E-Paper

হৃদয়ের মেরামতিতে মেলে নতুন জীবন

অ্যাঞ্জিয়োপ্লাস্টি, বাইপাস... হৃদ্‌যন্ত্রের শল্যচিকিৎসার নামেই আতঙ্কিত? এগুলোই কিন্তু রোগীকে স্বাভাবিক ও দীর্ঘ জীবন ফিরিয়ে দিতে পারে

চিরশ্রী মজুমদার 

শেষ আপডেট: ০৬ জুন ২০২৬ ০৬:৩৮

সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মধ্যে হার্ট নিয়েই সবচেয়ে চিন্তিত থাকেন সাধারণ মানুষ। হৃৎপিণ্ডের নানা চিকিৎসা নিয়ে বিভ্রান্তিও রয়েছে। বিশেষত চিকিৎসক স্টেন্ট বসানো, ওপেন হার্ট সার্জারির মাধ্যমে হৃদয়ের মেরামতির পরামর্শ দিলে অনেকে মুষড়ে পড়েন। ভাবেন, জীবন আর আগের মতো থাকবে না, আয়ু কমবে। অথচ এই সব চিকিৎসাপদ্ধতির মাধ্যমে হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যা সামলে অনেকেই সুস্থ রয়েছেন, নবজীবন পেয়েছেন। অ্যাঞ্জিয়োপ্লাস্টি, স্টেন্ট বসানো, বাইপাস পদ্ধতিগুলি কী ভাবে রোগীকে বড় বিপদ থেকে বাঁচায়, বুঝিয়ে বললেন সিনিয়র ইন্টারভেনশনাল কার্ডিয়োলজিস্ট ডা. মনোতোষ পাঁজা।

কখন হয় অ্যাঞ্জিয়োপ্লাস্টি?

যদি রোগী বুকে ব্যথা নিয়ে আসেন, তবে লক্ষণ বুঝে ইসিজি ইত্যাদির দ্বারা রোগ নির্ণয় করার পর চিকিৎসক তাঁকে ওষুধ দেন। তার পর অ্যাঞ্জিয়োগ্রাফি করতে বলা হয়। তবে বুকে ব্যথা হোক বা না হোক বয়স হলে, আনুষঙ্গিক রোগব্যাধি থাকলে রুটিন অ্যাঞ্জিয়োগ্রাফি অপরিহার্য। ডা. পাঁজা বললেন, “এটি কিন্তু চিকিৎসা নয়, রোগনির্ণয়ের পরীক্ষা, যার মাধ্যমে দেখা হয় আদৌ আর্টারি বন্ধ আছে কি না, বন্ধ থাকলে তা কতটা বন্ধ আছে। পরীক্ষার ফলের উপরে নির্ভর করবে জীবনশৈলী কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কিন্তু আর্টারিতে, বিশেষত প্রধান ধমনিতে ব্লকেজের পরিমাণ উদ্বেগজনক হলে মুশকিল। যে কোনও সময়ে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। লেফট অ্যান্টিরিয়র ডিসেন্ডিং আর্টারিতে জটিল ব্লকেজ থাকলে আকস্মিক মৃত্যুও হতে পারে। তা ছাড়া, তৃতীয় আর্টারি বা ডান দিকের ধমনিতেও বাধা থাকলে চলবে না। সমস্ত আর্টারিতে ব্লক পেলে বাইপাস করা হয়। আর্টারিতে অনেকখানি ক্যালসিয়াম জমে গেলেও বাইপাস করলে ফল ভাল হয়।”

দু’-এক জায়গায় ব্লক থাকলে সেখানে বেলুন দিয়ে চাপ তৈরি করলে জমা ক্যালসিয়াম, চর্বি সরিয়ে রাস্তা তৈরি করা হয়। এটাই অ্যাঞ্জিয়োপ্লাস্টি। তার পর ড্রাগ কোটেড স্টেন্ট দেওয়া হয়। স্টেন্টের ক্ষেত্রে ধাতব উপাদান থাকার ফলে জটিলতা হলেও হতে পারে। ডা. পাঁজা জানালেন, এখন ব্লক সরানোর পরে কোনও কোনও ক্ষেত্রে (যেখানে ধমনি সরু, আগে অ্যাঞ্জিয়োপ্লাস্টি হয়েছিল) ড্রাগ কোটেড বেলুন (বেলুনের উপর ক্যানসারের ওষুধ লাগানো থাকে) দেওয়া হয়। এতে করোনারি থ্রম্বোসিস (রক্ত জমাট বাঁধা), ব্লক, হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা অনেক কমে। এখন ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি চলছে।

স্টেন্ট বসানোর সময় আর্টারি বেশি খুলে গেলে ছিঁড়ে গিয়ে ‘পারফোরেশন’ হতে পারে। তবে এটি বিরল ঘটনা।

বাইপাস ও পেসমেকার বিষয়ে

বাইপাস জটিল পদ্ধতি। ওপেন হার্ট বা বুক কেটে বাইপাস করতে হয়। প্রধান আর্টারিতে অনেকটা ব্লক থাকলে বুক চিরে হার্টের সার্জারি হয়। এ ক্ষেত্রে শরীরের অন্য জায়গার শিরা বা ধমনি এনে রুগ্ণ হার্টের ব্লক হওয়া অংশকে এড়িয়ে রক্তচলাচলের নতুন রাস্তা তৈরি করা হয়। ওপেন হার্ট পদ্ধতিতে আরও বেশ কিছু চিকিৎসা করা যায়। যেমন কিছু টিউমার অপসারণ, হার্টের ভাল্ভ সারানো বা পাল্টানো, জন্মগত হৃদ্‌রোগের চিকিৎসা ইত্যাদি। বাইপাসের ক্ষেত্রে অন্তত দশ দিন হাসপাতালে থাকতে হয়। রক্তচাপ, শর্করার সমস্যা থাকলে জটিলতা হতে পারে, হৃদয়ের পাম্প করার ক্ষমতা দুর্বল হলে আরও জটিলতা হতে পারে।

রক্তচলাচলে সমস্যা হলে হার্ট অ্যাটাক, করোনারি থ্রম্বোসিস, হার্ট ফেলিয়োর হয়। হার্টের ইলেকট্রিসিটি বা নিজস্ব বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা আছে যা হৃদ্স্পন্দন নিয়ন্ত্রণ করে। সেখানে কোনও সমস্যা দেখা দিলে ছোট্ট যন্ত্র পেসমেকার বসাতে হয়। এটি প্রয়োজনমতো বৈদ্যুতিক সঙ্কেত পাঠিয়ে হার্টের গতি ঠিক রাখে।

হার্ট ফেলিয়োরও সামলানো যায়

হার্ট ফেলিয়োর শুনলেই অনেকে ভাবেন এতে বোধহয় হার্টের কাজ একেবারে বন্ধ হয়ে গেল। ডা. পাঁজা বললেন, এতে আসলে হার্ট পাম্প করার ক্ষমতা কমে যাওয়ার সমস্যাকে বোঝানো হয়। হার্টের পাম্প করার ক্ষমতা সাধারণত মিনিটে ৬০-৭০ বার। সেটা ২০-৪০-এর মধ্যে গেলে হার্ট ফেলিয়োর হয়। এ ক্ষেত্রে নানা ধরনের ওষুধ দিয়ে অবস্থা সামাল দেওয়া হয়। শ্বাসকষ্ট শুরু হলে উপশমের জন্য নির্দিষ্ট ওষুধ দেওয়া হয়। করোনারি ডিজ়িজ়, রক্তচাপ, ডায়াবিটিস, কিডনি ফেলিয়োর, হার্টের ভাইরাস সংক্রমণ, থাইরয়েড, হৃদ্‌রোগের কারণে হার্ট ফেলিয়োর হয়ে যায়। তবে চিকিৎসা এখন খুব উন্নত। ওষুধেই রোগীর আয়ু বহু দিন বাড়ানো যায়।

স্টেন্ট বসানো, বাইপাসের পরেও যদি হার্টের মধ্যে রক্ত সঞ্চালন ঠিক না হয়, তবে পুষ্টির অভাবে হৃৎপিণ্ডের মাংসপেশি পচে যায়। এ ধরনের ফেলিয়োরের ক্ষেত্রে ওষুধপত্র, নানা যন্ত্র বসিয়েও যদি সমস্যা নিয়ন্ত্রণ না করা যায়, তবে হৃদ্‌যন্ত্র প্রতিস্থাপনের কথা বলেন চিকিৎসক।

কতটা ঝুঁকি ও কেমন খরচ

এই চিকিৎসাগুলির উদ্দেশ্যই হল জীবনের মান ও দৈর্ঘ্য বাড়ানো। ফলে, চিকিৎসার নাম শুনে ভয় পেলে চলবে না। অন্যান্য আনুষঙ্গিক অসুখ থাকলে চিকিৎসক সব দিক বিবেচনা করেই চিকিৎসাপদ্ধতি স্থির করবেন। কিন্তু সব দিক দিয়েই ব্যর্থতা এলে অবশ্যই বিপদ। সাধারণত অনিয়মিত হৃদ্স্পন্দন, হার্ট ফেলিয়োর হয়ে গেলে হার্ট অ্যাটাকের ভয় বাড়ে ও চরম ঘটনা ঘটতে পারে। তাই এ নিয়ে সতর্ক থেকে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।

এ ধরনের চিকিৎসার পর কিছু ক্ষেত্রে ধকল নেওয়ার ক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে। তাই কাকে কোন নিয়ম মানতে হবে, কী ধরনের পরিশ্রম এড়িয়ে চলতে হবে তা চিকিৎসকের কথা মতো মেনে চলতে হবে।

আর্টারির অবস্থা অনুযায়ী অ্যাঞ্জিয়োপ্লাস্টির খরচ নির্ণীত হয়। ২-৪ লক্ষ টাকা খরচ হতে পারে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। তবে নানা সরকারি রাষ্ট্রীয় প্রকল্পের আওতায় এগুলি নিখরচায় হয়। বাইপাসের ক্ষেত্রে তিন লক্ষ টাকা খরচ হতে পারে। ভাল পেসমেকারের খরচ গড়ে আড়াই-তিন লক্ষ টাকা। বিভিন্ন প্রকল্প, স্বাস্থ্যবিমার আওতায় প্যাকেজ নিলে খরচ কম হবে।

কোমর্বিডিটি সামলাতে পারলে ও নিয়মে থাকলে অ্যাঞ্জিয়োপ্লাস্টি, বাইপাসের ক্ষেত্রে রোগী স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। হৃৎপিণ্ডে স্টেন্ট বসছে বা বাইপাস করতে হবে মানেই জীবন ফুরিয়ে গেল— এই ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং এই চিকিৎসাগুলিই রোগীকে সুস্থ জীবন উপহার দেয়। হৃদ্‌রোগের চিকিৎসায় সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয়, অকারণ ভয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করা।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Angioplasty Pacemaker Bypass

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy