বিদ্যাসাগর সেতুর নীচে ব্যস্ত সকালে বছর ছয়েকের গুড়িয়া খাতুনের যে ভাবে মৃত্যু হল, তাকে শুধুই নিয়তি বা ভয়াবহ কোনও দুর্ঘটনার আওতায় ফেলা যায় না। এ হল নগরজীবনের গভীরে চারিত বৈষম্য ও প্রশাসনিক ঔদাসীন্যের প্রত্যক্ষ পরিণাম, যা বারে বারে প্রকাশ্যে এসেছে ও আকস্মিক জীবনহানির কারণ হয়েছে। গুড়িয়ার বাবা দিনমজুর, পথবাসী এই শিশুটি ফুটপাতে খেলছিল। প্রায় ৩০ মিটার উপর থেকে বাতিস্তম্ভের একটি আলো খুলে তার মাথায় পড়ে যায়। জানা গিয়েছে, যে আলো মজবুত তিনটি নাটে আটকে থাকার কথা, তা কার্যত মাত্র একটি নাটে আটকে ছিল। এমনকি, অকুস্থলেই আর একটি নাট মেলে— অর্থাৎ, দিনের পর দিন একটি মৃত্যুফাঁদ পথচলতি মানুষের মাথার উপর ঝুলছিল, স্থানীয়রা লক্ষ করলেও দায়িত্বপ্রাপ্তদের তা নজরে এল না, এলেও গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি। ফলে, এমন একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গেল যা সহজেই এড়ানো যেতে পারত।
এই অবহেলা কোনও বিচ্ছিন্ন প্রবণতা নয়। রক্ষণাবেক্ষণের ত্রুটি কতখানি বিপজ্জনক, সাম্প্রতিক অতীতের বিবিধ মানবসৃষ্ট দুর্ঘটনা, যেমন উড়ালপুল ভেঙে পড়া, ম্যানহোলে পড়ে মৃত্যু, হাসপাতালের লিফ্ট পড়ে মৃত্যু, বিমানবন্দরের লিফ্ট আছড়ে পড়ে কর্মী জখম হওয়ার ঘটনাগুলি তার সাক্ষী। প্রতিটি ঘটনার পরে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়, ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়, কিন্তু মৌলিক সমস্যা নিরসনের অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার ও ঔদাসীন্যের সংস্কৃতি প্রতিকারের উদ্যোগ দেখা যায় না। বারে বারে দেখা গিয়েছে যে শহরকে ঢেলে সাজাতে, নতুন প্রকল্প ঘোষণায়, স্মার্ট সিটি ইত্যাদির আড়ম্বরেই যত উৎসাহ, পুরনো পরিকাঠামোগুলির নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষায় সেই অনীহাই রয়ে যায়। যে কোনও বড় কাঠামোকে নিরাপদে রাখতে নিরবচ্ছিন্ন পরিদর্শন ও সন্দেহমাত্র মেরামতিতে জোর দেন প্রযুক্তিবিদরা। যেমন, এই ধরনের উঁচু বাতিস্তম্ভ সরল নির্মাণ নয়, এগুলি ক্রমাগত বাতাসের চাপ, কম্পন সামলায়, রয়েছে স্বাভাবিক ক্ষয়জনিত কারণও। নির্দিষ্ট সময় অন্তর এগুলি নামিয়ে রং দেওয়া, নাটগুলি শক্তপোক্ত করে আটকানো, কাঠামোর নিরীক্ষণ অত্যাবশ্যক।
রক্ষণাবেক্ষণের কাজ নিয়মিত হয়েছে কি না, তার নির্দিষ্ট উত্তরের পরিবর্তে কেবলই এই রাষ্ট্রের মজ্জাগত দায় ঠেলাঠেলির সংস্কৃতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এই রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কার, তা নিয়ে এইচআরবিসি সংস্থা ও পূর্ত দফতর উভয়েই মন্তব্য করেনি। অর্থাৎ, বহু সরকারি ও সরকারপোষিত সংস্থা দায়িত্ব ভাগ করলেও তাদের মধ্যে সুষ্ঠু সমন্বয়, যোগাযোগ ও স্পষ্ট দায়বদ্ধতা নেই। এই অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, অব্যবস্থার কড়া মাসুল দেন প্রান্তিক গোষ্ঠীর মানুষ। ফুটপাতই তাঁদের ঠিকানা, গতিশীল গাড়িপূর্ণ, খোলা ড্রেনে ভরা সড়কই তাঁদের সন্তানদের খেলাঘর। তাঁদের অস্তিত্বকে প্রশাসন মূল্য দেয় না বলেই কি অধিকার, নিরাপত্তা নিয়েও মাথাব্যথা নেই? এই সঙ্কট থেকে রক্ষা পেতে অবিলম্বে, জরুরিকালীন ভিত্তিতে সমস্ত বাতিস্তম্ভ, সেতু, উড়ালপুল, লিফ্ট ও অন্যান্য পরিকাঠামোর নিরীক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ নথি প্রকাশ্যে আনা আবশ্যক। যাঁদের অবহেলায় এই মৃত্যু, সেই ঠিকাদার, প্রযুক্তিবিদদের চিহ্নিত করে বিচারের সম্মুখীন করা প্রয়োজন। দায় গ্রহণের বাধ্যবাধকতা তৈরি না হলে দুর্ঘটনাও থামবে না।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)