E-Paper

স্রষ্টার আত্মদহনের অগ্নিময় আলেখ্য

এই নাটকটি জুড়ে যাঁর উপস্থিতি, বস্তুত যিনি এই নাটকটিকে ধারণ করে রয়েছেন, তিনি ঋত্বিক ঘটকের চরিত্রে সুজন মুখোপাধ্যায়।

সৌভিক গুহসরকার

শেষ আপডেট: ০৯ মে ২০২৬ ০৮:৩৮
মঞ্চে ঋত্বিক রূপে সুজন।

মঞ্চে ঋত্বিক রূপে সুজন।

গত ১০ মার্চ অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসে পূর্ব-পশ্চিম নাট্যোৎসবে মঞ্চস্থ হল চেতনা নাট্যগোষ্ঠীর নাটক ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’। নাট্যরচনা করেছেন জিৎ সত্রাগ্নি। সম্পাদনা ও নির্দেশনা সুজন মুখোপাধ্যায়ের। ঋত্বিক কুমার ঘটকের জীবনের বিভিন্ন অধ্যায় নিয়ে রচিত এই নাটক তাঁর স্বভাব, প্রতিভা ও প্রায় অবশ্যম্ভাবী আত্মদহনের এক শৈল্পিক চিত্রমালা বয়ন করেছে। যে-মানুষটির প্রভাব বঙ্গীয় চেতনা ও সংস্কৃতির উপরে আজ অপ্রতিহত, যে মানুষটি নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন নিজের অতল আবেগের কাছে, সেই মানুষটিকে নিয়ে যখন শিল্পসৃষ্টি হয়, তখন আবেগের একটা অনিয়ন্ত্রিত আতিশয্য প্রকট হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়, যাকে আমরা সাদা ভাষায় বলি মেলোড্রামাটিক। কিন্তু নাট্যনির্মাণ যখন সর্বোচ্চ আবেগকে ধারণ করেও সংযত ও ঋজু প্রকাশকে অগ্রাধিকার দেয়, তখন তা এক শক্তিশালী শিল্পে পরিণত হয়। ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’ নাটকটির ক্ষেত্রে এটাই বলতে হয়। এই নাটকটি থেকে উৎপন্ন তেজঃপুঞ্জ রঙ্গমঞ্চের পরিসর থেকে ছিটকে এসে বুকে লাগে।

এই নাটকটি জুড়ে যাঁর উপস্থিতি, বস্তুত যিনি এই নাটকটিকে ধারণ করে রয়েছেন, তিনি ঋত্বিক ঘটকের চরিত্রে সুজন মুখোপাধ্যায়। ঋত্বিকের স্বভাব আগ্নেয়। অস্থিরতাই তাঁর বৈশিষ্ট্য। কিন্তু কাজের সময় তিনি অত্যন্ত নিয়মনিষ্ঠ। সুরমা ঘটক একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে গৃহস্থালীর ব্যাপারে উদাসীন থাকলেও, ঋত্বিক ‘শুটিং-এর সময়, মিউজ়িক ডিরেকশনের সময় অথবা স্ক্রিপ্ট লেখার সময় খুবই সিরিয়াস এবং ডিসিপ্লিনড থাকতেন। উনি যখন শুটিংয়ের জন্য বেরোতেন, তখন উনি সমস্ত পয়েন্ট লিখে নিতেন...’। ঋত্বিক এক দিকে অস্থির, অন্য দিকে স্থির— তাঁর স্বভাবের এই বৈপরীত্যটা না বুঝলে তাঁর চরিত্রকে ধারণ করা সম্ভব নয়। সুজন মুখোপাধ্যায় ঋত্বিককে বিশ্লেষণ করেছেন, বুঝেছেন এবং পরিশেষে আত্মস্থ করেছেন। তরুণ ঋত্বিকের অসীম প্রাণপ্রাচুর্য, অদম্য উৎসাহ, ডায়নামিজ়ম, অস্থিরতা, ভেঙে পড়া আবার ঘুরে দাঁড়ানো— এই সমস্ত অনুভূতিমালাকে নিবিড় দক্ষতার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন সুজন। আবার পরবর্তী জীবনে ঋত্বিকের মাদকাসক্তি, হতাশা, ক্রমশ প্রায় আত্মহননের দিকে এগিয়ে যাওয়াকে সুজন অসামান্য তীব্রতায় এঁকেছেন। নিজেকে নিংড়ে অভিনয় করেছেন। আঙুলের ব্যবহার, হাঁটাচলা... নানা জেশ্চারের মাধ্যমে তিনি চরিত্রটিকে রক্তমাংসের করে তুলেছেন।

এই নাটকের সূত্রধার এবং ঋত্বিক ঘটকের স্ত্রী সুরমা ঘটকের ভূমিকায় নিবেদিতা মুখোপাধ্যায়ের কাজ নিঃসন্দেহে প্রসংশাযোগ্য। ঋত্বিকের সঙ্গে সঙ্গে তিনিও এক অলাতচক্রের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করেছেন। এই নাটকে শুধু ঋত্বিকের কথাই নয়, সুরমার দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর স্বামীকে দেখানো হয়েছে। যে মানুষটাকে তিনি সবচেয়ে ভালবাসেন, শ্রদ্ধা করেন, সেই মানুষটির সঙ্গে তিনি থাকতে পারছেন না। সেই মানুষটিকে তিনি তলিয়ে যেতে দেখছেন। এই জীবনব্যাপী যন্ত্রণা ও হাহাকারকে নিবেদিতা মূর্ত করেছেন তাঁর অভিনয়ে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাঁর অভিনয় একটু উচ্চকিত লেগেছে। তবে যেহেতু তিনি এই নাটকের কথকও বটে, তাই রসহানি ঘটেনি।

মঞ্চে নিবেদিতা ও নীল

মঞ্চে নিবেদিতা ও নীল

এ ছাড়া স্বল্প পরিসরে হলেও ঋত্বিকের ম্যানিকুইনকে নিয়ে লেখা কাহিনির কল্পিত দৃশ্যায়নে মেরি আচার্য ও অগ্নিজিৎ সেনের অভিনয় দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দৃশ্যায়নটিও চমৎকার এবং ওঁদের অভিনয়ও। বিশেষত মেরি আচার্যের ভেঙে পড়ে যাওয়ার অভিনয়টি অসাধারণ। বাকি কলাকুশলীরা যে যার চরিত্রে যথাযোগ্য অভিনয় করেছেন।

এ বার আসি নির্মাণের কথায়। এই নাটকে স্ক্রিন প্রোজেকশনে ঋত্বিকের ছবির নানা দৃশ্য ব্যবহার করা হয়েছে। ব্যবহার করা হয়েছে ‘ব্যাটলশিপ পোটেমকিন’-এর ওডেসা সোপানের দৃশ্য, ‘দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’-এর দৃশ্য। এই সব দৃশ্য ও তার সঙ্গে সঙ্গীতের ব্যবহার নাটকটিকে গভীরতা প্রদান করেছে। প্রবুদ্ধ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গীত পরিচালনা মুগ্ধ করে। নাটকটির শেষে কোমলগান্ধারে ব্যবহৃত, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রর ‘এসো মুক্ত করো’ গানটির প্রয়োগ অসাধারণ। ভাল লেগেছে নাটকে বিভিন্ন গানের সঙ্গে কোরিয়োগ্রাফির প্রয়োগ, সৌমেন চক্রবর্তীর আলো, সঞ্চয়ন ঘোষের মঞ্চ, অনিন্দ্য নন্দীর শব্দ পরিকল্পনা ও অয়ন ঘোষের রূপসজ্জা। দেবশঙ্কর হালদারের পাঠ করা কবিতা এই নাটকটিতে এক ঝলক অপ্রত্যাশিত বাতাসের মতো বয়ে গিয়েছে। তবে, এই নাটকে সুরমার জেল-জীবনের কথা একটু দীর্ঘ লেগেছে। ঋত্বিকের সঙ্গে তাঁর সিনেমার চরিত্র— বিমল, নীতা, সীতা, বঙ্গবালা প্রমুখদের কথোপকথন আর একটু সম্পাদিত হতে পারত বলেই মনে হয়।

‘মেঘে ঢাকা ঘটক’ নাটকটি দর্শকের হৃদয়ে তীব্র আঘাত করে। এমন একটি নাটকের জন্য নাট্যনির্দেশক সুজনকে সাধুবাদ দেওয়া প্রয়োজন। নিজের অসাধারণ অভিনয়ের পাশাপাশি, তিনি সামগ্রিক নাটকটিকে নিপুণ ভাবে নির্মাণ করেছেন।

‘মেঘে ঢাকা ঘটক’ আমাদের ভারাক্রান্ত করে। চুপ করিয়ে দেয়। মাথায় জোনাকির মতো উড়তে থাকে জীবনানন্দের সেই পঙ্‌ক্তি— ‘আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?/ আমার পথেই শুধু বাধা?’


(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Academy of Fine Arts

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy