্বার্থের বিষয়ে সতর্ক থেকেছে।

তবে ইঙ্গিত স্পষ্ট— ভারতের বর্তমান বাণিজ্য কৌশল একক বাজার বা অংশীদারদের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থেকে সরে এসে বাণিজ্য চুক্তির এক বৃহত্তর সংযোগের দিকে ঝুঁকছে। এর লক্ষ্য, সরবরাহ শৃঙ্খল সুরক্ষিত করার পাশাপাশি রফতানি এবং ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি করা। বস্তুত, নিউ জ়িল্যান্ডের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিটি একটি নিখুঁত চুক্তি না হলেও সময়োপযোগী, যা বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনা— উভয়কেই প্রতিফলিত করে। সময়ের সঙ্গে, সমমনা দেশগুলোর সঙ্গে সুচিন্তিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির একটি আন্তর্জাল ভারতকে ক্রমবর্ধমান মেরুকৃত বাণিজ্য ব্যবস্থায় কৌশলগত নমনীয়তা এবং বৃহত্তর সুবিধা দিতে পারবে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Trade Deal Delhi Wellington

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy