রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তথা শিল্পী রজত সেনের একটি একক প্রদর্শনী সম্প্রতি হয়ে গেল চারুবাসনা গ্যালারিতে। পেন্টিং-এ মাস্টার্স করার সময়ে শিল্পী পার্থপ্রতিম দেবের সান্নিধ্যলাভ করেন রজত। তাঁরই অনুপ্রেরণায় শিল্পের কঠিন পথের দিশা খুঁজে পান এবং শিল্প সম্পর্কে গভীর ভাবে ভাবতে শেখেন। রজতের পছন্দের শিল্পী মুম্বইয়ের ভি.এস.গায়তোন্ডে। এ ছাড়াও বিংশ শতাব্দীর গোড়ার আমেরিকান অ্যাবস্ট্রাক্ট এক্সপ্রেশনিস্ট জ্যাকসন পোলোকের ছবিও তাঁর পছন্দের। আর ভালবাসেন জাপানি জেন পেন্টিং। পিকাসোর কথা ‘প্রকৃতিই শিল্পীর আসল অনুপ্রেরণার উৎস’— এই ভাবনায় বিশ্বাস রেখে ছবি আঁকেন রজত সেন।
নিজের প্রথম একক প্রদর্শনী ২৯টি কাজ দিয়ে সাজিয়েছেন শিল্পী। কাজগুলোকে তিনি বিমূর্ত ল্যান্ডস্কেপ বা ভূদৃশ্য বলেই পরিচয় দিতে চান। শিল্পীর কাজের ধরন বেশ আলাদা। তিনি হয়তো কোনও পরিচিত ফর্ম বা আকার থেকে শুরু করেন। সেটা বাড়িঘর বা পাহাড় বা প্রাণীর অংশমাত্র। তাঁর মন-সংগৃহীত একটি গঠন মাত্র। তারপর সেই আকারটুকু সম্বল করে মনের গহিনে ডুব দিয়ে একটা প্রক্রিয়া নিয়ে কাগজে ফেলেন। তারপর যা হয়, সেগুলো ভিতর থেকে নিঃসৃত হতে থাকে। কগনিটিভ ইন্টেলিজেন্স ছাড়াও সারা জন্মের অভিজ্ঞতা, চিন্তাভাবনা শিল্পীর ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে চালিত হতে থাকে। পরিবেশের প্রভাবে শিল্পীর জ্ঞানমূলক যে বিকাশ, সেটিই কগনিটিভ ইন্টেলিজেন্স। এই বুদ্ধিমত্তাকে রজত সেন ঠিক ‘অন্তর্দৃষ্টি’ বলে আখ্যায়িত করতে চান না। এই বুদ্ধিমত্তা যখন মাসল মেমরির সঙ্গে মেলে, তখন সৃষ্টির উদ্ঘাটন হয়। যে স্মৃতি একেবারে শিশুকাল থেকে সমস্ত জীবন, হয়তো বা পূর্ব জন্মেরও, মানুষের মনের আনাচকানাচে থেকে যায়, তাই তো মাসল মেমারি। কোনও দিন সে স্মৃতি মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে না।
শিল্পী অত্যন্ত সুন্দর ভাবে নিজের কাজের প্রণালী বোঝাতে পারেন। সম্ভবত বহু বছর শিক্ষকতা করছেন বলেই। রজত সেনের কাজের স্বতন্ত্রতা হচ্ছে, আকারের আভাস আছে ছবিতে, কিন্তু তার পরে সেগুলো হয়ে যায় নিরাকার। আবার সেই ইঙ্গিতগুলোকে খানিক উস্কে দিয়ে কিছুটা শুদ্ধতা আনেন তিনি প্রত্যেকটি কাজে। কাজগুলোয় বেশ মজা বা চাঞ্চল্য আছে। কাজের মিডিয়াম গাম টেম্পেরা। এইসব কাজ তিনি সম্পন্ন করেন অনেক স্তরে। নানা ভাবে প্রলেপ দিয়ে, আবার তাকে ধুয়ে ফেলেন। বিভিন্ন স্তরে রঞ্জক পদার্থের সঙ্গে নানা রকম আঠার মিশ্রণ। সেই আঠা আবার এক রকম নয়। কখনও জলে-দ্রাব্য, কখনও স্থিরকারী। শেষে সেই প্রতিকৃতি যখন পছন্দের হয়, তখন তাকে স্থিরতা দেন শিল্পী। শিল্প যেখানে সূক্ষ্ম স্তরে পৌঁছে ব্যক্তিগত আলাপচারিতা করতে সক্ষম হয় দর্শকের সঙ্গে।
রজত সেন সারাজীবন প্রভূত পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তার মধ্যে বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য ১৯৯৯ সালে পশ্চিমবঙ্গের সর্বশ্রেষ্ঠ মিশ্র মাধ্যমের ছবির জন্য অ্যাকাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্তি। এ ছাড়াও ২০০২ সালে নীরদবরণ স্মৃতি পুরস্কার পেয়েছেন, এম.ভি.এ পরীক্ষায় একটি বিশেষ ছবির জন্য। তিনি দেশ-বিদেশের বহু দলীয় প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছেন। ২০০৭ সালে জাপানের ফুকুশিমা বিয়েনেলে যোগদান এবং ২০১০-এ ঢাকা শহরের রেডিয়াস সেন্টারে, পরে ২০১১ সালে রবীন্দ্রভারতীর শিক্ষকদের সঙ্গে ঢাকা আর্ট সেন্টারে একটি দলীয় প্রদর্শনীতে যোগ দেওয়া ছাড়াও একাধিক শো করেছেন। যদিও ‘ভেল্ড ফর্মস অব দ্য অ্যাবিস’ ছিল তাঁর জীবনের প্রথম একক প্রদর্শনী।
শিল্পী এবং শিক্ষক রজত সেনের ছবিতে ব্যাপক ভাবে অন্ধকারকে অনুভব করতে হয়। কারণ তাঁর কাছে সৃষ্টির মূলে আছে অন্ধকার। সেই অন্ধকার আদি। সে অন্ধকার ইতিবাচক ও নিশ্চিত। কারণ অন্ধকারের অতল থেকে আলোর কম্পন অনুভব করা সম্ভব। অন্ধকারের ভিতরেই আছে মাটির নীচে চোরাস্রোতের মতো আলোর উৎস। আলোর এই অন্তঃপ্রবাহ শিল্পীর ভাব বা প্রবণতার প্রকাশ।
‘ভেল্ড ফর্মস অব দ্য অ্যাবিস’ সিরিজ়ের এই সব ছবি মানুষের মনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে চায়। প্রায় প্রত্যেকটি ছবিতে উঠে এসেছে আদিম প্রাচীন এক আকৃতি। তার সঙ্গে কোনও বাস্তব জিনিসের মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন। কারণ তা তো মনের অতল গহ্বর থেকে উঠে আসা এক চিত্রকল্প। স্মৃতিদুনিয়া এবং নিস্তব্ধতার মধ্যে শিল্পীর মনের অন্দরে যে কথোপকথন চলে, তারই পরিণতি এই সব ছবি। কোথাও যেন বহু কালের অদেখা অর্ধ-আবিষ্কৃত রহস্যময় এক আকার। যেখানে দর্শক মাটির রং, অমসৃণ টেক্সচার এবং স্ক্র্যাচড পৃষ্ঠতল দেখছেন, শিল্পী সেখানে দেখাতে চাইছেন কালের ক্ষয়ক্ষতি।
রজত সেনের কাজগুলো অদ্ভূত এক শান্ত অথচ চাপা উত্তেজনা সৃষ্টি করে। ভারী অন্ধকারের বুক চিরে যেন লাল রঙের উজ্জ্বলতা বা আলোর ঝলকানি— মনে হয়, নীরবতা ভেঙে কীসের যেন আবির্ভাব! প্রত্যেকটি দাগ বা চিহ্ন কোথাও প্রাচীন পুঁথির সামান্য অংশবিশেষ, কোথাও সেগুলো ভঙ্গুর। এই আকার যেন স্থির নয়, সব সময়ে গতিশীল, সর্বদা অরক্ষিত। আসলে এই ‘ভেল্ড’ ফর্মগুলোর কোনওটিই তো বাইরের জগতের নয়। বরং শিল্পীর অন্তরে চলা অভ্যন্তরীণ সংলাপ। স্মৃতিবিধুরতা, নীরবতা এবং হারানো ক্ষয়ক্ষতির মিলিত এই সংলাপ কিন্তু আলো ও আশার প্রতীক।
রজত সেনের প্রত্যেকটি ছবি নিয়ে আলাদা করে আলোচনা সম্ভব নয়। হয়তো সেই কারণেই তিনি প্রত্যেকটির আলাদা শিরোনাম রাখেননি। এই বিমূর্ত চিত্রকল্প শিল্পীকে ভবিষ্যতে কোন নতুন পথে চালিত করবে, তার অপেক্ষায় থাকবেন শিল্পরসিক।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)