E-Paper

সমকাল ও স্মৃতির চতুর্ভুজ

প্রথমেই যেমন শিল্পী দেবাশিস ধাড়ার কাজ এই মূলস্রোতের একটি সময়ের নির্মম উচ্চারণ।

পিয়ালী গঙ্গোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২৩ মে ২০২৬ ০৮:৪৭
কালান্তর: চার শিল্পীর মিলিত প্রদর্শনী অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসে।

কালান্তর: চার শিল্পীর মিলিত প্রদর্শনী অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসে।

চতুর্ভুজ— চারজন শিল্পীর সম্মিলিত উপস্থিতি। সম্প্রতি চতুর্মুখী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চার শিল্পী হাজির হলেন অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসের তিনটি গ্যালারি জুড়ে। তাঁদের অভিমুখের গভীরে বয়ে চলে এক অদৃশ্য সেতুবন্ধন। যেন চারটি নদীর স্রোত মিশেছে এক অভিন্ন স্রোতে। এই গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের বড় শক্তি তাঁদের বৈচিত্র। তবে সেই বৈচিত্র কোনও বিচ্ছিন্নতার দিকে নয়, বরং গভীর অন্তর্গত সংলাপের মাধ্যমে এক চরম সত্যের দিকনির্দেশ করে। কোথাও স্মৃতির পুনর্গঠন, কোথাও বাস্তবের নির্মম উপস্থিতির স্বীকৃতি, আবার কোথাও দৃষ্টির অন্তরালে মানসিক আশ্রয়ের অনুসন্ধান। এই বহুমাত্রিকতার ফলে দর্শক কেবল পৃথক পৃথক কাজ দেখেন না, বরং এক কাজ থেকে অন্য কাজের দিকে অগ্রসর হতে হতে একটি বিস্তৃত অভিজ্ঞতার ভিতরে প্রবেশ করেন। এই যাত্রাপথে শিল্পীরা কোনও চূড়ান্ত ব্যাখ্যা আরোপ করেন না। জোরালো ইঙ্গিত, ভাঙন ও নীরবতার কৌশলে দর্শককে ভাবনার মুক্ত পরিসর তৈরি করে দেন।

প্রথমেই যেমন শিল্পী দেবাশিস ধাড়ার কাজ এই মূলস্রোতের একটি সময়ের নির্মম উচ্চারণ। অর্থাৎ যুদ্ধ, যৌনতার ভয়াবহ ব্যবহার এবং প্রত্যেক দিনের অনিশ্চয়তার এক সামাজিক দলিল। যেন ডায়েরির পৃষ্ঠায় জমা হওয়া ক্ষোভের বিস্ফোরণ। ফলে তাঁর চিত্রভাষা ইচ্ছাকৃত ভাবেই জটিল। ভাঙা ফর্ম, স্তরিত রং এবং প্রতীকী সঙ্কেতের ঘন বিন্যাসে এক অস্থির আবহ। ক্যানভাস জুড়ে তাই শিল্পীর ব্রাশ স্ট্রোক এবং সংঘর্ষজনিত রং প্রতিবাদের চিৎকারে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। ‘বডি পলিটিক্স’ সিরিজ়ে মানবদেহ হয়ে ওঠে সামাজিক ও মানসিক চাপের বাহক। বিকৃত অঙ্গভঙ্গি, তীব্র রঙের সংঘাত এবং ভাঙা বয়ান মিলিয়ে তৈরি হয় এক নাটকীয় উত্তেজনা। তাঁর আক্রমণাত্মক রঙের ব্যবহারে এক্সপ্রেশনিস্ট প্রবণতার আভাস স্পষ্ট। এত প্রাসঙ্গিক ছবি, চমকে ওঠার মতো। যেমন কাঁটাতারের র‌্যাপিং, দৃশ্যমান পাঁজর ছিন্নমস্তা... সর্বত্রই একটা ‘কেওস’ বা নাজেহাল অবস্থা। সব মিলিয়ে এক বিপর্যস্ত সময়ের প্রতিবাদ। তবে অতিরিক্ত কন্ট্রাস্ট-এর রং ও ইচ্ছাকৃত ভাঙনের কারণে দর্শকের মূল সুরে যেতে কিছুটা সময় লাগে। বর্তমান সমস্যা এবং বোধ ক্রমান্বয়ে উঠে আসে এই সব কাজে।

কুন্তল দত্তর কাজ একেবারেই বিপরীত মেজাজে রচিত। মূলত তাঁর চিত্রপট ফর্ম ও গঠনের সুসংহত অনুসন্ধানে প্রতিষ্ঠিত। প্রকৃতিকেন্দ্রিক বসতির ছবিতে নির্মাণশৈলীর মধ্যে যে নান্দনিক অনুভূতি দেখা যায়, তা বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। ছবির বিস্তৃত প্যানোরমায় জ্যামিতিক ভাঙন যে ভাবে এক জৈব প্রবাহে রূপান্তরিত হয়েছে, তা স্বাভাবিকের মধ্যে এক সূক্ষ্ম সমঝোতা। রঙের ভিন্ন ভিন্ন আধিপত্যে এক কাঙ্ক্ষিত ভূদৃশ্য নির্মিত হয়। সেখানে স্থাপত্য ও প্রকৃতির রেখা ও রঙের কোমল ব্যবহার এবং স্পেসের ভারসাম্যে মিউরালধর্মী বিস্তার লক্ষ্য করা যায়। এই কোয়ালিটি দর্শককে দৃশ্যের ভিতরে দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখে।

সুশান্ত চন্দ্র কর্মকারের চিত্রভাষা তুলনামূলক ভাবে আরও অন্তর্মুখী। তাঁর নির্বাচিত ‘মাইন্ডস্কেপ’-এ দেখা যায় এক গভীর অন্তর্মুখী পরিসর। যেখানে প্রকৃতি ও মানবমুখ একে অপরের মধ্যে দ্রবীভূত হয়ে তৈরি করে এক মনস্তাত্ত্বিক দৃশ্যভাষা। শিল্পীর দৃশ্য কখনও কোনও স্থির ফ্রেমে আবদ্ধ নয়। ট্রেনযাত্রার গতির মতো ক্রমাগত সরে যায়, ভেঙে যায়, পুনর্গঠিত হয়। শিল্পীর ফেলে আসা জীবনে অনবরত স্থানবদলের কারণে কোথাও তাই স্থিরতা নেই। আছে অবিরাম সঞ্চরণ। ছবিতে বিভিন্ন ভাবে ডায়মেনশন এসেছে। তবে শিল্পীর উচ্চকিত রং নির্বাচন, দর্শককে বহু প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেয়। এর উত্তরে শিল্পী জানান, এই ধরনের উজ্জ্বল রং দেখার অভিজ্ঞতা তাঁর আছে, যা বাস্তবের সীমা পেরিয়ে এক বিস্ময়কর সংবেদন তৈরি করে। কাজের মধ্যে দেখার সঞ্চিত অভিজ্ঞতা এবং মানবিক আবেগ একসঙ্গে স্ফুরিত হয়ে তীব্র রঙের ছটা ছড়িয়ে দেয়।

অপর দিকে প্রদীপ ঘোষের কাজ এই তীব্রতার বাইরে এক মৃদু কাব্যিক পরিসর উন্মোচন করে। শিল্পী পশ্চিমবঙ্গের রাঢ় অঞ্চল ধরে কাজ করেন। বিশেষত মাটি, তার রং ও গঠন তাঁর ছবির মূল উপাদান। হলুদ, বাদামি, সাদা, সবুজ... সবই তাঁর কাজে এসেছে খুব যত্ন সহযোগে। ভূমি সংলগ্ন সমস্যা এবং বিস্তৃত জনসমাবেশ যেন দূর থেকে দেখা এক-একটি স্মৃতিচিত্র। প্রকৃতপক্ষে প্রদীপ ঘোষের ছবিতে ধরা পড়ে ক্রমশ বিলীয়মান গ্রামীণ জীবনের পরিসর। ডার্ক টোনের বেসিক সাপোর্ট নিয়ে স্তরে স্তরে রঙের প্রয়োগ, তার উপরে টোনাল বিন্দুবিন্যাস ছবিতে এক বিশেষ আবেশ তৈরি করে। শিল্পীর বর্ণচয়ন এবং ছবির নির্মাণে হাহাকার থাকলেও, তার অন্তর্লয়ে অনুরণিত হয় এক নীরব, স্বপ্নময় সুর।

পরিশেষে বলা যায়, ‘চতুর্ভুজ’-এর এই আয়োজন কেবল একটি প্রদর্শনী নয়, বরং অনুভূতির এক বিকল্প উপাখ্যান। চারটি স্বতন্ত্র সুর মিলেই ‘চতুর্ভুজ’ হয়ে উঠেছে এক বহুস্বরিক দৃশ্যকাব্য। যেখানে পরীক্ষা ও অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত লুকিয়ে থাকে। বুঝিয়ে দেয়, শিল্পের পথ কখনও সরলরৈখিক নয়, বরং অন্বেষণ এবং পুনর্গঠনের মধ্য দিয়েই তার পূর্ণতা অর্জিত হয়। সমকালীন শিল্পের দ্রুত ভিসুয়াল চমকের বিপরীতে তাই এই প্রদর্শনী নিঃসন্দেহে দেখার অভ্যেসকে পুনরুজ্জীবিত করে।


(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Academy of Fine Arts Artwork

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy