সম্প্রতি পূর্বা দামের ৯০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়েছিল— ‘পূর্বাচলের পানে তাকাই’। প্রথমেই প্রমিতা মল্লিক তাঁর স্মারক বক্তৃতায় পূর্বার জীবনের সুন্দর ছবি আঁকলেন। শিল্পী পূর্বা, ব্যক্তি পূর্বা, শিক্ষক পূর্বা... তাঁর সব দিক নিয়েই আলোচনা হল। অনুষ্ঠানের পরবর্তী অংশে নানা গুণিজন তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের অভিজ্ঞতা জানিয়ে পূর্বা দামের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করলেন। ‘পূর্বায়ন’, ‘সুরবৈভব’ ও ‘সুরধুনী’র ছাত্রছাত্রীদের সমবেত গান পরিবেশিত হল। এ যুগের ছেলেমেয়েদের কাছে পূর্বা দামকে পরিচিত করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, যা আয়োজকরা করেছেন।
অমিত দাশগুপ্তের ভাবনায় রচিত ‘অপরাজিত ওহে’ পাঠ করলেন সাম্য কার্ফা। পূর্বা দামের জীবনী কী চমৎকার ভাবে ফুটে উঠল সেই লেখায়! সাম্য তাঁর পরিবেশনায় মুগ্ধ করলেন শ্রোতাদের। ‘যা হারিয়ে যায়’ গানে প্রাণ ঢেলে শ্রদ্ধা নিবেদন করলেন সৈকত শেখরেশ্বর রায়। প্রকৃতি মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘সমুখে শান্তি পারাবার’ শ্রোতাদের চোখে জল এনে দেয়। তাঁর কণ্ঠস্বর, বোধ, গায়কি গানের অন্তরে প্রবেশ করে। অনিন্দ্য নারায়ণ বিশ্বাস যখন শোনান ‘আমি যখন তাঁর দুয়ারে’ বা ‘সীমার মাঝে অসীম তুমি’, বরাবরের মতোই মুগ্ধ করে। তাঁর কণ্ঠে যে শান্ত নিবেদনের ভাব প্রকাশ পায়, তা রবীন্দ্রনাথের গানের জন্য প্রয়োজনীয়। শ্রোতারা প্রতিটি কথার সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করতে পারেন। ‘আমি যখন তাঁর দুয়ারে’ গানটির সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন বারবার গানটির শান্ত নিবেদনকে আঘাত করে। এই গানে নাচ একেবারেই অপ্রয়োজনীয়।
‘সখি, ওই বুঝি’ গানটি পরিবেশন করলেন দেবাশ্রিতা ঘোষ। অত্যন্ত যত্ন নিয়ে গানটির ছবি আঁকলেন। সংযুক্তা বিশ্বাসের কণ্ঠে ‘আমারে যদি জাগালে’ও বিভবেন্দু ভট্টাচার্যের কণ্ঠে ‘কোথা বাইরে দূরে’ শ্রোতাদের মুগ্ধ করে। যন্ত্রানুষঙ্গে ছিলেন বিপ্লব মণ্ডল, সুব্রত বাবু মুখোপাধ্যায় ও বুবাই নন্দী। এঁদের অভিজ্ঞতা অনুষ্ঠানকে সমৃদ্ধ করে।
সমগ্র অনুষ্ঠানটির আয়োজনে ছিলেন অনুরাধা বসু ও কোয়েলী সরকার। পূর্বা দামের ৯০তম জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন আয়োজন করে তাঁরা বহুজনকে নিজেদের শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ করে দিলেন। গানে, পাঠে, স্মৃতিতে জন্মদিন উদ্যাপিত হল। বহু স্মৃতি ও ভালবাসা নিয়ে পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহ আনন্দে ভাসল। বাইরে সে দিন অঝোরে বৃষ্টি। যেন বলছে, ‘তোমার যাওয়া তো নয় যাওয়া’!
অনুষ্ঠান
সঙ্গীত পরিবেশনে শিল্পীরা
- সম্প্রতি বাক্ প্রযোজিত শ্রুতি উপস্থাপনা ‘যুগসূর্য শ্রী রামকৃষ্ণ’ পরিবেশিত হয় স্বামী বিবেকানন্দের পৈতৃক নিবাস স্থিত রামকৃষ্ণ মঞ্চে। দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের অবস্থানকালে তাৎপর্যপূর্ণ কিছু ঘটনার সংকলনে এই অনুষ্ঠান। ঠাকুরের ভূমিকায় অমিত রায় এবং রাসমণির ভূমিকায় রত্না মিত্র অভিনয় করেন। সারদা মায়ের চরিত্রে মিতালী ভট্টাচার্য, গিরিশের ভূমিকায় মুরারী মুখোপাধ্যায়, তোতাপুরীর চরিত্রে রূপণ দাশগুপ্ত ছিলেন। বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে পরিবেশিত প্রতিটি গান কথামৃত থেকে চয়ন করা হয়েছিল। সমগ্র অনুষ্ঠানটিতে গান পরিবেশন করেন বিশ্বরূপ রুদ্র। বিশ্বরূপের কণ্ঠে শোনা যায় ‘জুড়াইতে চাই কোথায় জুড়াই’, ‘এসেছে নূতন মানুষ’, ‘মন চল নিজ নিকেতনে’। যন্ত্রানুষঙ্গে তালবাদ্যে শান্তনু চট্টোপাধ্যায়, কিবোর্ডে সুশান্ত সরকার এবং পার্কাশনে ছিলেন মুরারী পাত্র।
- সেরাম থ্যালাসেমিয়া প্রিভেনশন ফেডারেশনের পক্ষ থেকে আয়োজিত হয়েছিল এক বিশেষ সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার। এই অনুষ্ঠানে ছিল বিভিন্ন ধারার বাংলা গানের পাশাপাশি নতুন ক্যালেন্ডার প্রকাশ অনুষ্ঠান। সম্প্রতি মহাজাতি সদনে অনুষ্ঠিত হল এই বৈশাখী বৈঠক ‘এক সন্ধ্যা বহু সুর।’ বাংলা ক্যালেন্ডারে আছে উত্তমকুমার আর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের স্মরণে দুই অভিনেতার বিভিন্ন মুহূর্তের ছবি। সেরাম থ্যালাসেমিয়া প্রিভেনশন ফেডারেশনের সম্পাদক সঞ্জীব আচার্যর চিত্রনাট্যে পরিবেশিত হল বিশেষ নৃত্য-গীতি আলেখ্য ‘দুই পুরুষ’। দুই কিংবদন্তি অভিনেতার চলচ্চিত্রের গান, গানের গল্প, ব্যক্তিগত সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে পরিবেশিত হল ‘দুই পুরুষ’। এর পর ছিল বাংলা গানের নানা দিক, বাংলা পুরাতনী গান থেকে ব্যান্ডের গান নিয়ে বিশেষ সঙ্গীতানুষ্ঠান ‘বোশেখের বৈঠকীতে’। গানে অংশগ্রহণ করলেন শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায়, নচিকেতা, সিধু, পৌষালী, স্বাক্ষর বসু। সমগ্র গানের আড্ডা সঞ্চালনা করলেন দেবাশিস বসু। পুরাতনী গান থেকে বাংলা গানের নানা ধারার বিবর্তন একে-একে আধুনিক বাংলা গান, চলচ্চিত্রের গান, লোকগীতি, বাংলা ব্যান্ডের গান উঠে এল আলোচনায় আর গানে। উল্লেখযোগ্য গানগুলোর মধ্যে ছিল ‘পুরাতন হল গত’, ‘কিছু দিন মনে মনে’, ‘মন মাতাল সাঁঝ সকাল’, ‘কৃষ্ণ তোমার সঙ্গে যাব’ ইত্যাদি।
- পুনশ্চ নৃত্য কলা কেন্দ্র কর্তৃক আয়োজিত ভাবতরঙ্গ নৃত্য উৎসব বাগবাজারের গিরিশ মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয়। উৎসবের সূচনা হয় পুনশ্চ-র ছাত্রীদের দ্বারা গণেশের প্রতি উৎসর্গীকৃত একটি পরিবেশনার মাধ্যমে। তাদের পরবর্তী পরিবেশনা, একটি প্রাণবন্ত তিল্লানা, তাঁদের সুশৃঙ্খল প্রশিক্ষণ, ছন্দের স্পষ্টতা এবং সম্মিলিত শক্তিকে প্রতিফলিত করে। দ্বিতীয় পর্বে নন্দিতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অর্ণব বন্দ্যোপাধ্যায় ওড়িশি ও ভরতনাট্যমের একটি আকর্ষক যুগল নৃত্য পরিবেশন করেন। সলিল চৌধুরীর উত্তরাধিকারের প্রতি উৎসর্গীকৃত ‘শতবর্ষে সলিল’ শীর্ষক একটি মর্মস্পর্শী শ্রদ্ধাঞ্জলি পরিবেশন করে কোহিনূর সেন বরাটের দল। বিশেষ করে শম্ভু মিত্রের মূল কোরিয়োগ্রাফিতে কোহিনূর সেন বরাটের ‘রানার’ পরিবেশনাটির কথা উল্লেখ্য। সন্ধ্যাটি শেষ হয় শুভজিৎ কুশ দাস পরিচালিত নৃত্য পরিবেশনা দিয়ে। এই উৎসবে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী রশ্মি বন্দ্যোপাধ্যায়, মলি রায় এবং কাকলি বসু। সব মিলিয়ে, ভাবতরঙ্গ একটি অর্থবহ মঞ্চ হিসেবে তার স্থানকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছে, যেখানে নান্দনিক উৎকর্ষ এবং বৌদ্ধিক গভীরতার মধ্যে ভারসাম্য রেখে সূক্ষ্ম নৃত্য পরিবেশনা উপস্থাপন করা হয়।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)