E-Paper

ছেলেখেলা

এই ভুলের দায় প্রথমত ও শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থাগুলির— নিট-এর ক্ষেত্রে এনটিএ, সিবিএসই-র ক্ষেত্রে বোর্ড কর্তৃপক্ষের।

শেষ আপডেট: ০৬ জুন ২০২৬ ০৭:৩৮

একা নিট-এ রক্ষে নেই, সিবিএসই দোসর। এই মুহূর্তে ভারতীয় শিক্ষাক্ষেত্র, বিশেষত তার পরীক্ষা-ব্যবস্থা নিয়ে বলতে গেলে এমনটাই মনে হওয়া স্বাভাবিক। নিট পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস, আর্থিক কেলেঙ্কারি, পুলিশি ধরপাকড়, সিবিআই তদন্তের অভিঘাত এখনও মিলিয়ে যায়নি, এরই মধ্যে সিবিএসই বোর্ড পরীক্ষার ফল বেরোতে দেখা গেল, উত্তরপত্রের ডিজিটাল মূল্যায়ন ব্যবস্থা তথা ‘অনস্ক্রিন মার্কিং’ (ওএসএম) আগাগোড়া ভুলে ভরা। ভুলের ব্যাখ্যা হয়, পরিস্থিতিবিশেষে ক্ষমাও, কিন্তু নিট বা সিবিএসই-র মতো পরীক্ষার ক্ষেত্রে ভুলের খেসারত দিতে হচ্ছে লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীকে, পরীক্ষা-নিয়ামকদের নয়— সে জন্যই এই ভুল অমার্জনীয়। যে পরীক্ষায় সাফল্যের উপরে ছাত্রছাত্রীদের উচ্চশিক্ষা, ভবিষ্যৎ কর্মজীবনও নির্ভরশীল, প্রশ্ন ফাঁসের জেরে পরীক্ষা বাতিল হলে বা মূল্যায়নে এত ভুল হলে তা যে প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুলে দেয়— এই সত্য কর্তৃপক্ষ আর কবে বুঝবেন?

এই ভুলের দায় প্রথমত ও শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থাগুলির— নিট-এর ক্ষেত্রে এনটিএ, সিবিএসই-র ক্ষেত্রে বোর্ড কর্তৃপক্ষের। পাশাপাশি এই গভীর উদ্বেগও উঠে আসে: লক্ষ লক্ষ ছেলেমেয়ের পড়াশোনা জড়িয়ে, এমন পরীক্ষা পরিচালনা করতে গেলে যে দক্ষতা ও দায়বদ্ধতা জরুরি, তা কি এই সরকারি সংস্থাগুলির আছে? বাস্তবচিত্র বিপরীত, এনটিএ দায়িত্ব নেওয়ার পর গত কয়েক বছরে একাধিক বার নিট-এর প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে, প্রশ্নপত্র বিক্রির বিরাট দুর্নীতিচক্রের উপস্থিতি প্রমাণিত। এ বছর সিবিএসই পরীক্ষার ক্ষেত্রে উঠে এসেছে আরও উদ্বেগজনক তথ্য: যে অসরকারি সংস্থাটিকে নতুন ডিজিটাল পদ্ধতিতে মূল্যায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তার অতীত-ইতিহাস মোটেই সুবিধের নয়, কয়েক বছর আগে তেলঙ্গানায় রাজ্য স্তরে পরীক্ষা মূল্যায়নের পর প্রায় তিন লক্ষ পড়ুয়া অকৃতকার্য হয়, কুড়িরও বেশি শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। অভিযোগ, অন্য নামে ফিরে আসা সেই সংস্থাকে এ বছর সিবিএসই-র পরীক্ষা মূল্যায়নে শুধু যে চূড়ান্ত নিয়োগই দেওয়া হয়েছে তা নয়, দরপত্রের নানা শর্ত শিথিল করে তাদের অন্যায্য সুবিধাও করে দেওয়া হয়েছে। তার ফল: নম্বর-বিভ্রাট, পুনর্মূল্যায়নে ধরা পড়েছে উত্তরপত্রের অস্পষ্ট স্ক্যানিং, এর উত্তরপত্র ওর ঘাড়ে চেপে বসার মতো চূড়ান্ত অপেশাদার কাজ।

প্রস্তুতিহীনতা, অপেশাদারি মনোভাব ছাপিয়ে দুর্নীতিই সর্ষের ভিতরে আসল ভূত কি না, এই প্রশ্ন অমূলক নয়। সে-প্রশ্ন উঠেও এসেছে, এবং সবচেয়ে বড় কথা, প্রচারমাধ্যমের পাশাপাশি তা করেছে ভুক্তভোগী ছাত্রছাত্রীরা: রাজপথে বিক্ষোভে, সমাজমাধ্যমে। আশ্চর্যের কথা, কেন্দ্রীয় সংস্থা বা বোর্ড পরিচালিত পরীক্ষার নানা ত্রুটি তুলে ধরার জন্য তাদের বিরুদ্ধে ধেয়ে এসেছে ‘পাকিস্তানি’ বলে বিদ্রুপ, ‘ডিপ স্টেট’ তত্ত্ব, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের নালিশ। নিট-কেলেঙ্কারি নিয়ে প্রশ্ন তোলা শিক্ষকের কোচিং সেন্টারে হামলা হয়েছে বিহারে, গোলাগুলিও বাদ থাকেনি। কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রক পরিচালিত পরীক্ষার যত ত্রুটিই থাক তা নিয়ে প্রশ্ন করা চলবে না, তার ভুল ধরালেই তা কেন্দ্রীয় সরকার তথা রাষ্ট্রের বিরোধিতার শামিল, বিরোধী দলনেতা ছাত্রদের পাশে দাঁড়ালে শাসক দল তাতে শুধুই রাজনীতির রং দেখবে, এই কি ভবিতব্য? সরকারি সংস্থার উন্নত পরিকাঠামো থাকা সত্ত্বেও কেন শিক্ষার্থীদের বার বার এই দুরবস্থায় পড়তে হচ্ছে, ছাত্ররা যদি কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীকেই এ-প্রশ্ন না করতে পারেন, তবে তা দুর্ভাগ্যের। এই পরিস্থিতিই জন্ম দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি-র মতো প্রতিবাদী অস্তিত্বের, আজ দিল্লিতে যাদের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান বিষয় পরীক্ষাব্যবস্থার এই অসঙ্গতিই। এত কিছু হয়ে চলেছে, অথচ কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর তরফে লক্ষ লক্ষ উদ্বিগ্ন ছাত্রছাত্রীকে আশ্বস্ত করার কোনও বার্তা শোনা যায়নি, নীরব প্রধানমন্ত্রীও। শিক্ষাক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দক্ষতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে ছাত্রসমাজের প্রশ্নের উত্তর তবে কারা দেবেন!

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

NEET Exams CBSE Board

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy