কোলাপুরি চপ্পল দিয়ে শুরু হয়েছিল, সেখান থেকে বাঁধনী, ঝুমকো, দোপাট্টা... ভারতীয় কারিগরি সোজা অথবা ঘুরপথে জায়গা করে নিচ্ছে বিশ্বের দরবারে। ভারতীয় তারকা, ফ্যাশন ডিজ়াইনাররা যেমন দেশের শিল্পকীর্তিকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরছেন, তেমনই বেশ কিছু আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড এ দেশের শিল্পকে বিন্দুমাত্র কৃতিত্ব না দিয়ে নিজেদের সম্ভারের সঙ্গী করে নিচ্ছে।
গত বছর মিলান ফ্যাশন উইকে প্রাডার মডেলের পায়ে ছিল কোলাপুরি চপ্পল। প্রাডা সেই চটির দাম রেখেছিল এক লক্ষ ১৬ হাজার টাকা। মহারাষ্ট্রের কোলাপুরে তৈরি সেই চপ্পলের ঐতিহ্যের কথা অবশ্য ইটালীয় ফ্যাশন সংস্থা বেমালুম চেপে গিয়েছিল। সেই ঘটনারই পুনরাবৃত্তি হল এ বছরের প্যারিস ফ্যাশন উইকে। র্যালফ লরেন তাদের ফল ২০২৬ কালেকশনে ঝুমকো পরাল মডেলদের। একেবারেই ভারতীয় ঝুমকো। যদিও র্যালফ লরেন সেখানে আমাদের দেশকে মোটেও স্বীকৃতি দেয়নি। তারা ‘ভিনটেজ অ্যাকসেসরি’ নামে চালানোর চেষ্টা করেছে। এই ব্র্যান্ডই বাঁধনী প্রিন্টের স্কার্ট লঞ্চ করেছে। সেখানেও দেশজ ফ্যাব্রিককে বিন্দুমাত্র কৃতিত্ব দেওয়া হয়নি। সেই সংস্থার ওয়েবসাইটে গেলে দেখা যাবে বাঁধনী প্রিন্টের সেই স্কার্টের মূল্য ৪৪,৮০০ টাকা।
ঝুমকো বা ঝুমকা— যে নামেই ডাকা হোক না ভারতীয় নারীদের অন্যতম প্রিয় গয়না। দক্ষিণ ভারতের দেব-দেবীর গয়না ও মন্দিরের গায়ের ভাস্কর্য থেকেই এই গয়না অনুপ্রাণিত। সেই আদি-অকৃত্রিম ঝুমকোই নানা রূপে বরেলী বাজার থেকে গড়িয়াহাট বাজারে ঢেলে বিকোচ্ছে। আমেরিকান সংস্থাটি তার মডেলদের যে ঝুমকো পরিয়েছিল, তাতে এ দেশীয় কারিগরী স্পষ্ট। সংস্থার লাল-নীল বাঁধনী স্কার্টটি মেশিন-প্রিন্ট। কারণ তাদের পক্ষে জানা সম্ভব নয় কী ভাবে রং তৈরি করে, কাপড়ের নানা জায়গায় গিঁট দিয়ে সময় নিয়ে ওই ফ্যাব্রিক তৈরি হয়। বংশ পরম্পরায় রাজস্থান, গুজরাটের দক্ষ কারিগরেরা তা তৈরিকরে আসছেন। প্রসঙ্গত, বাঁধনীর জিআই ট্যাগও আছে। কিন্তু অনুকরণের পথে তা বাধা হয়নি।
গৌরব গুপ্তর শোয়ের মডেল।
এই প্যারিস ফ্যাশন উইকেই ভারতীয় অলঙ্কার সমাদৃত হয়েছে ফ্যাশন ডিজ়াইনার গৌরব গুপ্তর হাত ধরে। তিনি মডেলকে পরিয়েছিলেন টেম্পল জুয়েলারি। গলার হার, বাজুবন্ধের কারিগরি রীতিমতো হইচই ফেলে দিয়েছে ফ্যাশনমহলে। এক ভারতীয় গয়না বিপণির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ওই শোয়ের সংগ্রহ তৈরি করেছিলেন গৌরব। মডেলকে শাড়ি পরিয়েছিলেন ভিন্ন ড্রেপিংয়ে। সাজিয়েছিলেন জুঁই ফুলের নকল মালা দিয়ে। ভারতীয় ঐতিহ্য, শিল্পকে বিশ্লেষণ করে গৌরব সেখানে ব্যাখ্যা দিয়েছেন কেন এই সাজ তিনি বেছেছেন।
শাড়ি অনেক দিনই আন্তর্জাতিক হয়ে উঠেছে। তবে তা পরার ধরন বদলে গিয়েছে। ড্রেপড ড্রেস নামে বরং বেশি খ্যাত হয়ে উঠেছে সেটি। এ বারের মেট গালা এবং অস্কার্সে দেখা গেল দোপাট্টার দাপট। যদিও পশ্চিমি দুনিয়া সেটিকে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান স্কার্ফ বলে অভিহিত করছে। এ বারের মেটগালায় হেইলি বিবার ওয়াইএসএল-এর ২৪ ক্যারট সোনার বডিসের সঙ্গে গাঢ় নীল শিফন স্কার্ট পরেছিলেন। সঙ্গে ছিল সেই রঙের লম্বা স্কার্ফ। বলতে গেলে ভারতীয় দোপাট্টার অনুকরণ। হেইলির স্কার্ফ পরার ধরনের জন্যই দোপাট্টার তুলনা চলে আসছে। এ বছরের অস্কার্সের ভ্যানিটি ফেয়ার পার্টিতে মডেল বেলা হাদিদ প্রাডার যে অফ হোয়ায়েট পোশাক পরেছিলেন সেখানের স্কার্ফেও রয়েছে দোপাট্টার অনুকরণ। অস্কার্সেরই একটি পার্টিতে কেন্ডল জেনারকে তাঁর কালো টু’পিস পোশাকের সঙ্গে কালো দোপাট্টা সদৃশ স্কার্ফ নিতে দেখা গিয়েছে, ঠিক যেমন ভাবে এত দিন বলিউডের নায়িকারা নিতেন। গায়িকা গার্সিয়া আব্রাম শ্যানেলের টু’পিস ড্রেস ও কালো স্কার্ফ পরেছিলেন সম্প্রতি। পোশাকটিকে ভারতীয় লেহঙ্গার অনুপ্রেরণার ছাপ স্পষ্ট। বহু নামজাদা বিপণি ও ডিজ়াইনার শিফনের তৈরি একরঙা স্কার্ফ নিজেদের সম্ভারে নিয়ে এসেছে ইতিমধ্যেই।
ভারতীয় মাত্রই চান, তাঁদের শিল্প-সংস্কৃতি বর্হিজগতে সমাদৃত হোক, কিন্তু স্বীকৃতিসহ। প্রাডার কোলাপুরি চটি নিয়ে চর্চা হওয়ার পর সংস্থার এক কর্তা কোলাপুরে এসে সেখানকার কাজ দেখে গিয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো ‘হেরিটেজ’ বা ‘ভিনটেজ’ তকমা লাগিয়ে এ ভাবে যেন এ দেশের শিল্পকে নিজেদের আবিষ্কার বলে চালাতে না পারে, তার জন্য পদক্ষেপ করা জরুরি।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)