E-Paper

সৃষ্টির এ কী চঞ্চল প্রয়াস

বিংশ শতাব্দীতে ইংরেজি সাহিত্য এবং দৃশ্যশিল্পের লেখক এবং প্রফেসর রজার কার্ডিনাল লিখেছিলেন দু’টি বই। তার মধ্যে একটির নাম ‘আউটসাইডার আর্ট’।

শমিতা বসু

শেষ আপডেট: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৫৬
স্রোতমুখী: সিমা গ্যালারিতে আয়োজিত প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম।

স্রোতমুখী: সিমা গ্যালারিতে আয়োজিত প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম।

গত ১০ এপ্রিল থেকে সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল মডার্ন আর্টে ২১ জন শিল্পীর কাজ নিয়ে একটি প্রদর্শনী চলছে, নাম ‘আউটসাইডার আর্ট’। সিমা গ্যালারিতে এই প্রদর্শনীর আয়োজন করেছেন ডিরেক্টর রাখী সরকার। এটি চলবে আগামী ২ মে পর্যন্ত।

আর্টের দুনিয়ায় মোটামুটি দু’টি প্রধান ভাষা থাকে। প্রথমটি অ্যাকাডেমিক শিল্পরীতি বা তাকে কিছুটা ধ্রুপদী শিল্পকর্ম‌ও বলা যায়। দ্বিতীয়টি সমকালীন শিল্প।

বিংশ শতাব্দীতে ইংরেজি সাহিত্য এবং দৃশ্যশিল্পের লেখক এবং প্রফেসর রজার কার্ডিনাল লিখেছিলেন দু’টি বই। তার মধ্যে একটির নাম ‘আউটসাইডার আর্ট’। এই বইয়ে যাঁরা শিল্পজগতের বাইরে অবস্থান করেন এবং কোনও প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষা পাননি, তাঁদের কথা বলেছেন লেখক। রাখী সরকারও জানালেন, ভারতে উপজাতি বা আদিবাসী শিল্প, লোকশিল্প ইত্যাদি, মূলস্রোতের শিল্পসীমানার ভিতরে এখনও স্থান দাবি করতে পারে না। তাঁর মত, এগুলিই আউটসাইডার আর্ট।

তিনি ক্লাসিক্যাল ধারায় শিল্পচর্চার বাইরে খুঁজেছেন কিছু মানুষকে যাঁরা শিল্প সৃষ্টি করবেন তাঁদের অনুপ্রেরণা এবং সৃজনশীলতার প্রয়াস সম্বল করে। তিনি দেখাতে চেয়েছেন যে, সৃজনশীলতার অভিব্যক্তি সব সময়ই সর্বজনীন এবং বন্ধনহীন। এই চিন্তা মাথায় রেখে এই প্রদর্শনীর আয়োজন করা, যেখানে শিল্পীরা প্রথাগত ভাবে চিত্রশিল্পী নন। তাঁরা কেউ হয়তো সফল ব্যবসায়ী, আবার কেউ হয়তো পরিচিত চিত্রপরিচালক। একত্রিত করা হয়েছে অভাবনীয় এক শিল্পীগোষ্ঠীকে, যাঁদের পেশা ছবির জগতের চেয়ে বেশ কিছুটা দূরে, অন্য এক দুনিয়ায়। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, এঁদের উদ্ভাবনী শৈলীর মাধ্যমে দর্শককে অভিভূত করলেন তাঁরা।

চলচ্চিত্র পরিচালক অপর্ণা সেন কিছু সাদাকালো আলোকচিত্রের আর্কাইভাল প্রিন্ট উপহার দিয়েছেন। প্রত্যেকটি ছবির গঠনশৈলী পরিচয় দেয় সূক্ষ্ম নান্দনিক বোধের। বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য একটি পাথুরে রাস্তা উপরে উঠে মিলিয়ে গিয়েছে। তার শেষ নেই বলেই সে পথ বড় মনোগ্ৰাহী। অপর একটি ছবিতে বৃষ্টিধোয়া কাচের জানলার বাইরে বড় একটি গাছের গুঁড়ির গভীরতা দিয়ে গাঢ় সুরধ্বনি আর চারপাশে বর্ষার ছাঁটে ঢাকা কাচ। ভারী সুন্দর অভিব্যক্তি।

চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট এবং আলোকচিত্রী অমর্ত্য মুখোপাধ্যায়ের ছবিগুলি অ্যাসিডমুক্ত কাগজের উপর ছাপা। বহু পার্বত্য এলাকার, বিশেষ ভাবে মেরুপ্রদেশের ছবিগুলি রীতিমতো চমকে দেয়। তার মধ্যে একটি আর্কটিক সূর্যাস্তের রঙের খেলা, মনে হয় কল্পনাপ্রসূত।

প্রয়াত অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের শিল্পকলার সঙ্গে শিল্পরসিকের পরিচিতি আছে। কিন্তু এখানে তাঁর‌ কন্যার সংগ্ৰহ থেকে মিশ্র মাধ্যমে আঁকা কিছু মুখাবয়বের ছবি প্রদর্শিত হয়েছে, যেগুলি স্বকীয়তার দাবি রাখে।

অভিনেত্রী মুনমুন সেনের পেনসিল স্কেচগুলিতে কিছুটা বেঙ্গল স্কুলের প্রভাব থাকলেও কলমে আঁকা নারী অবয়বের একটি-দু’টি ড্রয়িং, বিশেষ ভাবে একজন মহিলার সম্মুখচিত্র, রীতিমতো প্রশংসনীয়।

শর্মিলা ঠাকুরের কন্যা সাবা আলি খানের পেনসিল এবং জলরঙে আঁকা উজ্জ্বল সব ফুলের ছবি বেশ আকর্ষণীয়।

রণজিৎ রায় একজন নামী আলোকচিত্রী। এ ছাড়া তিনি পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রকার‌ও। কোভিডের সময়ে চারদিকের হতাশার থেকে উদ্ধার পেতে তিনি মাটি দিয়ে কাজ শুরু করেন, কোনও রকম শিল্পশিক্ষা ছাড়াই। প্রদর্শনীতে তাঁর অতি আধুনিক কিছু ভাস্কর্য দেখা গেল। সাদা পাথর বা সেরামিকের উপর‌ে রঙের কাজ। ‘রিগাল’ নামের একটি ঈগলের মূর্তি ছাড়াও ‘এক্সপ্রেশনস’ কাজটি তাঁর সৃষ্টিশীলতার পরিচয়বাহী।

সামাজিক কর্মী রুচিরা গুপ্তের ডিজিটাল প্রিন্টের উজ্জ্বল রঙিন ছবিগুলি, তাঁর সমাজ-সংসার-প্রকৃতি-প্রাণী এবং পারিপার্শ্বিক জগতের উপর প্রেম-ভালবাসার জ্বলন্ত স্বাক্ষর।

মেরিন ইঞ্জিনিয়ার ললিত মোহন তাঁর ‘স্টিল, নীরবতা এবং নোনাজল’ কাজগুলিকে অনেক স্তরের ভিতর দিয়ে নিয়ে গিয়েছেন— মেশিন স্টিম টারবাইন এবং মাপার যন্ত্র। দর্শক দেখতে পাবেন কেমন ভাবে তিনি টেকনিক্যাল মেমোরি থেকে চলে গেলেন সমসাময়িক আধুনিকতায়। কাজগুলি ক্যানভাসে করা হয়েছে অ্যাক্রিলিকে। ‘প্রপেলার মাইন্ড’-এ বিমূর্তকরণ করেছেন, চিন্তাশীলতা থেকে কিছুটা অন্য জগতের ছোঁয়ায়।

আয়ুষ্মান মিত্র, ওরফে বোবো, একটি ফ্যাশন কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা। তিনি কাগজের উপর মিশ্র মাধ্যমে বেশ কিছু ডিজ়াইনভিত্তিক ছবি এঁকেছেন। ফ্যাশন ডিজ়াইন করেন বলেই তিনি মূল ডিজ়াইন করে তাকে নান্দনিকতা, শৈলী ইত্যাদির প্রলেপ দিয়ে সুন্দর কিছু ছবি এঁকেছেন। তার মধ্যে ‘দ্য কিস’, ‘বয় ইন দ্য রুম’ ইত্যাদি কাজ নজর কাড়ে।

আয়ান আলি বঙ্গাশ, বিখ্যাত সরোদিয়া আমজাদ আলি খানের পুত্র। তিনি সরোদবাদন ছাড়াও চারুশিল্পে উৎসাহী। তাঁর গণেশ-প্রীতি খুব ছোটবেলা থেকেই। নানা রকম গণেশের আকৃতি এঁকেছেন। তাঁর চিত্রকল্পে গণেশকে সেতার বা সরোদ বাজাতেও দেখা যায়। আয়ানের কাজে লয়, তাল, ছন্দ ছাড়াও কিছুটা ভক্তিভাব এবং শেষে অভ্যন্তরীণ স্তব্ধতার অনুভব আনে।

অঞ্জনা দত্ত লেখা ছাড়াও গ্ৰাফিক ডিজ়াইনার‌ এবং চিত্রপরিচালক। তিনি শুধু মাউস এবং ফোটোশপের সাহায্যে খুব বর্ণময় কিছু ছবি রচনা করেছেন।

কনক শর্মা মাইক্রোবায়োলজিতে ডক্টরেট। বছর দশেক আগে হঠাৎ হাতে ব্রাশ তুলে নেন। তেলর‌ং, অ্যাক্রিলিক, প্যাস্টেল, চারকোল এবং জলরঙে পরীক্ষানিরীক্ষা করতে করতে জলরঙের প্রতি ভালবাসা জন্মায়। এখন প্রধানত আকাশ, পাহাড় এবং সমুদ্রের খেলা এবং তাদের পারস্পরিক সম্বন্ধের রঙিন ছবি আঁকেন। তাঁর জলরঙের ছবিগুলিতে পরিবেশ বড় প্রশান্ত বলে মনে হয়।

শিল্পী গণেশ পাইন, যোগেন চৌধুরী এবং পরিতোষ সেনের শিল্পের অনুপ্রেরণায় ছবি আঁকেন ড. সঞ্জয় ঘোষ। ডিজিটাল গ্ৰাফিক্সে নানা ধরনের মুখের অভিব্যক্তি।

প্রয়াত সাংবাদিক সঙ্কর্ষণ ঠাকুরের ছবিতে স্মৃতি বিজড়িত কিছু ভূদৃশ্যের ছবি এবং তারপর বিমূর্তকরণ। তেলর‌ং এবং অ্যাক্রিলিকের কাজ।‌

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নীল পটভূমিতে একটি হাতির সিলুয়েটের ছবিও প্রদর্শনীতে দেখা গেল।

বরোদার রাজপরিবারের মহারাজ রঞ্জিত সিংহ রাও গায়কোয়াড় ছিলেন একজন মহান শিল্পী। এই প্রদর্শনী তাঁর‌ই স্মরণে উৎসর্গীকৃত।


(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

CIMA Gallery

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy