E-Paper

আলপনার আলোকালো

সমীর আইচের কাজের সঙ্গে যাঁরা পরিচিত, তাঁরা জানেন যে তিনি মানুষ থেকে সৃষ্ট কোনও বিষয়কে নানা বিমূর্ততার মাধ্যমে একটা জায়গায় পৌঁছে দেন।

শেষ আপডেট: ১৬ মে ২০২৬ ১১:০৩

সম্প্রতি গ্যালারি বি ক্যাফ-এ সমীর আইচের একক প্রদর্শনী দেখতে পেলেন শিল্প অনুরাগীরা। প্রদর্শনীর নাম ‘ইন্টারস্টিশিয়াল রেভারবেরেশন্স’, অর্থাৎ দুইয়ের মাঝের প্রতিধ্বনি। শো কিউরেট করেছেন রীনা দেওয়ান। ১৯৮১ সাল থেকে পেশাগত ভাবে কাজ করে চলেছেন সমীর আইচ। তাঁর যাত্রা বাস্তববাদ থেকে শুরু হয়ে, কিছু পথ চলার পরে জড় পদার্থের প্রাণ অনুভব করে খুঁজে পায় এক নতুন চিত্রকল্প।

সমীর আইচের কাজের সঙ্গে যাঁরা পরিচিত, তাঁরা জানেন যে তিনি মানুষ থেকে সৃষ্ট কোনও বিষয়কে নানা বিমূর্ততার মাধ্যমে একটা জায়গায় পৌঁছে দেন। সেখানে দক্ষতার সঙ্গে ক্যানভাসে স্পেস বিন্যাস করেন এবং সব সময়েই কোনও মানবিক বার্তা থাকে।

এক রকম কাজ বছরের পর বছর ধরে করতে চান না শিল্পী। সব সময়ে নতুনত্বের সন্ধানী তিনি। তাঁর মননে সৃজনশীলতা নানা রূপে ধরা পড়ে। এক নতুন আঙ্গিকের দেখা পেয়ে যান তিনি কখনও কখনও। পরিবর্তনকে ভয় পাননি তিনি। সমীর আইচ তাঁর রাজনৈতিক সত্তার পাশাপাশি নিজের শিল্পে রেখে চলেছেন এক নান্দনিক স্বাক্ষরও।

আমাদের দেশের বিভিন্ন শুভ কাজের যে আলপনা, তা ছোট থেকেই ভালবাসতেন শিল্পী। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এটাও ভাবতেন যে, আলপনায় রং নেই কেন? কোন‌ও টোনাল ভেরিয়েশন নেই কেন? আলপনা এক সময়ে তাঁর কাছে বড় একঘেয়ে, ফ্ল্যাট হয়ে ধরা দিল। তখন তা কী ভাবে বদলানো যায়, তা ভাবতে ভাবতে উজ্জ্বল সব রং আনার কথা চিন্তা করেন শিল্পী। একরঙা আলপনাকে আধুনিক প্যালেটে আনার উদ্দেশ্যেই তাকে অন্য রূপে-রসে-ছন্দে সাজাতে উদ্যত হলেন। উজ্জ্বল রঙে সাজাতে গিয়ে স্বাভাবিক ভাবে গানের ছন্দ এসে গেল, কারণ তিনি নিজে একজন সঙ্গীতপ্রেমী এবং গায়ক। সঙ্গীতে যেমন ঊর্ধ্বগামী আরোহীর পর হঠাৎ গায়ক উচ্চ স্বরকে অবরোহে আছড়ে ফেলে দিয়ে চমকে দেন শ্রোতাদের, সমীর তেমন আমাদের পরিচিত আলপনাকে গানের স্বরলিপির নৃত্যনাট্য দেখিয়ে পুরো স্পেসটাই নিজস্ব আঙ্গিকে গড়লেন। তাতে উঠে এল সঙ্গীতের মাধুর্য এবং গভীরতা। এ বার সব সীমাবদ্ধতার দায়মুক্ত হয়ে তিনি আধুনিক উদ্দীপক স্পেস বিভাজন এবং টোনের খেলায় আঁকলেন সব ছবি। সব ছবিতেই কিন্তু আলপনা থেকে গেল। সব ডিজ়াইনে গানের ছন্দ আপন মনে জাগল… “নিভিয়ে দিয়ে সন্ধ্যাবাতি… ফেলে দিয়ে রাত্রে গাঁথা সেঁউতি ফুলের মালা”।

