E-Paper

গরমে ভাল থাকার সহজ পাঠ

অসহনীয় এই গরমে ঘরে-বাইরের কাজ সামলে সুস্থ থাকবেন কী ভাবে? রইল চিকিৎসকদের পরামর্শ

ঊর্মি নাথ

শেষ আপডেট: ৩০ মে ২০২৬ ০৯:৫৭

ঊর্ধ্বমুখী তাপমাত্রার পাশাপাশি বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি, ফলে ঘেমেনেয়ে জেরবার ছোট বড় সকলেই। অসহনীয় এই গরমে ঘরে-বাইরের কাজ সামলে সুস্থ থাকাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। ডিহাইড্রেশন, হিটস্ট্রোক, জ্বর, সর্দি-কাশি, মাথাব্যথা, ডায়রিয়া গরমে পরিচিত সমস্যা।

জলশূন্যতা আটকাতে

ঘাম অস্বস্তিতে ফেলে কিন্তু এটা একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। ঘামের প্রধান কাজ শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু ঘামের মধ্য দিয়ে শরীর থেকে নুন ও জল বেরিয়ে যায়। সেই ঘাটতি পূরণ না হলে পরিণতি ডিহাইড্রেশন এবং তা থেকে একাধিক সমস্যা, এমনকি প্রাণ সংশয় পর্যন্ত হতে পারে। সাধারণত গরমে শরীর থেকে সারাদিনে এক লিটারের মতো ঘাম নির্গত হয়। এই প্রসঙ্গে মেডিক্যাল কলেজের জেরিয়াট্রিক বিভাগের প্রধান ডা. অরুণাংশু তালুকদার বললেন, “ডিহাইড্রেশন থেকে মাসল ক্র্যাম্প, মাথাব্যথা, ঘুমঘুম ভাব, এমনকি ব্রেন ফগিংও হতে পারে। ডিহাইড্রেশন আটকানোর প্রাথমিক সমাধান জল পান। এর পাশাপাশি ইলেকট্রোলাইট ওয়াটার, ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন বা বাড়িতে তৈরি নুন-চিনির জল খেতে হবে। গ্লুকোজ জলে কিছুটা নুন মিশিয়ে নিতে পারেন। ইলেকট্রোলাইট ওয়াটার খেতে বলা হয়, কারণ ঘামের মধ্য দিয়ে শরীরের সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্যালশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম বেরিয়ে যায়। এতে শরীরে এনার্জির ঘাটতি হয়। তবে কিডনি ও হার্টের সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে জলের পরিমাণ ঠিক করুন।”

এই প্রসঙ্গে হৃদ্‌রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সুনীলবরণ রায় বললেন, “হার্টের সমস্যা থাকলে ডাইইউরেটিকস জাতীয় ওষুধ দেওয়া হয়। এতে শরীর থেকে অতিরিক্ত নুন ও জল মূত্রের মাধ্যমে বেরিয়ে যায় এবং উচ্চ রক্তচাপকে নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু গরমকালে এই ওষুধের ডোজ় কমিয়ে দেওয়া হয়, কারণ গরমে স্বাভাবিক ভাবেই ঘামের মধ্য দিয়ে নুন ও জল বেরিয়ে যায়। হার্টের সমস্যা থাকলে বলা হয় তেষ্টা পেলে তবেই অল্প করে জল খাবেন।” অনেকেই নুন-চিনির বদলে শুধু নুন-লেবু বা নুন-জল পান করেন। বিশেষ করে ডায়াবেটিক রোগীরা চিনি এড়িয়ে যেতে চান। “চিনি নুনের বাহক। চিনি নুনকে কোষের মধ্যে পৌঁছতে সাহায্য করে। শুধু নুন কোষে ঢুকতে পারে না। তাই নুনের ঘাটতি পূরণে নুন-চিনির জল খেতে বলা হয়,” বললেন ডা. তালুকদার। গরমে ডায়াবেটিক রোগীদের সুগার ফল করার সম্ভাবনা বাড়ে, তাই তাঁরা সঙ্গে রাখুন লজেন্স বা মিষ্টি।

হিটস্ট্রোক

মাসল ক্র্যাম্প, মাথা ধরা, জ্বর আসা, কথা অসংলগ্ন হয়ে যাওয়া হিটস্ট্রোকের আগাম লক্ষণ। বাইরের আবহাওয়া যেমনই থাকুক না কেন সব স্তন্যপায়ী প্রাণীর শরীরের ভিতর স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস গ্রন্থি। কিন্তু কোনও কারণে হাইপোথ্যালামাসের কার্যক্ষমতা কমে গেলে শরীরের ভিতরে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের কাজ ঠিক মতো হয় না। তখন হিটস্ট্রোকের মতো ঘটনা ঘটতে পারে। ডা. তালুকদার বললেন, “বিশেষত রোদে বাইরে বা কারখানায় গরমের মধ্যে একটানা কাজ করার পরে শরীর তেতেপুড়ে যাওয়ার মতো গরম হলে ধরে নিতে হবে সেটা হিটস্ট্রোকের আগাম সর্তকতা। তখন দেরি না করে তাঁকে ছায়ার মধ্যে, ফ্যানের তলায় বা এসি রুমে বসিয়ে যতটা সম্ভব তাঁর পোশাক খুলিয়ে পর্যাপ্ত জল দিয়ে গোটা শরীর মুছিয়ে দিতে হবে। খাওয়াতে হবে জল বা ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন। এতে শরীরের ভিতরের তাপমাত্রা কমবে। অজ্ঞান হয়ে গেলে তাড়াতাড়ি নিকটবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া দরকার।”

সর্দি-কাশি-জ্বর

প্রবল গরমে জ্বর-সর্দি-কাশির অন্যতম কারণ শরীরে ঘাম বসে যাওয়া। এটা বেশি হয় এসি ঘর থেকে বারবার ঢোকা বেরোনো করলে। দ্বিতীয়ত, গরমে ফ্রিজ থেকে বার করেই সরাসরি ঠান্ডা জল বা নরম পানীয় পান করলে ঠান্ডা লাগে। চিকিৎসকদের পরামর্শ, কনকনে ঠান্ডা জল নয়, স্বাভাবিক তাপমাত্রার জলে ঠান্ডা জল মিশিয়ে খান। এসি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ডা. তালুকদার বললেন, “বাইরে থেকে এসেই সরাসরি এসি ঘরে না ঢুকে কিছুটা সময় পাখার তলায় জিরিয়ে নিন। বাইরে যদি ৩৭ ডিগ্রি থাকে, সেখান থেকে এসে সটান ২২ ডিগ্রিতে প্রবেশ করলে শরীর খারাপ হতে বাধ্য।”

ছোটদের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের দায়িত্ব

গরমের ডিহাইড্রেশন, ডায়রিয়া, সর্দি-কাশি-জ্বরের পাশাপাশি ঘাম থেকে ঘামাচি ছোটদের কাছে বেশ কষ্টকর। এর প্রতিকার প্রসঙ্গে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. প্রভাসপ্রসূন গিরি বললেন, “এই জন্য স্কুল থেকে ফেরার পরে বা খেলাধুলো করে ফেরার পরে বাচ্চাদের মাথা ভিজিয়ে স্নান করিয়ে দিতে হবে। অনেকে ঘামাচি হলে চিরাচরিত প্রথা অনুয়ায়ী ঘামাচির জায়গায় পাউডার দিয়ে দেন। পাউডার ঘামের গ্রন্থির মুখ আটকে দেয়। পাউডার না দিয়ে ক্যালামাইন জাতীয় লোশন লাগানো যেতে পারে।” এই সময় খেয়াল রাখতে হবে যাতে বাচ্চারা যথেষ্ট পরিমাণে জল, নুন-চিনির শরবত, ডাবের জল, ফল খায়। এতে ডিহাইড্রেশন এড়িয়ে যাওয়া যায়। বোতলবন্দি নরম পানীয় এবং প্যাকেটজাত ফলের রস দেবেন না। “খেয়াল রাখবেন, যাতে বাচ্চাটি বারবার এসি, নন-এসি ঘরে যাতায়াত না করে। এসির হাওয়া যাতে সরাসরি তার গায়ে না লাগে। জ্বর, মাথাব্যথা হলে প্যারাসিটামল দিতে হবে,” বললেন ডা. গিরি। গরমে বাচ্চাদের ডায়রিয়ায় আক্রমণ প্রসঙ্গে তিনি বললেন, “গরমে পাচনক্রিয়ার সমস্যা হয়। তার মধ্যে যদি বাচ্চাকে প্যাকেট জাতীয় চিপস, রাস্তার শরবত, কাটা ফল খাওয়ানো হয় তা হলে ডায়রিয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। এ ছাড়া জলও দিতে হবে পরিস্রুত। অপরিশুদ্ধ জল থেকে শুধু ডায়রিয়া নয়, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস-এ (জন্ডিস) ইত্যাদি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ ছাড়া অ্যাডিনো ভাইরাসও পুকুর কিংবা সুইমিং পুলের জলের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। বাচ্চারা সাঁতার কাটলে এই ব্যাপারে সচেতন হন।” এই গরমে স্কুলে বা বাড়িতে বাচ্চারা যদি অসুস্থবোধ করার কথা জানায়, তা হলে সেটা তার নিছক দুষ্টুমি নাভেবে দেখা উচিত কোথায় তারসমস্যা হচ্ছে। বাচ্চারা এই গরমেস্কুলে যাতে ঠিকঠাক জল খায়, সেটা স্কুলের শিক্ষিক-শিক্ষিকাকেও খেয়াল রাখতে হবে।

কয়েকটি সচেতনতা

প্রয়োজন না হলে সকাল এগারোটা থেকে বিকেল চারটে পর্যন্ত রাস্তায় বেরোবেন না। বাগান পরিচর্যা, রান্না ও ঘর পরিষ্কারের মতো কায়িক শ্রমগুলো যতটা সম্ভব সকালে করে নিলে ভাল। দিনে বাইরে বেরোলে ছাতা, টুপি, সানগ্লাস ব্যবহার করুন। সঙ্গে জল রাখতে হবে। হালকা রঙের সুতির পোশাক পরতে পারলে ভাল। রোজকার খাবার হোক কম মশলাদার। ডায়েটে রাখুন টক দই, মরসুমি ফল, বাড়িতে তৈরি লস্যি, ছাতুর শরবত, ডাবের জল ইত্যাদি। ডাবের জলে যথেষ্ট পরিমাণে পটাশিয়াম থাকে। কিডনির সমস্যা থাকলে একটার বেশি ডাব খাবেন না। দিনে অন্তত দু’বার স্নান করুন। স্নান করে গায়ে-মাথার জল না মুছেই ফ্যানের তলায় বা এসি ঘরে নয়। বারবার স্নানে ঠান্ডা লাগার সম্ভাবনা থাকলে ভেজা গামছা দিয়ে গা মুছে নিতে পারেন। রোদ থেকে এসে কিছুটা জিরিয়ে নিয়ে তার পর জল খান। জল খাওয়ার পাশাপাশি প্রস্রাব ঠিক মতো হচ্ছে কি না খেয়াল রাখুন।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Heatwave bathing

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy