E-Paper

বিন্দু, রেখা ও অন্তর্লোক

মোট ১৪টি চিত্রমালার কেন্দ্রে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন প্রতীক। ‘মুখ’ সিরিজ়ে যেমন দেখা যায়, বহু চক্ষুবিশিষ্ট, বিকৃত বা মুখোশসদৃশ অবয়ব।

পিয়ালী গঙ্গোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৯ মে ২০২৬ ০৮:৩৫
সাদাকালো: আনন্দী আর্ট গ্যালারিতে শিল্পী ভাস্কর লাহিড়ীর প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম।

সাদাকালো: আনন্দী আর্ট গ্যালারিতে শিল্পী ভাস্কর লাহিড়ীর প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম।

হাওড়ার আনন্দী আর্ট গ্যালারিতে সম্প্রতি হয়ে গেল শিল্পী ভাস্কর লাহিড়ীর দ্বিতীয় একক প্রদর্শনী ‘নুয়ান্সেস অব লাইফ’। শহরের কোলাহল থেকে খানিক দূরে, গ্যালারির সংযত পরিসর দর্শককে স্বাগত জানায় এক অন্তর্মুখী শিল্পভাষার মাধ্যমে। সেখানে রেখা ও ফর্ম মিলেমিশে গড়ে উঠেছে এক চিন্তামগ্ন দৃশ্যজগৎ। এই প্রদর্শনী নিছক কিছু কাজের সমাবেশ নয়, শিল্পীর দীর্ঘ দিনের পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতা ও মানসিক সংহতির প্রকাশ। কালি-কলমের রেখা, বিন্দু এবং অন্ধকারের স্তরবিন্যাস এমন ভাবে চিত্রপটে নির্মিত হয়েছে, যেখানে আলো বাইরে থেকে এসে পড়ে না, বরং অন্ধকারের ভিতর থেকেই জন্ম নেয়।

এই একরঙা রেখাভিত্তিক কাজগুলি শিল্পীর দীর্ঘ শিল্প-অনুসন্ধানের ফল। দেশীয় লোক-ঐতিহ্য, বিশেষত কালীঘাট পটচিত্র, উপজাতীয় অলঙ্করণ এবং বহির্বিশ্বের আদিম শিল্পভাষার সঙ্গে শিল্পীর নিবিড় সম্পর্ক এখানে স্পষ্ট ভাবে ধরা পড়ে। একই সঙ্গে বিন্দুর ব্যবহারেও এক দূরবর্তী পয়েন্টিলিজ়মের সাযুজ্য খুঁজে পাওয়া যায়। তবে এই সাদৃশ্য কোনও কৌশলগত বিন্দু নয়, অথবা রেখা ভাঙার উপায় নয়। বরং অন্ধকারকে স্পন্দিত করে তোলার আহ্বান।

মোট ১৪টি চিত্রমালার কেন্দ্রে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন প্রতীক। ‘মুখ’ সিরিজ়ে যেমন দেখা যায়, বহু চক্ষুবিশিষ্ট, বিকৃত বা মুখোশসদৃশ অবয়ব। সেখানে দৃষ্টি কখনও অনুপস্থিত, কখনও বা অতিরিক্ত। ২০০১ সালের একটি কাজে এই প্রবণতা চূড়ান্ত রূপ পেয়েছে। বৃহৎ নাসা, গাঢ় অন্ধকার গহ্বর, অলঙ্কার এবং উল্লম্ব ভাবে স্থাপিত একাধিক চোখ মিলিয়ে তৈরি হয়েছে ভয়াবহ এক প্রতিরূপ। অদৃষ্টবাদে বিশ্বাসী শিল্পী মানুষের মধ্যে এই অন্তর্লীন উদ্বেগ, যন্ত্রণা আর বিচ্ছিন্নতার রূপ অনবরত দেখেন। অন্য দিকে, ‘আপেল’ সিরিজ়ে আপাত সরল একটি মোটিফ ধীরে ধীরে অন্য রূপকে পরিণত হয়। আপেলের অভ্যন্তরে যে আলো, তা জীবনেরই ইঙ্গিত— জন্ম, কামনা এবং অস্তিত্বের চক্র। আবার ‘জোকার’ বা ‘বিড়াল ও মাছ’-এর মতো কাজে ব্যঙ্গ এবং রাজনৈতিক ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেখানে রক্ষক ও ভক্ষকের প্রচলিত অর্থ মুছে যায়।

হাওড়ার ব্যবসায়িক পরিবারে জন্ম ভাস্কর লাহিড়ীর। লোহার ব্যবসায়ী পরিবার। রক্ষণশীল এই যৌথ পরিবারে ব্যতিক্রমী, সাহিত্যপ্রেমী কাকার হাত ধরে বাড়িতে আসত বই, পত্রপত্রিকা। তারই মধ্যে আঁকা ছবি শিল্পীকে আকৃষ্ট করে। এ ছাড়া বাড়িতে নিয়মিত কালী পুজো হওয়ার সময়ে কালী ঠাকুর আঁকতেন ভাস্কর। পড়াশোনা নিয়ে ঈষৎ দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। পরবর্তী কালে সুনির্মল বন্দ্যোপাধ্যায়, মনোজ সরকারের উপদেশে ইন্ডিয়ান আর্ট কলেজে ভর্তি হন। পাশাপাশি শুভাপ্রসন্নর কলেজ অব ভিসুয়াল আর্টসেও তালিম নিতে থাকেন। তবে ভারতীয় ভাবধারার আকর্ষণে যামিনী রায় ছিলেন তাঁর মানসগুরু। এ ছাড়া গণেশ পাইনের দ্বারাও খুব প্রভাবিত হয়েছিলেন এক সময়ে। ২৭ বছর বয়সে হঠাৎ বাবার মৃত্যুর কারণে ভাল রেজ়াল্ট সত্ত্বেও উচ্চশিক্ষার পথ বন্ধ হয়ে যায়। বেছে নিতে হয় চাকরির পথ।

শিল্পীর নিজের ভাষায়, তিনি ‘কালার ব্লাইন্ড’। লাল ও সবুজের তফাত আজও বোঝেন না। ফলে তাঁর মৌলিক কাজ হল পেন অ্যান্ড ইঙ্কে। রঙের বোধ স্পষ্ট না হওয়ায় ড্রয়িংয়ের উপরেই তিনি স্থায়ী ভাবে বেশি নজর দেন। ড্রয়িং হিসেবে দেখতে গেলে ‘নুয়ান্সেস অব লাইফ’ তাঁর প্রথম একক প্রদর্শনী। ড্রয়িংয়ের জন্য বিশেষ খ্যাতি ইতিমধ্যেই তিনি অর্জন করেছেন। প্রচারবিমুখ শিল্পী ভাস্করের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, তিনি কখনও কোনও সরল বয়ান নির্মাণ করেন না। তাঁর যাবতীয় আবেগ, দৃষ্টিকোণ, মনের আলো-আঁধার অর্থপূর্ণ ভাবে প্রকাশ পায় নানা ভাবে। যেমন ‘ভাস’-এর মধ্যে কুলুঙ্গি, স্নিগ্ধ আলো... সব মিলিয়ে পুরনো দিনের এক পরিবেশ, মনকে যা বড়ই টানে। আবার বাঘ-বাঘিনী, নারী পুরুষের সম্পর্ক নিয়েও তৈরি হয়েছে একাধিক রূপক। রেখা, বিন্দু ও ছায়ার ঘন বুনন কখনও পরাবাস্তবতার সীমানা ছুঁয়ে যায়, যা কখনও ব্যক্তিগত অন্তর্জগতের মানচিত্র হয়ে ওঠে। আবার আলো আর অন্ধকার সরে গিয়ে উন্মোচিত হয় কাগজের শুভ্রতা।

প্রদর্শনীতে চোখে পড়ার মতো কাজ ‘ক্যাট উইথ ফিশ’— পুরুষ এবং নারীর প্রতীকী প্রতিচ্ছায়া। দু’জনের মধ্যেই বন্য ভাব লক্ষণীয়। কেউ যেন কারও চেয়ে কম নয়। কোনও ছবিই স্কেচি কাজ নয়। রীতিমতো যথার্থ ড্রয়িং করে, ধীরে ধীরে ফুটকি দিয়ে ভরাট করা। কোথাও স্ক্র‍্যাচিং। তবে কাজের মধ্যে অতিরিক্ত অলঙ্করণ দেখা যায়, যা কিছু কিছু ক্ষেত্রে শিল্পের অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে। যদিও এই মাত্রাতিরিক্ত ডিজ়াইন শিল্পীর ভিতর থেকেই আসে। বেশ কিছু কাজের ক্ষেত্রে বিশেষ একটি জায়গায় আলো ফেলেছেন এমন ভাবে, যাতে দর্শকের চোখ আটকে যেতে পারে।

ফোক আর্ট, আদিম মোটিফ এবং রথের চাকার মতো গতিবিশিষ্ট কাজগুলিতে বিষয়ের ভিন্নতা অনুযায়ী শিল্পীর অন্তর্লোকের তল পাওয়া যায়। যেমন ‘রাজা-রানি’ সিরিজ়ে পুরোটাই ইজিপশিয়ান ফর্ম। আবার বাঘ ও বাঘিনীর প্রেম-ভালবাসা বোঝাতে সেখানে কিউবিস্ট কাঠামো। বাঘিনীর লকলকে জিভ করতে ভাঙন এসেছে উপনিষদের অগ্নিসন্তপ্ত জিহ্বার মতো। প্রাচীন ঐতিহ্যের আলো এবং সিঁড়ি শিল্পী ভাস্করের খুবই প্রিয় মাধ্যম। বেশির ভাগ ছবিতেই এর সাবলীল ভূমিকা চমৎকার লাগে।

সমকালীন শিল্পের দৃশ্য-চমকের বিপরীতে ভাস্কর লাহিড়ীর এই ধ্যানমগ্ন আবহ ভারতীয় শিল্পচর্চায় এক নীরব কিন্তু গভীর উপস্থিতি রেখে যায়। আমাদের দেখার অভ্যাসকে নতুন করে প্রশ্ন করে। সেখানেই শিল্পীর সার্থকতা।


(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Art exhibition

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy