E-Paper

ছুটি নেই ছোটদের

শখপূরণের অতিরিক্ত চাপে নাভিশ্বাস শিশুদের। কী করে একটু চাপমুক্ত রাখা যায় তাদের?

সায়নী ঘটক

শেষ আপডেট: ০৬ জুন ২০২৬ ০৬:৩৪

অঞ্জন দত্ত যতই বলুন, ‘ছাদের পাঁচিল বলছে আয় ছুটে আয় খালি পায়ে...’ বাস্তবে তার সুযোগ পায় না বললেই চলে এখনকার শিশুরা। তাদের অবসর বাঁধা পড়ে আছে আঁকার ক্লাস, ক্যারাটে ট্রেনিং, জিমন্যাস্টিক্স ক্লাস কিংবা পিয়ানো লেসনে। কো-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটি অত্যন্ত জরুরি একটি বিষয়। কিন্তু স্কুলের ইঁদুরদৌড় শুরু হতে না হতেই সন্তানদের একাধিক ক্লাসে ভর্তি করিয়ে দেওয়া, শনি-রবিবারের সকাল-বিকেলগুলো ব্যস্ত করে তোলার প্রভাব শিশুদের উপরে কী ভাবে পড়বে, সেই বিষয়টিও মাথায় রাখা দরকার অভিভাবকদের।

সন্তান স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই অধিকাংশ মা-বাবার চিন্তা শুরু হয়ে যায়, বাচ্চাকে আর কী কী শেখানো যায়। ক্লাসের অন্য বাচ্চারা কী কী করছে ছুটির দিনে, কোথায় ভর্তি হচ্ছে, সেই খোঁজ নিতে শুরু করেন তাঁরা। নাচ-গান-আঁকা... অধিকাংশ সময়ে এই ধরনের সৃজনশীল শিক্ষায় প্রথমেই ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয় তাদের। তার সঙ্গে যুক্ত হয় সাঁতার, জিমন্যাস্টিক্স... আর একটু বড় হলে অ্যাবাকাস, দাবা, পিয়ানো ক্লাস, টেনিস... এই শেখার কোনও শেষ নেই। তার সঙ্গে যুক্ত হয় পারফরম্যান্স প্রেশার। কিন্তু মাথায় রাখতে হবে, একসঙ্গে এত কিছু করতে গিয়ে কি বাচ্চাটি জীবনে অবকাশ পাচ্ছে? অবসর সময় নিজের মতো করে কাটানোও কিন্তু বেড়ে ওঠার অন্যতম শর্ত।

শখ-আহ্লাদে অনাসক্তি

পেরেন্টিং কনসালট্যান্ট পায়েল ঘোষ বললেন, দীর্ঘ দিন ধরে কাউন্সেলিং করার সুবাদে তিনি লক্ষ করেছেন, অধিকাংশ শিশুই যে শখটি ভালবেসে প্রতিপালন করত, একটা সময়ের পরে তার থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে। “অনেক সময়ে দেখা যায়, কোনও শিশু হয়তো ছোটবেলায় আঁকতে খুব ভালবাসত, সে-ই একটু বড় হয়ে রং-তুলির কাছে পর্যন্ত ঘেঁষছে না। আমার কাছে আসা বহু বাচ্চার ক্ষেত্রে এটা লক্ষ করেছি। বাবা-মায়েরা বলেছেন, আমার মেয়ে আগে নাচতে ভালবাসত, এখন কিছুতেই করতে চায় না,” উদাহরণ দিলেন পায়েল। এর মূল কারণ হিসেবে তিনি কয়েকটি বিষয় চিহ্নিত করলেন। তাঁর কথায়, একটি বাচ্চা ভালবেসে, নিজের খেয়াল-খুশি মতো কোনও কিছু করলে এক রকম। সেটাই যখন ক্লাস, হোমওয়ার্কের নিগড়ে বেঁধে তাকে করতে বাধ্য করা হয়, তখন তার স্বতঃস্ফূর্ত ভাললাগায় ব্যাঘাত ঘটে। উদাহরণ দিয়ে তিনি বললেন, “একটি শিশু হয়তো প্রকৃতি আঁকতে ভালবাসে। কিন্তু তার আঁকার ক্লাসে হয়তো ফিগার আঁকা শেখানো হচ্ছে। সেই বিষয়ে একগুচ্ছ হোমওয়ার্ক ধরানো হয়েছে তাকে। তখনই তার বিতৃষ্ণা জন্মাতে পারে।” আঁকা, নাচ, গান-সহ যে কোনও প্রশিক্ষণ শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা, সার্টিফিকেট ইত্যাদির মান্যতা দাবি করে। সেখানেও চলে আসে অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা। একটা স্কুল থেকে বেরিয়ে আর একটা স্কুলেরজাঁতাকলে পড়ে তারা ধীরেধীরে নিরুৎসাহ হয়ে পড়ে।

ভার লাঘবের উপায়

পায়েল জানালেন, এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটি যাতে একটা বাচ্চার কাছে কখনওই তিক্ত অভিজ্ঞতায় পরিণত না হয়, সে খেয়াল রাখতে হবে। “বাচ্চা কোন বিষয়ে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে উৎসাহ পাচ্ছে, সেটা চিহ্নিত করতে হবে। একটা কথা মাথায় রাখতে হবে, জোর করে কোনও কিছুই হয় না। হয়তো আপনার বাচ্চা রেওয়াজের মর্ম বুঝতে পারছে না, তাকে ধৈর্য ধরে বোঝান। দরকার হলে সাময়িক ভাবে সেই ক্লাস বন্ধ করে কিছু সময় পরে আবার দিয়ে দেখুন, সে উৎসাহ ফিরে পায় কি না। শিক্ষকদেরও উচিত, প্রথম থেকেই খুব কঠিন প্রশিক্ষণের মধ্যে না গিয়ে মজার ছলে, ধীরে ধীরে বাচ্চাদের আগ্রহ বাড়িয়ে তোলা। অনেক ট্রেনার সকলের সামনে অপমান করেন। সেটা অনেক সময়ে বাচ্চার মনোবল ভেঙে দেয়। একটু পিছিয়ে পড়া বাচ্চাদের শেখানোর ক্ষেত্রে বেবি স্টেপসে এগোনোই ভাল,” বললেন পায়েল।

খেলাধুলোও জরুরি

সাঁতার, ক্যারাটে বা যে কোনও একটা ফিজ়িক্যাল অ্যাক্টিভিটির সঙ্গে বাচ্চাকে যুক্ত রাখা তার শরীর-স্বাস্থ্যের পক্ষে ভাল। তবে বাচ্চার স্বাভাবিক আগ্রহ কোন খেলায়, সেটা খেয়াল করুন। পায়েল বললেন, “কোনও কিছুতে উৎসাহ থাকলে একটি বাচ্চাকে কোনও ভাবেই আটকানো যায় না। নিজের মেয়েকে টেনিসে ভর্তি করিয়েছিলাম। ক্লাস শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও দেখতাম, কয়েকজন ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক্সট্রা ক্লাস করে যাচ্ছে। তাদের কেউ জোর করেনি। তবে সবাই সেটা করবে, এটা আশা করা উচিত নয়।”

শখ চাপিয়ে দেওয়া নয়

একটি ছ’বছরের শিশু একবার কাউন্সেলিংয়ের সময়ে স্বীকার করেছিল, তার মায়ের গান শেখা হয়নি বলে মেয়েকে জোর করে গানের ক্লাসে ভর্তি করানো হয়েছে। নিজের অপূর্ণ শখ, আহ্লাদ সন্তানের উপরে চাপিয়ে দেওয়া অভিভাবকদের পুরনো অভ্যেস। ‘বাঙালি বাড়িতে একটু গান শিখবে না?’ এই মনোভাবের বশবর্তী হয়ে বেশির ভাগ শিশুকেই ছোটবেলায় গানের ক্লাসে ভর্তি করানো হয়। কিছু বছর পরে দেখা যায়, পড়াশোনার চাপে ধীরে ধীরে সব শখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিতে বাধ্য হচ্ছে সেই শিশুটি।

চাপ যে সকলের ক্ষেত্রে সমান হবে, এমন নয়। অনেক বাচ্চাই ছোট থেকে অতিরিক্ত চাপ নিতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। কেউ আবার ভালবেসেই চর্চা করে যায়। কোন বাচ্চা কী ভাবে কতটা গ্রহণ করবে, তা প্রত্যেকের ক্ষেত্রে আলাদা। কাজেই শিশুদের ইচ্ছে, মনের তল বুঝে সেই মতো ট্রেনিং দেওয়া দরকার তাদের। শখপূরণ বোঝা হয়ে যাচ্ছে বুঝলেই তা লাঘব করার দায়িত্ব অভিভাবকদের।


(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Mental Stress

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy