নির্বাচনী বিপর্যয়ের পরে দলত্যাগ আর বিদ্রোহে রক্তক্ষরণের মধ্যেই দলের প্রধান কর্মসূচি নিয়ে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসে।এ বার ২১শে জুলাই, ‘শহিদ তর্পণ’-এর বার্ষিক কর্মসূচি কী ভাবে এবং কোথায় হবে, সেই আলোচনা শুরু হয়েছে দলের অন্দরে। হাতে সময় থাকলেও এই নিয়ে এখনথেকেই আলোচনা চাইছেন দলীয় নেতৃত্বের একাংশ।
সচিত্র ভোটার পরিচয়পত্রের দাবিতে অনুষ্ঠিত কর্মসূচিই ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক উত্থানের প্রথম ধাপ। বামআমলে ১৯৯৩ সালের সেই কর্মসূচিতে নিহত কর্মীদের (তৎকালীন যুব কংগ্রেস) প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপনেরএই বার্ষিক কর্মসূচিই রাজ্যব্যাপী তৃণমূলকে বেঁধে রেখেছিল। কিন্তু ক্ষমতা হারানোর পরে ভিতরে ও বাইরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে সেই কর্মসূচি নিয়েই নানা আশঙ্কা তৈরি হয়েছে দলে। আনুষ্ঠানিক আলোচনা না-হলেও ঘরোয়া আলোচনায় সে কথা উঠছে। ভোটে পরাজয়ের পরে পঞ্চায়েত ও পুরসভা স্তরে দলত্যাগ, জেলা ও ব্লক স্তরে নেতাদের নিষ্ক্রিয়তা এবং বিধায়ক ও সাংসদদের ‘আত্মসমর্পণে’র যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তাতে এই কর্মসূচি পর্যন্ত দল কোন অবস্থায় থাকবে, তা নিয়েই সংশয়েনেতাদের একাংশ!
রাজ্য স্তরের এক নেতারকথায়, ‘‘শহিদ তর্পণ’ কর্মসূচি তৃণমূলের সাধারণ কর্মী- সমর্থকদের আবেগ। সেখানে ঘাটতি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু ফল প্রকাশের পর থেকে হামলা ও মিথ্যা মামলা চলছে। হাই কোর্ট আদেশ দিলেও কোথাও পুলিশ তা মানছে না। ফলে কী হবে, তা দেখতে হবে।’’
গুরুতর সমস্যাও তৈরি হয়েছে দলত্যাগ ঘিরে। সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বা আইনি ঝামেলা এড়াতে নেতা-কর্মীদের একাংশ দলের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করছেন। তাঁদের মধ্যে সাংসদ, বিধায়ক, সাংগঠনিক পদাধিকারীও রয়েছেন। এইঅবস্থায় রাজ্যব্যাপী প্রচার সংগঠিত করে ধর্মতলার সমাবেশ পর্যন্ত কে কতটা পৌঁছতে পারবেন, তা নিয়েও ভাবছেন অনেকে।
সমাবেশস্থল নিয়েও এখন ভাবতে হচ্ছে তৃণমূলকে। ধর্মতলায় ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে যে জায়গায় তৃণমূলের এই কর্মসূচি হয়, সেখানে এ বার পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক অনুমতি পাওয়া নিয়ে নিশ্চিত নন এই কর্মসূচির ভারপ্রাপ্ত নেতারা। তাঁরা মনে করছেন, এ ব্যাপারে পুলিশের ‘সহযোগিতা’ পাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতায় থাকাকালীন ধর্মতলার ওই জায়গায় অন্য দলের কর্মসূচি নিয়ে বরাবর আপত্তি করেছে তৃণমূলের প্রশাসন। একই জায়গায় সভা করার জন্য বিজেপিকে হাই কোর্ট পর্যন্ত ছুটতে হয়েছিল।ফলে, এ বার শাসক বিজেপিরকাছ থেকে এই অনুমতি পাওয়ামসৃণ হয় কি না, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে তৃণমূলে। মমতা কংগ্রেসে থাকাকালীন ওই কর্মসূচি নিয়েছিলেন। সেই কারণে প্রতি বছর শহিদদের শ্রদ্ধা জানিয়ে এসেছে কংগ্রেস, তবে তাদের কর্মসূচি তৃণমূলের বড় সমাবেশের আড়ালে চলে যেত। এ বার কর্মসূচিকে বড় আকারে পালন করতে শহিদ মিনার ময়দানে সভা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কংগ্রেস।
তৃণমূলের রাজ্য সহ-সভাপতি জয়প্রকাশ মজুমদার অবশ্য বলেন, ‘‘এটা ঠিক যে, এ বার এ সব সমস্যা থাকছে। তবে এখনও অনেক সময় রয়েছে। প্রয়োজনে আমরাও আদালতে যাব।’’
সেই সঙ্গেই জয়প্রকাশের মন্তব্য,‘‘এই কর্মসূচিটি ঠিক দলের বা রাজনৈতিক আর পাঁচটা কর্মসূচির মতো নয়। এটা একটা গণ-আন্দোলনের ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের দিন। তৃণমূল নিশ্চিত ভাবে তা একই গুরুত্বে পালন করবে।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)