E-Paper

সময়, স্মৃতি ও সৃজনের ভাঁজে

দীপ্তীশ ঘোষ দস্তিদারের অ্যাক্রিলিকের কাজে প্রথমেই চোখে পড়ে, লো অ্যাঙ্গল ভিউ। একেবারে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার আহ্বান।

পিয়ালী গঙ্গোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৬ জুন ২০২৬ ০৬:২৭
যুথবদ্ধ: ললিতকলা অকাদেমী আয়োজিত প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম

যুথবদ্ধ: ললিতকলা অকাদেমী আয়োজিত প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম

কলকাতার শিল্পচর্চার মানচিত্রে ললিতকলা অকাদেমীর রিজিয়োনাল সেন্টার এক বিশেষ অধ্যায়। এই কেন্দ্রের পত্তন শুধু একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার জন্মকাহিনি নয়। শিল্প ও ইতিহাসের এক আন্তঃসম্পর্কিত পর্বের স্মারক।

মহাত্মা গান্ধীর মূর্তি নির্মাণের উদ্দেশ্যে ভাস্কর দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরীকে কলকাতায় যে স্টুডিয়ো দেওয়া হয়েছিল, সেটিই পরবর্তীতে শিল্পচর্চার এক উর্বর কেন্দ্র হয়ে ওঠে। দেবীপ্রসাদ চেয়েছিলেন, এই পরিকাঠামো শিল্পীদের কাজে লাগুক। সেই ভাবনা থেকেই পরিতোষ সেন-সহ বিকাশ ভট্টাচার্য, অমিতাভ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুনীল দাস প্রমুখ শিল্পীরা উদ্যোগী হন। ১৯৮৪ সালে রাষ্ট্রীয় ললিতকলা কেন্দ্র হিসেবে যাত্রা শুরু করে এই প্রতিষ্ঠান এবং প্রাণবন্ত শিল্প-পরিসরে পরিণত হয়।

সেই দীর্ঘ শিল্পযাত্রার সঙ্কলিত প্রতিফলন দেখা গেল সম্প্রতি, অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসে আয়োজিত ‘এজ অব দ্য মিলেনিয়াম’ শীর্ষক প্রদর্শনীতে। ১৯৮৪ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত এই প্রদর্শনীতে ছবি, ভাস্কর্য ও প্রিন্টমেকিং-এর বহুমাত্রিক শিল্পভাষা উঠে এল। প্রায় ৫৫জন শিল্পীর কাজ একসঙ্গে দেখার অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ হলেও, কোথাও কোথাও ঘন বিন্যাস ছবির স্বতন্ত্র দর্শনে বাধা দেয়। ভাস্কর্যের উপস্থাপনায় সেই সমস্যা বরং কম।

দীপ্তীশ ঘোষ দস্তিদারের অ্যাক্রিলিকের কাজে প্রথমেই চোখে পড়ে, লো অ্যাঙ্গল ভিউ। একেবারে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার আহ্বান। তাঁর ‘ঘাটের কথা’ শুধুই স্থানচিত্র নয়, সামাজিক ইতিহাসের চলমান দলিল। দৈনন্দিন জীবনের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ শিল্পীর পারদর্শিতাকে স্পষ্ট করে তোলে। ছবির চরিত্রদের পোশাক, চটি, অলঙ্কার, জলপাত্র, শরীরী ভাষা এবং হাতে ধরা মোবাইল— সব মিলিয়ে তৈরি হয় সময়ের এক জীবন্ত দৃশ্য। দীপ্তীশের কাজ মূলত একটি সোশ্যাল আর্কাইভ।

ঋষি বড়ুয়ার ‘রিভার্স পেন্টিং অন অ্যাক্রিলিক শিট’ সিরিজ়টি যুদ্ধ পরিস্থিতির বিমূর্ত বর্ণনা। কালো স্তরের উপরে স্ক্র‍্যাচ ও টেক্সচারের ভিতর থেকে উঠে আসা চিহ্নগুলি ড্রয়িংয়ের মাধ্যমে অর্থবহ রূপ নেয়। তারই মধ্যে সীমিত লাল রং সহিংসতার বিস্ফোরণ ঘটায়। পিছনের আবছা টর্নেডোর ফর্ম অদৃশ্য বিপর্যয়ের আভাস দেয়। প্রদীপ রক্ষিতের ‘সাইলেন্স-১’ কাজটিতে গাঢ় ও ধূসর নীলের এক নিঃসঙ্গ নগরস্মৃতির হাহাকার গ্রাস করে।

সমসময়ের এক রক্তাক্ত প্রতিচ্ছবি উঠে আসে প্রদোষ পালের কাজে। চারপাশের হিংসা, যৌন নিগ্রহ কী ভাবে সৌন্দর্যের প্রচলিত ধারণাকে ভেঙে দিচ্ছে, তা প্রতিফলিত হয়। ‘ফ্লাওয়ার অব দ্য হেল’-এ তাই ফুলের মতো চিরন্তন সৌন্দর্যের প্রতীকও তাঁর ক্যানভাসে রূপ নেয় মাংসপিণ্ডের মতো বিকৃত, ছিন্নভিন্ন আকারে। তবুও অন্ধকারের গাঢ় নীল ভেদ করে কোথাও যেন ক্ষীণ আশা টিকে থাকে।

পপি বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘রুটস ইন দ্য মিস্ট অব ইলিউশন’ প্রকৃতি, স্মৃতি এবং হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের অনুসন্ধান। রঙের স্বচ্ছতা রেখে, বেশ কিছু বছর ধরে শিল্পী শিকড়কে কেন্দ্র করে নিজস্ব ভাষা তৈরি করেছেন। ধ্বংসপ্রায় স্থাপত্য ও বৃক্ষশিকড় তাঁর কাজে নস্ট্যালজিয়া ও সময়ের ক্ষয়কে মিলিয়ে দেয়। অন্য দিকে সীমা ঘোষ ভট্টাচার্যের ‘অ্যাফিনিটি’র নিঃশব্দ আলোকময়তা এক অন্তর্মুখী অনুভূতির জন্ম দেয়।

প্রযুক্তিনির্ভর জীবনের এক তাৎপর্যপূর্ণ ভাষা তুলে ধরেন তমালী দাশগুপ্ত। ‘কানেক্টেড’ ছবিতে জালের মতো কালো রেখাগুলি যেন অদৃশ্য সংযোগের প্রতীক। ছবির কেন্দ্রে থাকা মোবাইল হাতে আবৃত নারী দূরের জগতের সঙ্গে যুক্ত। চারপাশের বাস্তবতা থেকে সে বিচ্ছিন্ন। বিভক্ত স্থাপত্য চারপাশের সামাজিক ও মানসিক ভাঙনের কথা বলে। এনামেল, অ্যাক্রিলিক ও টেক্সচারের রিলিফ ছবিতে স্পর্শাত্মক গভীরতা আনে। দীপিকা সাহার সেরামিকের ‘দেবী ত্রিনেত্র’ লোকজ ভাবনা ও আধুনিক ফর্মের অভিনব মেলবন্ধন। উঁচু হয়ে ওঠা তৃতীয় নয়ন এবং সর্পিল মোটিফ কাজটিকে রহস্যময় করে তোলে।

‘দাদাগিরি’ লিথোগ্রাফে পরাগ রায় কুকুরের শরীরী ভঙ্গির মধ্য দিয়ে এক আগ্রাসনের রূপ দিয়েছেন। কালো-সাদার বৈপরীত্য এবং দ্রুত ব্রাশিং-এর কাজটিতে এক্সপ্রেশনিস্ট শক্তি স্পষ্ট। অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘ক্রেডলিং দ্য নিউজ় অব লাইফ’-এ মাতৃত্ব ও অনিশ্চয়তা একসঙ্গে ধরা পড়ে। অ্যাক্রিলিকের ঘন রং, মোটা রেখা এবং শিশু কোলে মায়ের বিস্ফারিত চোখ ছবিটিকে মানবিক বেদনাবোধে ভরিয়ে তোলে। ব্রোঞ্জের ‘সিম্বল অব লাভ’ ভাস্কর্যে প্রদীপ রুদ্র পাল শরীরের বক্রতা ও গতিময়তার মধ্যে প্রেমকে প্রায় পৌরাণিক মাত্রা দিয়েছেন। সন্দীপ ভট্টাচার্যের ‘মাই সোল, মাই দুর্গা’ দেবী ও আত্মপরিচয়ের এক নতুন ব্যাখ্যা। উজ্জ্বল সমতল রং, সরলীকৃত ফর্ম ছবিটিকে গভীর ভাবে দেশীয় করে তোলে।

প্রিন্টমেকিং-এর কয়েকটি কাজ বিশেষ ভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সীমা বড়ুয়ার লিনোকাটের ‘অ্যাপো’তে বিকৃত মানবমুখের ভঙ্গি গভীর সঙ্কটের আবহ তৈরি করে। অতীন বসাকের ‘সং অব সাইলেন্স’ এচিং-এ মানবমুখ, কাঁটাময় গুঁড়ি এবং ছোট পাখি মিলিয়ে এক নীরব সুর ভেসে চলে। সূক্ষ্ম রেখার ব্যবহার ছবিটিকে প্রায় ধ্যানমগ্ন করে তোলে।

এ ছাড়া উল্লেখ্য, অরিজিৎ চৌধুরীর ‘আনসার্টেন ডিফ্লেশন’, অনিতা চক্রবর্তীর লিনো, অলকানন্দা সেনগুপ্তের টেরাকোটা, সুজাতা পণ্ডিতের মিশ্র মাধ্যম, তপতী সরকারের এচিং এবং রামহরি জানার ইন্টাগ্লিয়ো। তাই নিছক প্রদর্শনী নয়, কেয়াতলার এই কেন্দ্র দেখিয়েছে, একটি পরিকাঠামো কী ভাবে শিল্পীদের সক্রিয় অংশগ্রহণে এক জীবন্ত সাংস্কৃতিক পরিসরে পরিণত হতে পারে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Academy of Fine Arts

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy