ঠিক দু’মাস আগে দেশের বিভিন্ন অকংগ্রেসী এবং বিজেপি-বিরোধী শিবির থেকে আওয়াজ উঠেছিল, লোকসভা ভোটে ‘ইন্ডিয়া’ মঞ্চের রাশ ধরবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই। ঠিক এক মাস আগে সংসদের বিশেষ অধিবেশনে লোকসভার পুনর্বিন্যাস এবং মহিলা সংরক্ষণ সংক্রান্ত সংশোধনী বিলটিকে ভোটাভুটিতে পরাজিত করতে অকংগ্রেসি দলগুলিকে কার্যত নেতৃত্ব দিয়েছিল তৃণমূল।
আসন্ন বর্ষাকালীন অধিবেশনের আগে সেই তৃণমূল অসুখী সংসার, হতশ্রী। রাজনৈতিক শিবিরের মতে, দোষারোপ, প্রকাশ্য বিষোদ্গার, শাসক দলের সঙ্গে একটি বড় অংশের যোগাযোগ রেখে চলার খবর সামনে আসায় এই ছন্নছাড়া ভাব তৈরি হয়েছে। সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও উপস্থিতির হার কমছে। আসন্ন অধিবেশনে দলের অনেকেই ছুটি নিতে পারেন নানা কারণ দেখিয়ে, সেই সম্ভাবনাও অগ্রাহ্য করা যাচ্ছে না। এক মাস আগেই যাঁরা নয়াদিল্লিতে প্রায় ছিলেন চালকের ভূমিকায়, এখন তাঁরা কোনও মতে অস্তিত্বরক্ষা করছেন।
দলের পরাজয়ের পর লোকসভায় তৃণমূলের মুখ্য সচেতকের পদ থেকে কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে সরিয়ে ফের কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে এনেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দৃশ্যতই বিদ্রোহী কাকলি দলের সব পদ ছেড়েছেন এবং কল্যাণের বিরুদ্ধে মৌখিক হেনস্থার অভিযোগ তুলে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে চিঠি দিয়েছেন। সোমবার কাকলির চিঠি নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন স্পিকার। অভিযোগপত্রটি সংশ্লিষ্ট হাউস কমিটিতে পাঠানোর কথা।
কল্যাণের পাল্টা বক্তব্য, ‘‘২০১১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত আমি সংসদীয় দলের মুখ্য সচেতক পদে ছিলাম। মাঝখানে কয়েক মাস ওই দায়িত্বে ছিলাম না। ওঁর (কাকলির) আবার কিসের এত কথা? নারদে তো আমি পাঁচ লক্ষ টাকা নিইনি। উনি নিয়েছেন।” সূত্রের খবর, স্পিকারকে পাল্টা চিঠি দেওয়ার কথা ভাবছেন কল্যাণ। কল্যাণের বক্তব্য, “নারদে উনি ৫ লক্ষ টাকা নিয়েছিলেন, তা নিয়ে সিবিআই চার্জশিট দিয়েছে। তদন্তের জন্য অনুমোদন চাওয়া হয়েছিল স্পিকারের কাছে। সেই অনুমোদন যাতে দেওয়া হয়, সেই আবেদন জানাব।” কল্যাণের অভিযোগ, সিবিআই চার্জশিট ফাইল করা সত্ত্বেও স্পিকার অনুমোদন দেননি। কাকলির মুখের ভাষারও সমালোচনাকরেছেন তিনি।
কাকলির কথায়, “আর কত অপমান সহ্য করা যায়! উনি বলছেন আমি সিন্ডিকেটের নেত্রী, চোর, মুখের ভাষা খারাপ। এতে শুধু আমি নই, আমার পরিবার দুঃখিত এবং অপমানিত হয়েছে। ওঁকে প্রমাণ দিতে হবে তা না হলে মানহানির মামলা করব।” কাকলির কথায়, “একটা জায়গায় পৌঁছনোর পর মনে হল নিজের প্রতি অন্যায় করছি, উনি যে সব মহিলার প্রতি দুর্ব্যবহার করে থাকেন, তাঁদের প্রতিও। তাই স্পিকারকে চিঠি লিখতে বাধ্য হলাম।”
রাজ্যসভায় তৃণমূলের প্রবীণ সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায় ফলাফল প্রকাশের পর একাধিকবার দলের দুর্নীতি এবং আরজি কর কাণ্ডে ভূমিকার প্রসঙ্গ তুলে কড়া সমালোচনা করেছেন। লোকসভার তৃণমূল সাংসদদের মধ্যে অন্তত জনা দশেক বিজেপি-র সঙ্গে যোগাযোগে রয়েছেন, এমন অভিযোগও আসছে দলের অভ্যন্তর থেকেই। তবে তাঁদের সাংসদ পদের মেয়াদ যেহেতু ’২৯ সালের গোড়া পর্যন্ত বাকি রয়েছে তাই এখনই দলত্যাগ বিরোধী আইনের কোপে পড়ে পদ খোয়াতে চাইবেন কি না কেউ, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। দেব অধিকারী কখনই উপস্থিত থাকতেন না অধিবেশনে, সে ব্যাপারে দলের সঙ্গে তাঁর অলিখিত বোঝাপড়া রয়েছে। কিন্তু ফিল্ম বা টেলিভিশন শো-এর সঙ্গে যুক্ত অন্য তৃণমূল সাংসদদের উপস্থিতিও আগামী দিনে সংসদে কমতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তবে সূত্রের খবর, দীর্ঘদিন অনুপস্থিতির পর সংসদে নিয়মিত দেখা যেতে পারে বর্ষীয়ান নেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে, যাঁকে হঠাৎ সরিয়ে লোকসভার নেতা করে দেওয়া হয়েছিল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে। সেই পদ তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়া না হলেও ঘনিষ্ঠ মহলে সুদীপ জানিয়েছেন, অধিবেশনের সময় টানা দিল্লিতে থাকার কথা ভাবছেন তিনি।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)