কেন্দ্রীয় সরকার দেশ জুড়ে কৃষকদের ডিজিটাল পরিচয়পত্র চালু করার প্রকল্প চালু করলেও, এত দিন রাজ্য সরকার তাতে যোগ দেয়নি। রাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরে এ বার সেই প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে সম্প্রতি ঘোষণা করলেন কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিংহ চৌহান। ২০২৪-এর সেপ্টেম্বর থেকে নরেন্দ্র মোদী সরকারের চালু ‘ডিজিটাল এগ্রিকালচার মিশন’-এর অন্তর্গত দেশের কৃষকদের ডিজিটাল পরিচয়পত্র তৈরির কাজ শুরু হয়। এই প্রকল্পের লক্ষ্য, একটি সমন্বিত কৃষক-কেন্দ্রিক ডিজিটাল ও প্রযুক্তি পরিকাঠামো প্রতিষ্ঠা করা, যা সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষকদের কল্যাণে তথ্যপ্রমাণভিত্তিক নীতি প্রণয়নে সাহায্য করবে।
আর্থিক লেনদেন থেকে কৃষি— বিবিধ ক্ষেত্রেই এখন ডিজিটাল প্রক্রিয়ার উপরে জোর দিচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার। তবে, দেখা গিয়েছে যে, ‘ডিজিটাল এগ্রিকালচার মিশন’-এর অধীনে ভারতের কৃষকদের জন্য ডিজিটাল পরিচয়পত্রগুলি কৃষিক্ষেত্রে মৌলিক সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ, যে-হেতু এগুলি কৃষকের পরিচয়কে প্রকৃত চাষাবাদের পরিবর্তে আইনগত ভাবে জমির মালিকানার সঙ্গে যুক্ত করে। ফলে, ব্যবস্থাটি কাঠামোগত ভাবে বর্গাচাষি, ভাগচাষি এবং ভূমিহীন শ্রমিকদের উপেক্ষা করে, যাঁরা প্রকৃত কাজটি করলেও সংশ্লিষ্ট জমির মালিক নন। ভূমির নথিতে তাঁদের নাম না থাকায় ডিজিটাল তথ্যভান্ডারে তাঁদের নাম ওঠে না। ডিজিটাল আইডির প্রধান আকর্ষণ হল সার ভর্তুকি, পিএম-কিসান এবং শস্য বিমা-সহ প্রত্যক্ষ সুবিধা হস্তান্তর (ডিবিটি)-এর কার্যক্রমকে সুগম করা। তথ্যভান্ডারে নাম না থাকার দরুন কৃষকেরা, যাঁরা প্রকৃতপক্ষে বীজ কেনেন, শ্রমের খরচ বহন করেন এবং ফসলের ক্ষতির শিকার হন, শেষ পর্যন্ত বঞ্চিত হন। পাশাপাশি, প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ এবং কিসান ক্রেডিট কার্ড (কেসিসি) পেতে ব্যাঙ্কগুলি জমির জামানত চেয়ে থাকে, যে শর্ত জমিহীন বর্গাচাষি বা ভাগচাষিরা পূরণ করতে পারেন না। নিরুপায় হয়েই তাই তাঁদের মহাজনদের খপ্পরে পড়তে হয়। অন্য দিকে, ডিজিটাল পরিচয়পত্র ব্যবস্থা ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় গ্রামীণ পরিকাঠামোরও প্রায়শই অভাব দেখা যায়। স্মার্টফোনের স্বল্প ব্যবহার, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ এবং ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব কৃষি-শ্রমিকদের কাছে এই প্রক্রিয়াকে এক বোঝায় পরিণত করে।
গ্রামীণ শ্রমজীবী সম্প্রদায়ের দুর্বলতম অংশটিকে সুরক্ষা দিতে চাইলে সবাইকে ডিজিটাল দুনিয়ায় নিয়ে আসার আকাঙ্ক্ষাটি ত্যাগ করে মজুরির নিশ্চয়তা, সামাজিক সুরক্ষা এবং সরাসরি আয় সহায়তার উপরে গুরুত্ব দিতে হবে। যেমন, বর্গাচাষিদের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য ইজারা কাঠামো এবং রাজ্য-স্তরের আইন এমন করা হোক যাতে তাঁরা আনুষ্ঠানিক ঋণ এবং শস্য বিমা পাওয়ার সুযোগ পান। আবার, কৃষিহীন মরসুমে বাধ্যতামূলক অভিবাসন রোধ করতে আরও বেশি নিশ্চিত কর্মদিবস এবং উচ্চতর ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করা দরকার। একই ভাবে ওড়িশার ‘কালিয়া’র মতো কল্যাণমূলক প্রকল্প তৈরি করা যেতে পারে, যা মূলত ভূমিহীন কৃষি-শ্রমিক বা ভাগচাষিদের জীবিকা নির্বাহের জন্য নগদ সহায়তা প্রদান করবে। প্রকৃত সুবিধাপ্রার্থীরা সরকারি নীতির সুবিধা না পেলে, শুধু ডিজিটাল প্রক্রিয়াকরণে কাজ হবে না।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)