ছবিগুলোর নাম সমীর আইচ দিয়েছেন ‘নকশার ঐকতান’! প্রদর্শনীর ছবিগুলো ক্যানভাসের উপরে অ্যাক্রিলিকে করা। ২০২৪ থেকে ’২৬ এর মধ্যে। কোথাও কালো পৃষ্ঠপটে বড় একটি কল্কার ছবি কিন্তু সে যেন আশপাশের আধুনিকতার চাপে বিপর্যস্ত। এই সব ছবিতে আজকের জগতের মিথ্যাচার, বিরোধ, হি‍ংসা, বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং সভ্যতার বিচিত্রতার প্রহসন ইত্যাদি থেকে আলপনা যেন আপন সত্তাকে বাঁচিয়ে রাখতে অক্ষম। সে নিজের পরিচয় ভুলে কিছুটা জ্যামিতিক আকার ধারণ করে অদ্ভূত এক ফর্মে রূপান্তরিত হয়ে গেল।

এ বারের কাজ তাঁর সম্পূর্ণ অন্য রকম। তাঁর সাহসিকতার পরিচয় পেলেন শিল্প অনুরাগী। সৃষ্টিশীল মানুষ হিসেবে তিনি সবসময় নতুন কিছু করতে চেয়েছেন। পরিবর্তনকে ভয় পাননি। প্রাচীন মন্দিরের স্থাপত্য বা আদিযুগের গুহাচিত্রের সরলতা অথবা গ্ৰামীণ লোকশিল্প যুগে যুগে শিল্পীদের অনুপ্রাণিত করেছে। সমীর ঠিক সে রকম ঘরোয়া আলপনার গঠনের নমনীয়তা ভেঙে রেখার প্রাচুর্যে, বর্গক্ষেত্রে, ত্রিভুজাকৃতিতে উজ্জ্বল রঙে তাকে ক্যানভাসে তুলে আনলেন। সেখানে ভরা অংশের থেকে ছাড়া অংশের জোর কিছু কম নয়।

৫০-৬০ বছর আগে উত্তর ভারতে কিছু তাল নতুন করে বানানো শুরু হয়। সাড়ে পাঁচ মাত্রা, সাড়ে সাত মাত্রা, সোয়া ন’মাত্রা’র কিছু তাল বা লয় সৃষ্টি হয়েছিল। হয়তো শিল্পী সমীর আইচ-এর মাথায় সেই রকম কোনও স্পন্দন থেকে ছবিগুলো তাঁর চারপাশের জীবনের একটা ভাষ্য তৈরি করেছে। সেখানে বেশ তাল লয় এবং ছন্দের পরিচয় মেলে।

একটি ক্যানভাসে যেন এক মানুষের মুখাবয়বের অংশমাত্র ধরা পড়েই হারিয়ে গিয়েছে গানের সুরে তালে। এখানে পটভূমি মিশকালো আর সামনে উজ্জ্বল লালের প্রাধান্য চোখ কাড়ে। এই ছবিতে আলপনা বিপর্যস্ত।

অপর একটি ছবিতে গাঢ় নীল প্রেক্ষাপটে আরও ঘন কালোর ডিজ়াইন। কিন্তু হালকা হাতে নকশি কাঁথার মতো ছেঁড়া রংগুলো নিজেকে মেলে ধরার চেষ্টা করছে।

আর‌ একটি ক্যানভাসে কালো এবং ছাইরঙা ব্যাকগ্ৰাউন্ডের উপরে মোটা ব্রাশে ভারমিলিয়ন লালের একটি মোটা ডিজ়াইনে যেন চুরমার করতে চেয়েছেন ছন্দের কাব্যিক সৌন্দর্য। তাঁর ২০২৬-এর শেষ ছবিটি ভারী সুন্দর। এই ক্যানভাসে বিভিন্ন টোনে গভীর নীল রঙের উপরে কিছু জ্যামিতিক আকার পাশ্চাত্য শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বাদ্যযন্ত্রের সুরের অনুভব জাগায়।

তাঁর প্রিয় শিল্পী গণেশ হালুই, যোগেন চৌধুরী, প্রকাশ কর্মকার এবং আরও অনেকে। নিজেকে ভারতীয় বলে ভাবতে ভালবাসেন না। আজকের বিশ্বায়নের যুগে অর্থনীতি সংস্কৃতি প্রযুক্তি এবং তথ্যের আদান-প্রদানের ফলে বিশ্বকে একটি সংযুক্ত পৃথিবী বলে গণ্য করেন।

শমিতা বসু

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Artwork

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy