Advertisement
E-Paper

নেপোলিয়ন থেকে স্টিফেন কিং, তেরোর গেরোয় ভুগেছেন অনেকে! ‘১৩’ কি সত্যি অশুভ, না ভয় পাওয়াটা কোনও রোগ?

কেউ বলেন ভুতুড়ে, কারও মতে অপয়া। কারও বিশ্বাস, সংখ্যাটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভয়ঙ্কর কোনও অভিশাপ। বিশ্বাস যেমনই হোক, চিকিৎসা বিজ্ঞান কিন্তু অন্য কথা বলে। তেরোর গেরো আসলে মানসিক।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ৩০ মে ২০২৬ ০৮:৫৮
Why are we afraid of number 13, unveiling the history, myths, and the mind\\\\\\\'s Disease

১৩ সংখ্যাকে ভয়, সত্যিই অপয়া না আসলে কোনও রোগ? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

‘কনজুরিং’ ফিল্ম সিরিজ় হোক বা ‘দ্য রিং’— হলিউডে এমন বহু সিনেমা রয়েছে যা দেখলে ভয়ে রাতের ঘুম উড়ে যায়। আন্তর্জাতিক স্তরেও এমন কয়েকটি হরর ঘরানার ছবি রয়েছে, যা দেখার পর ভয় ঘিরে ধরে দর্শককে। সে ভয় এক রকম, আর আতঙ্কের সঙ্গে অন্ধবিশ্বাস মিলে গেলে তা অন্য রকম। যেমন ‘ফ্রাইডে দ্য থার্টিন্থ’ সিনেমার প্রেক্ষাপট ভয়ঙ্কর কিছু হত্যাকাণ্ড ঘিরে। তবে সেখানে ১৩ সংখ্যাটি বার বার ফিরে এসেছে। ক্রিস্টাল লেকের পটভূমিতে এক মুখোশধারী খুনি প্রতি শুক্রবার তেরো তারিখে নির্মম হত্যাকাণ্ড চালাতেন। বহু পুরনো এক প্রতিশোধস্পৃহা থেকে সে হত্যাকাণ্ডগুলি সংঘটিত হলেও, সেখানে ১৩ সংখ্যাটিকে আকর্ষণের কেন্দ্রে রাখা হয়েছিল। ‘১৩’ সংখ্যাকে নিয়ে ভয় বা আতঙ্ক বহু প্রাচীন। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নানা সংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসও। পাশ্চাত্যে সংখ্যাটিকে নিয়ে নানা কাহিনিও প্রচলিত রয়েছে। সংখ্যাটিকে কেউ বলেন ভুতুড়ে, কারও মতে সেটি অপয়া। কারও বিশ্বাস, সংখ্যাটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভয়ঙ্কর কোনও অভিশাপ। বিশ্বাস যেমনই হোক, চিকিৎসা বিজ্ঞান কিন্তু অন্য কথা বলে। তেরোর গেরো আসলে মানসিক। সবটাই অবচেতন মনে ঘনিয়ে ওঠা এমন এক আতঙ্ক, যা সহজে দূর হয় না। এর নাম ‘ট্রিস্কাইডেকাফোবিয়া।’

পশ্চিমী সংস্কৃতিতে ‘অপয়া’, প্রাচ্যে এর মাহাত্ম্য আলাদা

পশ্চিমে ‘১৩’ সংখ্যাকে অশুভ মনে করেন অনেকেই। কেউ ভাবে্‌ তা দুর্ভাগ্য বয়ে আনে। তাই হোটেলের ১৩ নম্বর ঘরে থাকতে ভয় পান অনেকে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বহু হোটেলেই ১৩ নম্বর ঘরটি বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। অনেক হোটেল আবার আরও এক ধাপ এগিয়ে শুধু ঘর নয়, হোটেলের ১৩ নম্বর তলাটিই পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়েছে। ১৩ সংখ্যাকে ভয় পাওয়ার শুরু কবে থেকে, সে নিয়ে নানা মতভেদও আছে। কিছুটা রহস্য লুতিয়ে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির বিখ্যাত ‘দ্য লাস্ট সাপার’ ছবিটিতে। সেখানে ১৩ জন মানুষের উপস্থিতি দেখা গিয়েছে। আর সেখানে জুডাস ইসকারিয়ট নামের যে ব্যক্তিটি যিশুর সঙ্গে প্রথম প্রতারণা করেন বলে মনে করা হয়, তিনি ত্রয়োদশ ব্যক্তি হিসেবে যোগ দেন শেষ নৈশভোজে্র টেবিলে। আবার অলিম্পাসের দেবতার সংখ্যা ছিল ১২ জন। ঘড়িতে ১২ ঘণ্টার হিসেব দেওয়া আছে। এক বছরেও ১২ মাস আছে। রাশিচক্রে রয়েছে ১২টি প্রতীক। তাই ১৩ সংখ্যাটিকে অশুভ মনে করে পশ্চিমী দুনিয়া। আবার ডাকিনীবিদ্যাতেও এর উল্লেখ পাওয়া যায় বলে বিশ্বাস। ডাকিনীদের সভায় নাকি সব সময় ১৩ জনই অংশ নেয়! সেখানে এই সংখ্যা নাকি কখনওই বদলায় না।

১৩ সংখ্যা নিয়ে নানা অন্ধবিশ্বাস রয়েছে পাশ্চাত্যে।

১৩ সংখ্যা নিয়ে নানা অন্ধবিশ্বাস রয়েছে পাশ্চাত্যে।

পাশ্চাত্যে ১৩ সংখ্যাটিকে নিয়ে নানা বিদঘুটে বিশ্বাস প্রচলিত থাকলেও এ দেশে কিন্তু তার মাহাত্ম্য আলাদা। পঞ্জিকা অনুসারে চান্দ্র মাসের ১৩তম দিনটিকে 'ত্রয়োদশী' বলা হয় যেদিন শিবের উপাসনা করা হয়। যদিও ১৩ সংখ্যা নিয়ে এ দেশের অনেক মানুষজনেরও ভয় রয়েছে। দেশের ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন (এসিবিআই) থেকে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ‘ট্রিস্কাইডেকাফোবিয়া’ রোগটি আসলে এক প্রকার ‘অ্যাংজ়াইটি ডিজ়অর্ডার’। অনেকে সিনেমা দেখে বা গল্প পড়ে অহেতুক ভয় পান। নানা গল্পকথা শুনে সেগুলির দৃশ্য কল্পনা করতে থাকেন। এতে শুধু যে মনে ভয় চেপে বসে তা নয়, ব্যবহারিক ক্ষেত্রেও অনেক বদল আসে।

শোনা যায় ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্টও ট্রিস্কাইডেকাফোবিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন। আমেরিকার ৩২ তম প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডেলানো রুজভেল্ট ১৩ তারিখে কোনও ভ্রমণ করতেন না, কোনও পার্টিতে ১৩ জন থাকলে তা এড়িয়ে চলতেন। হরর ফিকশনের লেখক স্টিফেন কিং জানিয়েছিলেন, তিনিও ১৩ সংখ্যাকে ভয় করেন। অভিনেতা ও রাজনীতিবিদ আর্নল্ড শোয়ার্ৎজ়েনেগার নানা সময়ে তাঁর এই ১৩ সংখ্যার ভীতির কথা জানিয়েছেন।

তেরোর গেরোয় মন অস্থির, চেতনাকে আচ্ছন্ন করে অজানা ভয়

মস্তিষ্কের ‘অ্যামিগডালা’ নামক অংশটি ভয় এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে। যদি কেউ ছোটবেলা থেকে কাল্পনিক কাহিনি পড়ে জানতে পারেন যে ১৩ সংখ্যাটি অশুভ এবং তা নিয়ে পরিবার ও পরিজনের মধ্যেও সে অন্ধবিশ্বাস কাজ করতে থাকে, তা হলে এই ধারণাই বদ্ধমূল হয়ে চেপে বসে। পরবর্তীতে ১৩ সংখ্যাটি দেখামাত্রই অ্যামিগডালা এমন সঙ্কেত দিতে থাকে, যা অস্থিরতা বহু গুণে বাড়িয়ে দেয়। এর থেকে প্যানিক অ্যাটাকও হতে পারে বা রোগী জ্ঞান হারাতেও পারেন। আগে থেকে অ্যাংজ়াইটি ডিজ়অর্ডার রয়েছে অথবা প্যানিক অ্যাটাকে ভোগেন, এমন মানুষজনের ট্রিস্কাইডেকাফোবিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। আবার কম বয়সে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বা দুর্ঘটনায় প্রিয়জনকে হারিয়েছেন, এমন মানুষজনও এই সমস্যায় ভুগতে পারেন।

১৩ সংখ্যা নিয়ে আতঙ্কে ভোগাও একটি রোগ।

১৩ সংখ্যা নিয়ে আতঙ্কে ভোগাও একটি রোগ।

কী কী লক্ষণ দেখা দেয়?

আচমকা হৃদ্‌গতি বেড়ে যেতে পারে, দম বন্ধ হয়ে আসার অনুভূতি হয়।

অতিরিক্ত ঘাম হতে থাকে, শরীর জুড়ে কাঁপুনি হয়।

যে কোনও উপায়ে সেই স্থান বা পরিস্থিতি ছেড়ে পালাতে মন চায়। আক্রান্ত ব্যক্তি তা করতেও মরিয়া হয়ে ওঠেন।

তীব্র আতঙ্কের কারণে তাৎক্ষণিক ভাবে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সাময়িক ভাবে লোপ পায়।

ট্রিস্কাইডেকাফোবিয়া থেকে রেহাই পাওয়া সহজ নয়। এক দিনে এ ব্যাধি সারবে না। বিষয়টি যদি সাময়িক হয়, তা হলে তা নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু যদি লাগাতার হতে থাকে, তখন কাউন্সেলিং করাতে হবে। ‘কগনিটিভ বিহেভেরিয়াল থেরাপি’ করিয়ে লাভ হয় অনেক সময়েই।

Phobia anxiety disorder Panic Attack
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy